প্রোজেক্ট ট্রেবল এবং অ্যান্ড্রয়েড আপডেটের ভবিষ্যৎ [বিস্তারিত ব্যাখ্যা]

গুগলের অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম নিয়ে সবজায়গায় সবথেকে বেশি যে অভিযোগটি শুনে থাকবেন সেটি হচ্ছে ফ্র্যাগমেন্টেশন। প্রত্যেকবছর গুগল তাদের অ্যান্ড্রয়েডের একটি করে নতুন ভার্শন রিলিজ করে এবং খুব কম ডিভাইসই দ্রুত নতুন আপডেটগুলো পায়। অধিকাংশ অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইসই কয়েক বছর আগের কোন ওল্ড অ্যান্ড্রয়েড ভার্শনে আটকে থাকে। কিছু কিছু অ্যান্ড্রয়েড ফোন যেমন স্যামসাং এবং অন্যান্য মেজর স্মার্টফোন ম্যানুফ্যাকচারারের ফ্ল্যাগশিপ ডিভাইসগুলো হয়তো নতুন অ্যান্ড্রয়েড ভার্শন রিলিজ হওয়ার কয়েক মাস পরেই ওই ভার্শনটির আপডেট পেয়ে যায়। তবে এছাড়া অধিকাংশ অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইস ওএস আপডেট পায়না বললেই চলে। এবং এমনকি অধিকাংশ অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইস সময়মতো ছোট ছোট রেগুলার সিকিউরিটি আপডেটগুলোও পায়না। অ্যান্ড্রয়েডের ক্ষেত্রে একেই বলা হয় ফ্র্যাগমেন্টেশন। আর এই ফ্র্যাগমেন্টেশন সমস্যা দূর করতেই গুগল এই প্রোজেক্ট ট্রেবল নামক প্রোজেক্টটি হাতে নিয়েছে। আজকে এই প্রোজেক্ট ট্রেবলের খুঁটিনাটি নিয়েই আলোচনা করবো।

প্রোজেক্ট ট্রেবল

ম্যানুফ্যাকচারারদের জন্য অ্যান্ড্রয়েড আপডেটকে আরো একটু সহজ করে দিতেই প্রোজেক্ট ট্রেবল

গুগল তাদের এই প্রোজেক্ট ট্রেবলটি তাদের গত বছরের অ্যান্ড্রয়েড ভার্শন, অ্যান্ড্রয়েড অরিওর একটি আন্ডার দ্যা হুড ফিচার বা ইম্প্রুভমেন্ট হিসেবে রেখেছে। অর্থাৎ, অ্যান্ড্রয়েড অরিও চালিত সব ডিভাইসই এই প্রোজেক্ট ট্রেবলের অন্তর্ভুক্ত। প্রোজেক্ট ট্রেবলের মুল লক্ষ্য হচ্ছে, ডিভাইস ম্যানুফ্যাকচারারদের জন্য তাদের ডিভাইসে অ্যান্ড্রয়েড আপডেট রিলিজ করা অনেক বেশি সহজ করে দেওয়া। এই প্রোজেক্ট ট্রেবল আমার মতে অ্যান্ড্রয়েড অরিওর সবথেকে বড় অফ-স্ক্রিন ফিচার বা ইম্প্রুভমেন্ট ছিল। অফ-স্ক্রিন ফিচার বলতে এই ফিচারটির অ্যাডভান্টেজ সব ইউজাররাই উপভোগ করতে পারবে তবে এটিকে আলাদা কোন দেখার মতো ইম্প্রুভমেন্ট বা ফিচার হিসেবে খুঁজে পাবে না যদিনা আগে থেকে এই বিষয়ে না জেনে থাকে।

প্রোজেক্ট ট্রেবল কিভাবে কাজ করে তা বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে,

অ্যান্ড্রয়েড আপডেট কিভাবে কাজ করে?

প্রথমত গুগল তাদের নতুন অ্যান্ড্রয়েড ভার্শনটির ওপেনসোর্স কোড রিলিজ করে এবং অ্যান্ড্রয়েড ওপেন সোর্স প্রোজেক্টের মাধ্যমে ডেভেলপারদের জন্য তা এভেইলেবল করে। এরপর চিপসেট ম্যানুফ্যাকচারাররা যেমন- কোয়ালকম, মিডিয়াটেক, স্যামসাং, হুয়াওয়ে এরা তাদের স্পেসিফিক হার্ডওয়্যারের জন্য ড্রাইভার রিলিজ করে এবং এই ড্রাইভারগুলোকে অ্যাকচুয়াল অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন মেকারদের কাছে এভেইলেবল করে। এই স্মার্টফোন ম্যানুফ্যাকচারাররা হচ্ছে স্যামসাং, শাওমি, লেনোভো, এইচটিসি ইত্যাদি। এবার তাদের কাজ হয় এর ওপরে তাদের নিজেদের কাস্টোমাইজেশন করা বা নিজেদের কাস্টম স্কিন (MIUI, EMUI, SENSE UI) ইত্যাদি ইউআই ব্যবহার করা। এবং এরপরেই এই আপডেটটি এভেইলেবল করা হয় ডিভাইস ইউজারদের জন্য।

ফ্র্যাগমেন্টেশন সবসময় গুগলের দোষ নয়, বরং স্মার্টফোন ম্যানুফ্যাকচারারের দোষ

মূলত এর কারণেই চলে আসে ফ্র্যাগমেন্টেশন সমস্যা। কারন, গুগল এবং চিপসেট ম্যানুফ্যাকচারাররা হয়তো দায়িত্ব নিয়ে সময়মতো তাদের সোর্স কোড এবং ড্রাইভারগুলো রিলিজ করছে। তবে স্মার্টফোন ম্যানুফ্যাকচারাররা তাদের সব ডিভাইসে এই আপডেট দিতে সবসময়ই কার্পণ্য করে এবং করে আসছে। এর কারন অনেকরকম হতে পারে। যেমন- প্রত্যেকটি ডিভাইসের জন্য আপডেট রেডি করা অনেক সময়সাপেক্ষ ব্যাপার এবং অনেকসময় ডিভাইস ম্যানুফ্যাকচারাররা আপডেট সাইকেল পিরিয়ড বা এই ধরনের অনেক সময়ের অজুহাত দিয়েও আপডেট নিয়ে কার্পণ্য করে থাকে। তবে অনেকসময় দেখা যায় যে, কোয়ালকম বা অন্য কোন চিপসেট ম্যানুফ্যাকচাররা তাদের স্পেসিফিক কোন একটি চিপসেটের সাপোর্ট বন্ধ করে দেয়। তখন সেটির জন্য তারা আর কোন ড্রাইভার রিলিজ করেনা। এর ফলে, স্মার্টফোন ম্যানুফ্যাকচারাররাও সেই চিপসেটটির ওপরে রান করা কোন ডিভাইসেই আর কোন আপডেট দিতে পারেনা।

এবার নিশ্চই বুঝছেন স্টক অ্যান্ড্রয়েডচালিত স্মার্টফোনগুলো অর্থাৎ মোটোরোলা, নোকিয়া, পিক্সেল ইত্যাদিতে খুব দ্রুত ওএস আপডেট দেওয়া কেন সম্ভব হয় এবং কাস্টম ইউআই এর ডিভাইসগুলোতে কেন আপডেট দিতে অনেক দেরি হয়। কারন, স্টক অ্যান্ড্রয়েডে আপডেট রিলিজ করার জন্য আপডেটটিকে খুব বেশি কাস্টোমাইজ করার দরকার পড়েনা। তবে কাস্টম ইউআই এর ডিভাইস যেমন MIUI, EMUI ইত্যাদতে আপডেট রিলিজ করতে হলে আপডেটটিকে যথেষ্ট কাস্টোমাইজ করার দরকার পড়ে কাস্টম স্কিন হওয়ার কারণে, যে ঝামেলাটি অনেক ম্যানুফ্যাকচারারই সব ডিভাইসের জন্য নিতে চায় না।

প্রোজেক্ট ট্রেবল কি করবে এখানে?

এখানে প্রোজেক্ট ট্রেবল মুলত অ্যান্ড্রয়েড অরিও থেকে শুরু করে অ্যান্ড্রয়েডের ভেতরে কিছুটা চেঞ্জ আনবে। বলতে পারেন, প্রোজেক্ট ট্রেবল অ্যান্ড্রয়েডকে কিছুটা মডিউলার করবে। প্রোজেক্ট ট্রেবল মূলত একটি নতুন ভেন্ডর ইন্টারফেস যা আগে থেকেই অ্যান্ড্রয়েড অরিওতে বিল্ট ইন থাকবে। এই ভেন্ডর ইন্টারফেসে আগে থেকেই চিপসেটের ড্রাইভার ইনক্লুডেড থাকবে। গুগল কয়েকটি মেজর চিপসেট ম্যানুফ্যাকচারারদের সাথে কাজ করেছে এই প্রোজেক্ট ট্রেবল নিয়ে যাতে গুগল আগে থেকেই অ্যান্ড্রয়েডে তাদের ডিভাইস ড্রাইভারগুলো ইনক্লুড করে রাখতে পারে এবং এই ভেন্ডর ইন্টারফেসটি যাতে পরবর্তী সব অ্যান্ড্রয়েড ভার্সনের সাথে কম্পিটেবল এবং ড্রাইভারগুলো যাতে স্ট্যাবল হয় তা নিশ্চিত করতে।

প্রোজেক্ট ট্রেবলের মাধ্যমে চিপসেটের ড্রাইভারগুলো আগে থেকেই অ্যান্ড্রয়েডের ভেতরে থাকবে

এর ফলে যা লাভ হবে স্মার্টফোন ম্যানুফ্যাকচারারদের, যারা আপডেট রিলিজ করার সর্বশেষ পদক্ষেপটি নেয়। কারন, এর ফলে স্মার্টফোন ম্যানুফ্যাকচারাররা অ্যান্ড্রয়েডের নতুন ভার্শনের সোর্স কোড পাওয়ার সাথে সাথেই তারা আপডেট রেডি করার কাজ শুরু করে দিতে পারবে। তাদেরকে চিপসেট ম্যানুফ্যাকচারারের তৈরি ড্রাইভারগুলোর জন্য আর অপেক্ষা করতে হবেনা, যেহেতু গুগল এবং চিপসেট ম্যানুফ্যাকচারাররা প্রোজেক্ট ট্রেবলের মাধ্যমে এই ড্রাইভারগুলো আগে থেকেই অ্যান্ড্রয়েডের সোর্স কোডের মধ্যে ইনক্লুড করে রেখেছে। এর ফলে ডিভাইস ম্যানুফ্যাকচারাররা খুব দ্রুত আপডেট রেডি করার কাজটি শুরু করে দিতে পারবে। এখানে ফ্র্যগমেন্টেশনের জন্য গুগলের এবং চিপসেট ম্যানুফ্যাকচারারের আর কোনই দোষ থাকবে না।

এর ফলে কোন স্মার্টফোন ম্যানুফ্যাকচারার যদি অ্যান্ড্রয়েড আপডেট দিতে দেরি করে সেটা সম্পূর্ণই হবে তাদের দোষ। এখানে গুগলের অথবা চিপসেট ম্যানুফ্যাকচারারদের দোষ দেওয়ার কোন সুযোগ থাকছে না।এখানে এই ধরনের কোন অজুহাতও ডিভাইস ম্যানুফ্যাকচারা দিতে পারবে না যে চিপসেট মেকারের কাছ থেকে যে ড্রাইভারগুলো তারা পেয়েছে সেগুলো আনস্ট্যাবল কিংবা কম্পিটেবল নয়।

এর ফলে সবশেষে ডিভাইস ইউজারদের যে প্র্যাকটিকাল লাভটি হবে তা হচ্ছে, ইউজাররা যদি অ্যান্ড্রয়েড অরিও কিংবা এর ওপরের কোন অ্যান্ড্রয়েড ভার্শন ব্যবহার করে, তবে তারা আরও অনেক দ্রুত সিকিউরিটি আপডেটস এবং ওএস আপডেটস পাবে। তবে হ্যা, দ্রুত আপডেটস তখনই পাবে যখন স্মার্টফোন ম্যানুফ্যাকচাররা এই প্রোজেক্ট ট্রেবলের অ্যাডভান্টেজ নেবে। তবে এই প্রোজেক্টটির অ্যাডভান্টেজ এবং কনভেনিয়েন্সের কথা চিন্তা করে আশা করা যায় মেজর সব স্মার্টফোন ম্যানুফ্যাকচাররাই এই প্রোজেক্টটির সুবিধা দিয়ে আরও দ্রুত অ্যান্ড্রয়েড আপডেটস নিশ্চিট করতে পারে। এবং তাতে সর্বশেষ লাভ আমাদের মতো স্মার্টফোন ইউজারদেরই হবে।

তো এই ছিল অ্যান্ড্রয়েডের জন্য গুগলের প্রোজেক্ট ট্রেবল এবং অ্যান্ড্রয়েড আপডেটের সাথে এর সম্পর্ক। আজকের মতো এখানেই শেষ করছি। আশা করি আজকের আর্টিকেলটিও আপনাদের ভালো লেগেছে। কোন ধরনের প্রশ্ন বা মতামত থাকলে অবশ্যই কমেন্ট সেকশনে জানাবেন।


WiREBD এখন ইউটিউবে, নিয়মিত টেক/বিজ্ঞান/লাইফ স্টাইল বিষয়ক ভিডিও গুলো পেতে WiREBD ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুণ! জাস্ট, youtube.com/wirebd — এই লিংকে চলে যান এবং সাবস্ক্রাইব বাটনটি হিট করুণ!

Image Credit : East Pop Via Shutterstock

অনেক ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তির প্রতি আকর্ষণ ছিলো এবং হয়তো সেই আকর্ষণটা আরো সাধারন দশ জনের থেকে একটু বেশি। নোকিয়ার বাটন ফোন থেকে শুরু করে ইনফিনিটি ডিসপ্লের বেজেললেস স্মার্টফোন, সবই আমার প্রিয়। জীবনে টেকনোলজি আমাকে যতটা ইম্প্রেস করেছে ততোটা অন্যকিছু কখনো করতে পারেনি। আর এই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ থেকেই লেখালেখির শুরু.....

7 Comments

  1. Salam Ratul Reply

    হুম ভালো লাগলো ইনফরমেশন। ধন্যবাদ ভাইয়া।

  2. Rayhan Reply

    প্রোজেক্ট ট্রেবল ব্যস্তব্যায়িত করা সম্ভব হলে অনেক ভালো হবে। অন্তত ৬.০ নিয়ে পড়ে থাকতে হবে না আমাকে। লেটেস্ট অ্যান্ড্রয়েড ইউজ করতে পারবো। যেমন লেটেস্ট উইন্ডোজ ইউজ করছি। আর্টিকেল অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল!!

    1. সিয়াম একান্ত Post author Reply

      তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে, প্রোজেক্ট ট্রেবলে শুধুমাত্র অ্যান্ড্রয়েড অরিও এবং ভবিষ্যতের এর ওপরের অ্যান্ড্রয়েড ইউজাররাই উপকার পাবেন। অ্যান্ড্রয়েড অরিওর নিচের কোন ইউজার এই প্রোজেক্টটিতে কোনরকম উপকার পাবেনা, যদিনা ম্যানুফ্যাকচারার তাদের ডিভাইসটিকে আগে অ্যান্ড্রয়েড অরিওতে আপডেট করে দেয়। তাই অ্যান্ড্রয়েড ৬.০ তে এই প্রোজেক্টটি কাজ করবে না।

  3. অর্নব Reply

    Big thanks to Google. এরকম একটা প্রজেক্ট হাতে নেওয়ার জন্য। অন্তত এখন থেকে আপডেট না পাওয়া সমস্যা চলে যাবে। আচ্ছা ভাই সকল ফোন মানুফাকচাররা ল্যাপটপ গুলোর মতো কেন হয় না? উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম যেমন যেকোনো ল্যাপটপ এ যেকোনো সময় চলতে পারে। কিন্তু ফোন কেন সাপোর্ট করে। একই রম কেন সকল ফোনে ফ্ল্যাশ করা যায় না। এটা করা গেলে অনেক ভালো হতো। অন্তত ম্যানুয়াল আপডেট করে এনয়া যেতো গুগল সাইট থেকে ডাউনলোড করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *