বর্তমান তারিখ:23 July, 2019

ক্রোমিয়াম প্রোজেক্ট এবং গুগল ক্রোম ব্রাউজারের মধ্যে পার্থক্য কি?

ক্রোমিয়াম

আপনি যদি একটু অ্যাডভান্সড লেভেলের পিসি ইউজার হয়ে থাকেন, তাহলে হয়তো আপনি ক্রোম, ক্রোমিয়াম, ক্রোম ওএস ইত্যাদির নাম অনেক শুনেছেন। উইন্ডোজ পিসি ব্যাবহার করেন অথচ ক্রোম ব্রাউজার ব্যাবহার করেন না কিংবা ক্রোম ব্রাউজার চেনেন না এমন মানুষের সংখ্যা নেই বললেই চলে। কিন্তু ক্রোম ওএস এবং ক্রোমিয়াম প্রোজেক্টের ব্যাপারে খুব কম মানুষই জানেন। অনেকে মনে করে থাকেন যে ক্রোম এবং ক্রোমিয়াম দুটি একই জিনিস। সেটা কয়েকটি দিক থেকে ঠিক হলেও ১০০%  সঠিক নয়। আজকে এই ক্রোম ব্রাউজার এবং ক্রোমিয়াম প্রোজেক্টটির ব্যাপারেই আলোচনা করবো।

ক্রোমিয়াম

ক্রোমিয়াম হচ্ছে, সহজ কথায় বলতে হলে, একটি ওপেন সোর্স ব্রাউজার প্রোজেক্ট। গুগল যখন গত ২০০৮ সালে প্রথম তাদের ওয়েব ব্রাউজার গুগল ক্রোম রিলিজ করে, তখনই গুগল ক্রোমের সাথেই তারা ক্রোমিয়াম ওপেন সোর্স প্রোজেক্টের সোর্স কোড রিলিজ করে যাতে সেগুলো ডেভেলপাররা কাজে লাগাতে পারে। আপনি হয়তো মনে করতে পারেন যে ক্রোমিয়াম প্রোজেক্টটিকেও গুগল নিয়ন্ত্রন করে। তবে তা সঠিক নয়। ক্রোমিয়াম প্রোজেক্টটি গুগল রিলিজ করলেও এটি সম্পূর্ণ ওপেন সোর্স একটি প্রোজেক্ট, যার ফলে যে কেউ এর ডেভেলপমেন্টে অংশগ্রহন করতে পারে। তবে ক্রোমের বা ক্রোম ব্রাউজারের সম্পূর্ণ ডেভেলপমেন্ট গুগল নিজেই নিয়ন্ত্রন করে।

গুগল ক্রোম ব্রাউজার এবং ক্রোমিয়ামের মধ্যে সবথেকে বড় পার্থক্য হচ্ছে, যদিও গুগলের ক্রোম ব্রাউজারটি ক্রোমিয়াম প্রোজেক্টের সাহায্যেই তৈরি করা, তবে গুগল ক্রোমে কিছু এক্সট্রা ফিচারস আছে যেগুলো গুগল নিজেই কাস্টোমাইজ করেছে। যেমন- অটোমেটিক আপডেটস, আরো বেশি ভিডিও ফরম্যাটের সাপোর্ট ইত্যাদি। এই এক্সট্রা ফিচারগুলো ক্রোমিয়াম প্রোজেক্টে নেই, যেহেতু এটি ওপেন সোর্স প্রোজেক্ট এবং এখানে সবধরনের ফিচার অ্যাড করা এবং ইম্প্রুভমেন্টস করা থার্ড পার্টি ডেভেলপারদের দায়িত্ব।

যেমন, আপনি অনেক বিখ্যাত ব্রাউজার দেখতে পাবেন যেগুলো সব ক্রোমিয়াম ইঞ্জিন ব্যাবহার করে এবং ক্রোমিয়াম প্রোজেক্টের সোর্স কোড ব্যাবহার করেই তৈরি করা হয়েছে। এগুলোর ব্রাউজিং বিহেভিয়র, রেস্পন্সিভনেস, স্পিড সবকিছুই গুগল ক্রোমের মতো যেহেতু সেগুলো একই ইঞ্জিনের ওপরে তৈরি করা। তবে প্রত্যেকটিরই নিজের কিছু ইউনিক ফিচার রয়েছে যেগুলো তাদের ডেভেলোপাররা তাদের ইচ্ছামত অ্যাড করেছে। যেমন কোনটির আছে বিল্ট ইন অ্যাড-ব্লকার, কোনটির আছে বিল্ট ইন ভিপিএন, স্ক্রিনশট টুল ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে সবগুলো সব ক্রোমিয়াম প্রোজেক্ট ব্যাবহার করেই তৈরি করা। যেমন- অপেরা ব্রাউজার, ইউসি ব্রাউজার, Yandex ব্রাউজার এবং নাম না জানা আরো অনেক ব্রাউজার ইত্যাদি ইত্যাদি।

ক্রোমে এমন কি আছে যা ক্রোমিয়ামে নেই?

এতক্ষন যা বললাম তাতে নিশ্চই বুঝেছেন যে গুগল ক্রোম নিজেও ওপেন সোর্স ক্রোমিয়াম প্রোজেক্টের সাহায্যে তৈরি একটি ব্রাউজার। তবে অন্যান্য ডেভেলপারদের মতোই গুগল তাদের ব্রাউজারটিকেও নিজের ইচ্ছামত কাস্টোমাইজ করেছে এবং ফিচার অ্যাড/ ব্লক করেছে। মুলত গুগল যা করেছে তা হচ্ছে, তারা ক্রোমিয়াম প্রোজেক্টটিকে নিয়ে তাতে নিজেদের ইচ্ছামত ফিচার অ্যাড করেছে যাতে তা ইউজারদের কাছে আরেকটু বেশি প্রশংসা পায়।

এই ধরনের গুগলের অ্যাড করা কয়েকটি ফিচার হচ্ছে-

AAC, H.264 এবং MP3 সাপোর্ট : গুগল ক্রোম গুগল এই জনপ্রিয় মিডিয়া কোডেকের সাপোর্ট দিয়েছে যার ফলে গুগল ক্রোমের সাহায্যে এই কোডেকের মিডিয়া কন্টেন্টগুলোকে প্লে করা বা স্ট্রিম করা যায়। এই কোডেকগুলোর সাপোর্ট থাকার কারনে ক্রোম ইন্টারনেটের প্রায় সবধরনের মিডিয়া কন্টেন্ট সাপোর্ট করে। যেমন- অধিকাংশ ওয়েবসাইট যারা HTML5 ব্যাবহার করে, তারা প্রায় সবাই H.264 কোডেকে মিডিয়া ফাইল প্লে করে বা স্ট্রিম করে। ক্রোমিয়ামে এই কোডেকের সাপোর্ট না থাকায় সেগুলো প্লে হয়না, তবে গুগল ক্রোমে এই কোডেকের সাপোর্ট থাকায় সেটি ক্রোমে খুব সহজেই প্লে হয়।

ফ্ল্যাশ প্লেয়ার সাপোর্ট : গুগল তাদের ক্রোম ব্রাউজারে একটি স্যান্ডবক্সড পেপার এপিআই (Sandboxed Pepper API) রেখেছে যা অ্যাডোব ফ্ল্যাশ প্লেয়ার ছাড়াই ব্রাউজারে ফ্ল্যাশ প্লেয়ার সাপোর্ট দিতে পারে। এই এপিআইটি সেইসকল কন্টেন্টগুলোকে রান করতে পারে যেগুলোকে রান করার জন্য ফ্ল্যাশ প্লেয়ারের দরকার হয়। এই এপিআইটিকে গুগল প্রত্যেকটি ক্রোম আপডেটের সাথে আপডেটও করে থাকে যাতে সবসময়ই ফ্ল্যাশ প্লেয়ারের লেটেস্ট ভার্শন ব্যাবহার করার সুবিধা পাওয়া যায়। এর ফলে আপনি খেয়াল করলে দেখবেন যে, অন্যান্য ক্রোমিয়াম বেজড ব্রাউজার ইন্সটল করলে ফ্ল্যাশ সাপোর্ট পাওয়ার জন্য আপনাকে একইসাথে অ্যাডোব ফ্ল্যাশ প্লেয়ার ইন্সটল করতে হয়। তবে গুগল ক্রোমের জন্য অ্যাডোব ফ্ল্যাশ প্লেয়ারের কোন দরকার হয়না।

গুগল আপডেট : উইন্ডোজ এবং ম্যাক অপারেটিং সিস্টেমে যারা গুগল ক্রোম ব্যাবহার করেন, তারা এক্সট্রা আরেকটি ছোট ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যাপ পেয়ে যান যেটি সাইলেন্টলি ব্যাকগ্রাউন্ডে ক্রোম ব্রাউজারকে লেটেস্ট ভার্শনে আপডেট করে। লিনাক্স ইউজাররা তাদের সফটওয়্যার ম্যানেজমেন্ট টুলের সাহায্যেও ক্রোমকে আপডেট করতে পারেন। গুগল ক্রোমের এই রেগুলার আপডেটগুলো গুগল নিজে থেকেই রোলআউট করে ক্রোমকে আরও বেটার করার জন্য। ক্রোমিয়ামের সব বিল্ডে আপনি এমন ফ্রিকুয়েন্ট আপডেটের নিশ্চয়তা পাবেন না।

এক্সটেনশন লিমিটেশন এবং ক্র্যাশ রিপোর্ট : গুগল ক্রোমের ক্ষেত্রে গুগল এক্সটেনশনের কিছু লিমিটেশন রেখেছে। যেমন- আপনি ক্রোম ওয়েবস্টোরের বাইরের কোন এক্সটেনশন সরাসরি ক্রোম ব্রাউজারে ইন্সটল করতে পারবেন না। শুধুমাত্র গুগলের দ্বারা সার্টিফাইড এক্সটেনশনগুল অর্থাৎ যেগুলো ক্রোম স্টোরে আছে, সেগুলোই ব্যাবহার করতে পারবেন। তবে ক্রোমিয়াম ব্রাউজার যেহেতু গুগল নিজে নিয়ন্ত্রন করেনা, তাই সেখানে এক্সটেনশন সহজেই সাইডলোড করা, ইন্সটল করা ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের সুযোগ থাকছে যার ফলে ক্রোমিয়াম, ক্রোমের তুলনায় কিছুটা আনসিকিওর। এছাড়া গুগল ক্রোমের যেকোনো সমস্যার কারনে গুগলের কাছে ক্র্যাশ রিপোর্ট করার সুযোগ থাকছে। তবে ক্রোমিয়ামে সেভাবে কোন ডেডিকেটেড টিম থাকেনা আপনার রিপোর্ট পরীক্ষা করার জন্য এবং ব্যাবস্থা নেওয়ার জন্য। এই পুরোটাই ডেভেলপারদের ওপরে নির্ভর করে।

সবশেষে আসি এভেইলেবলিটির ব্যাপারে। আপনি গুগল ক্রোম ব্রাউজার সরাসরি গুগলের ওয়েবসাইট থেকেই ডাউনলোড করে ব্যাবহার করতে পারবেন। আর ক্রোমিয়ামের লেটেস্ট বিল্ড আপনি https://chromium.org থেকে ডাউনলোড করে ইন্সটল করতে পারবেন। তবে আমি মনে করিনা এসব ডিসঅ্যাডভান্টেজের কারনে গুগল ক্রোম বাদ দিয়ে ক্রোমিয়াম ব্রাউজার ব্যাবহার করার কোন যুক্তি আছে। তবে শুধুমাত্র ক্রোমিয়াম ব্রাউজার তবে ক্রোম নয়, এমন একটি ব্রাউজার ব্যাবহার করার জন্য আপনার কাছে অনেকরকম অপশন থাকছে। কারন অনেক জনপ্রিয় ব্রাউজার আছে যেগুলো ক্রোমিয়াম প্রোজেক্টের ওপরে তৈরি। যেমন- অপেরা ব্রাউজার, ইউসি ব্রাউজার ইত্যাদি।

ক্রোমিয়াম ব্রাউজার কি কি আপনি ব্যাবহার করতে পারেন, সেগুলোর জন্য আপনি আমাদের নিচের এই আর্টিকেলটি চেক করতে পারেন-


WiREBD এখন ইউটিউবে, নিয়মিত টেক/বিজ্ঞান/লাইফ স্টাইল বিষয়ক ভিডিও গুলো পেতে WiREBD ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুণ! জাস্ট, youtube.com/wirebd — এই লিংকে চলে যান এবং সাবস্ক্রাইব বাটনটি হিট করুণ!

→ ৫টি সেরা ক্রোমিয়াম নির্ভর ব্রাউজার, যেগুলোতে গুগল ক্রোম থেকেও বেশি ফিচার রয়েছে!

এই ছিল গুগল ক্রোম এবং ক্রোমিয়াম প্রোজেক্টের মধ্যে প্রধান সব পার্থক্যগুলো। আজকের মতো এখানেই শেষ করছি। আশা করি আজকের আর্টিকেলটিও আপনাদের ভালো লেগেছে। কোন ধরনের প্রশ্ন বা মতামত থাকলে অবশ্যই কমেন্ট সেকশনে জানাবেন।

অনেক ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তির প্রতি আকর্ষণ ছিলো এবং হয়তো সেই আকর্ষণটা আরো সাধারন দশ জনের থেকে একটু বেশি। নোকিয়ার বাটন ফোন থেকে শুরু করে ইনফিনিটি ডিসপ্লের বেজেললেস স্মার্টফোন, সবই আমার প্রিয়। জীবনে টেকনোলজি আমাকে যতটা ইম্প্রেস করেছে ততোটা অন্যকিছু কখনো করতে পারেনি। আর এই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ থেকেই লেখালেখির শুরু.....

10 Comments

  1. Shetu Reply

    এন্ড্রোয়েড এ অনেক ক্রোম দেখি। আসলে এদের কাজ কি ভাই? ইনস্টল করে তো কোনো তফাৎ পাওয়া যায় না।

    1. সিয়াম একান্ত Post author Reply

      এদের ব্রাউজার ইঞ্জিন একই। এদের মধ্যে মুলত পার্থক্য হচ্ছে হয়তো কোনটির ইউজার ইন্টারফেস আলাদা, কোনোটিতে হয়তো আছে বিল্ট ইন অ্যাড ব্লকার, কোনটিতে বিল্ট ইন ভিপিএন ইত্যাদি ইত্যাদি এই ধরনের কিছু এক্সট্রা ফিচারস থাকতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *