কল্পবিজ্ঞান

কি হবে, যদি সূর্য হঠাৎ করে হারিয়ে যায়?

12

যে নক্ষত্রটি নিয়ে  গড়ে উঠেছে আমাদের সুন্দর এই সোলার সিস্টেম তার নাম হল সূর্য । এই সোলার সিস্টেম তথা সৌরজগত এর তিন নম্বর গ্রহ হিসেবে রয়েছে আমাদের এই সুন্দর পৃথিবী। আর সেই হিসেবে সূর্য আমাদের সবচাইতে নিকটবর্তী একটি নক্ষত্র। তবে কখনও কি আপনি ভেবে দেখেছেন ? কি হবে যদি হঠাৎ করে এই সূর্য আমাদের থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়?

সূর্য পৃথিবীতে সকল প্রকার জীব এবং উদ্ভিদকে বাচিয়ে রাখার জন্য ব্যাপকভাবে প্রয়োজনীয়; এই জন্য আমরা এই খুবই উপকারি নক্ষত্রটিকে ধন্যবাদ দিতে পারি যার জন্য আমাদের পৃথিবীতে প্রানের অস্তিত্ব এখনও টিকে আছে। সূর্য উপর থেকে পৃথিবীতে আলো বিকিরন করার মধ্য দিয়ে পৃথিবীর তাপমাত্রাকে একটি সহনশীল মাত্রায় রাখে।  আর যার ফলে আমরা জীব থেকে শুরু করে উদ্ভিদ সবাই আমাদের সকল রকম জৈবিক কার্যকলাপ খুবই সুস্থভাবে পালন করতে পারছি। কেবল মাত্র সূর্যের জন্য সকল প্রকার উদ্ভিদ ফটোসিনথেসিস তথা সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় সৌরআলোকে রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে নিজের খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করছে এবং আমাদের জন্য বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন ত্যাগ করছে। তো বন্ধুরা, চলুন এবার জানি যদি এই সূর্য আমাদের থেকে অদৃশ্য হয়ে যায় বা হারিয়ে যায় তাহলে কি হবে,

প্রথমত আমরা জানবই না কি হয়েছেঃ

হ্যা বন্ধুরা সূর্য যে অদৃশ্য হয়ে গেছে তা আমরা প্রথমে বুঝতেই পারব না ; তবে তা শুধু কিছু মুহূর্তের জন্য। সূর্য আমাদের থেকে ১৫ কোটি কিলোমিটার তথা ৮ আলোক মিনিট দূরে  অবস্থিত। এখানে আলোক মিনিট বলতে বুঝানো হয়েছে যে, আলো প্রতি মিনিটে যে দূরত্ব অতিক্রম করে । আর যার কারনে সূর্য যে গায়েব হয়ে গেছে তার ৮ মিনিট পর্যন্ত আমরা বুঝতেই পারবনা যে সূর্য আসলে নেই; ব্যাপারটি আরও সহজভাবে বুঝতে আরেকটি উদাহরন হলঃ ধরুন আমাদের থেকে ৬৪ আলোকবর্ষ দূরে কোন অনেক উন্নত গ্রহ রয়েছে এবং তাদের কাছে অনেক শক্তিশালী একটি টেলিস্কোপও রয়েছে ; তারা যদি আমাদের পৃথিবীতে তাক করে তা দেখে ; তবে তারা দেখতে পারবে এখানে ডাইনোসর বিচরন করছে; কেননা পৃথিবীর কোন দৃশ্য সেখানে যেতে ৬৪ মিলিয়ন বছর লাগবে,কেননা সেই গ্রহের দূরত্ব আমাদের থেকে  ৬৪ মিলিয়ন আলোকবর্ষ। আর এই থেকে হয়ত বুঝতে পারলেন কেন সূর্য হারিয়ে যাওয়ার ৮ মিনিট পর্যন্ত আমরা জানতেই পারব না আসলে কি হয়েছে; কারন,  আমরা যে তখনও সূর্যকে দেখতে পাচ্ছি। এমনটি সূর্যের যে মহাকর্ষণ বল রয়েছে ,সেটিও ৮ মিনিট পর্যন্ত পৃথিবীর অপর ক্রিয়াশীল থাকবে । তাই সূর্য হারিয়ে যাওয়ার ৮ মিনিট  পর্যন্ত পৃথিবী তার কক্ষপথ বরাবরই ঘুরতে থাকবে।

সূর্য যদি হারিয়ে যায়

তবে তারপর কি হবে ? অতঃপর পৃথিবী তার কক্ষপথ থেকে বের হয়ে  সরলপথ বরাবর চলতে শুরু করবে; আর হয়ত যা হবে পৃথিবী তথা আমাদের জন্য অনেক বড় একটি বিপর্যয়।

বিপর্যয় ১ঃ সবকিছু হয়ে যাবে একদম অন্ধকার

পৃথিবীতে দিন বলে তখন আর কিছু থাকবে না, দিনের আলোর মত কিছুর অস্তিত্ব পাওয়া যাবে না ; সবকিছু হয়ে যাবে রাত এর মত । তবে সেই রাত এখনকার মত স্নিগ্ধ রাত নয় ; হবে আরও ভয়ংকর । কেননা চাঁদ বলতে কিছু দেখা যাবে না আর, রাত হবে আরও অন্ধকার । সূর্যের আলো চাদে প্রতিফলিত হয়ে পৃথিবীতে আসে বলে আমরা চাঁদকে দেখতে পাই । তবে যদি সেই সূর্যই যদি না থাকে তবে আমরা চাঁদ এর অস্তিত্ব খালি চোখে খুঁজে পাব কিভাবে? আকাশে চাঁদ এবং সূর্য কোন কিছুই দেখা যাবে না; যা দেখা যাবে তা হলও দূর আকাশের তারা। যে তারার আলো আমাদের কাছে এখন কিছুই মনে  হয়না; তখন আমাদের কাছে সেই তারার আলো অনেক কিছু মনে হবে। আর সেই সময় এই তারাই হবে পৃথিবীর জন্য একমাত্র আলোক উৎস। ২০০৪ সালে আব্দুল আহাদ নামক একজন বিজ্ঞানি হিসাব করে দেখেছিলেন আমাদের যে সৌরজগত রয়েছে, যার নাম হল মিল্কিওয়ে ; এই সৌরজগতটি আমাদের বাইরের লাখও তারকাপুঞ্জি থেকে চাঁদের তুলনায় ১০৩ গুন আলো আহরন করতে পারে ; তাই পৃথিবী রাতের মত হয়ে গেলেও একদম যে আলো থাকবে না তা কিন্তু নয়।

সূর্য যদি হারিয়ে যায়

তবে সূর্যের আলোর অভাবে ফটোসিনথেসিস প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবে যার ফলে উদ্ভিদগুলো আস্তে  আস্তে বিলুপ্ত হতে শুরু করবে; আর উদ্ভিদ এর বিলুপ্ত হয়ার কারনে বাস্তুতন্ত্রে যে মারাত্মক প্রভাব পরবে তা আমরা কল্পনা করতেয় পারি। তবে খাদ্যের সংকট দেখা  দিলেও  মানুষ সহ সকল প্রকার জীব তখনও বেচে থাকবে , কেননা তখনও পৃথিবীতে ১০০০ বছরের মত সময়ের জন্য শ্বাস প্রশ্বাস কাজের জন্য অক্সিজেন গ্যাস এর মজুদ থাকবে। মজার ব্যাপার হলও আমরা যদি পৃথিবীর জনসংখ্যা এর কথা বিবেচনা করি; তাহলে আমাদের বছরে লাগবে ৬,০০০,০০০,০০০,০০০ কিলো অক্সিজেন; যেখানে আমাদের বায়ুমণ্ডলের কাছে থাকবে ১,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ কিলো অক্সিজেন! সুতরাং ফটোসিনথেসিস ছাড়াও পক্সিজেন যে একদম থাকবে না  তা নয় ।  তবে কার্বন ডাইঅক্সাইড এর আধিক্য কিছু মনে হবেনা; কেননা পৃথিবীর তাপমাত্রা  ইতিমধ্যেই এমনিতেই অনেক ঠাণ্ডা।

আমরা আমাদের পার্শ্ববর্তী গ্রহগুলো দেখতে পারব না

চাঁদের মত আমরা আমাদের পার্শ্ববর্তী গ্রহগুলোকেও  দেখতে পারব না। তবে এখানেও সূর্য হারিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর পর্যন্ত আমরা সেসব গ্রহকে তাদের কক্ষপথে ঠিকই চলতে দেখব। যেমন সূর্য হারিয়ে যাওয়ার ৩০ মিনিট পর পর্যন্তও বৃহস্পতি গ্রহকে তার নিজস্ব কক্ষপথে ঘুরতে দেখা যাবে। কেননা সূর্য থেকে বৃহস্পতি গ্রহ ৩০ আলোক মিনিট দূরে অবস্থিত।

বিপর্যয় ২ঃ গ্রহগুলোর পরস্পর সংঘর্ষ ঘটতে পারে!

সূর্য না থাকার ফলে আমাদের সোলার সিস্টেম এর সবগুলো গ্রহের কোন রকম মহাকর্ষণ বল থাকবে না ; এবং এগুলো নিজের কক্ষপথ বেরিয়ে যেকোনো সোজা দিকে চলতে শুরু করবে। আর এতে করে গ্রহগুলো এক অস্বাভাবিক গতিতে কোন এক দিকে চলতে শুরু করলে অন্য কোন গ্রহের সাথে সংঘর্ষ হওয়া অবিশ্বাস্য কিছু নয়।

বিপর্যয় ৩ঃ তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে চলে যাবে

সম্পূর্ণ পৃথিবী অতি তাড়াতাড়ি আরও ঠাণ্ডা হতে শুরু করবে। কোন তাপমাত্রা তথা গরমের উৎস না থাকায় পৃথিবীর আবহাওয়া এক সপ্তাহের ভেতর ০ ডিগ্রি সেলসিয়াস/ ৩২ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত নেমে আসবে; এবং আরও নিচে নামতে থাকবে। আমাদের কাছে যে পরিমান জালানি মজুদ আছে তা দিয়ে হয়ত আমরা মাস তিনেক সারভাইভ করতে পারব , তবে তারপর পরিস্থিতি অনেক খারাপ হয়ে যাবে যা চিন্তা করা যায় না। যেসব প্রানি ঠাণ্ডা সহ্য করতে পারে না তারা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হতে শুরু করবে ; অথবা তাদেরকে অতি দ্রুত ভু-পৃষ্ঠ থেকে আরও গভীরে জীবন এর সন্ধান করতে হবে। কেননা পৃথিবীর কেন্দ্রের যত কাছে যাওয়া যাবে তত গরম এর সন্ধান পাওয়া যাবে; কেননা পৃথিবীর কেন্দ্র অনেক গরম।

সূর্য যদি হারিয়ে যায়

সমুদ্র পৃষ্ঠগুলো কয়েকমিটার পর্যন্ত বরফে পরিনত হয়ে যাবে। তবে সমুদ্রের গভীরের পানি তখনও তরল থাকবে; কেননা আমরা জানি পৃথিবীর কেন্দ্র অত্ত্যান্ত গরম। যার ফলে সমুদ্রের গভীরের অনেক মাইক্রব এর মত জীব এর সূর্য হারিয়ে যাওয়ার সাথে তাদের কোন প্রভাবই পরবে না। মারিয়ানা ট্রেঞ্চ এর মত গভীর স্থান যেখানে সূর্যের আলোই পৌছায়ই না ; সেখানে বসবাসরত নানারকম জলজ জীব এবং উদ্ভিদের সূর্য হারিয়ে যাওয়ার সাথে কোন সমস্যাই হবে না এবং তারা দিব্বি বেচে থাকবে।


সূর্য হারিয়ে গেলে আমাদের মানব সহ সকল স্বাভাবিক প্রানি অস্তিত্ব ধীরে ধীরে ধ্বংস হতে শুরু করবে ; পৃথিবী তখন একটি বিশাল বরফের গ্রহে পরিনত হয়ে যাবে ; তবুও পৃথিবীর  গভীরতম স্থানে অবস্থানরত মাইক্রব এর মত নানা জীব বেচেই থাকবে । হয়ত কোন গ্রহের সাথে সংঘর্ষ না হলে মিলিয়ন বছর পর পৃথিবী অন্য কোন নক্ষত্র এর কক্ষপথে চলে আসবে; আর তখন তাপ এর কারনে পৃথিবী আবারও গলতে শুরু করবে, আর নিজের আদি রুপে ফিরে আসবে। তখন হয়ত সমুদ্রের নিচে থাকা এসব মাইক্রন থেকে আবার নতুন জীব প্রজাতি তৈরি হবে, যেমনটি ভাবে পৃথিবীতে সর্বপ্রথম জীব তৈরি হওয়া শুরু হয়েছিল।

যাই হোক, ভালো কথা হল বস্তুত এখন থেকে আরও ৪-৫ বিলিয়ন বছরের মধ্যে সূর্য এর ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কোন আশংকা নেই। তবে এই আর্টিকেল থেকে আপনি শুধু একটু ধারনা হয়ত পেলেন সূর্য না থাকলে কি কি হতে পারে। তাছাড়াও সূর্য হারিয়ে গেলে আরও কি হতে পারে নিচে কমেন্টে জানান; আমার মতে সানগ্লাস এর ব্যাবসা বন্ধ হয়ে যাবে 😉

Featured Image by QImono on Pixabay.com

তৌহিদুর রহমান মাহিন
কোন কিছু জেনে সেটা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার মধ্য দিয়েই সার্থকতা । আমি মোঃ তৌহিদুর রহমান মাহিন- ভালোবাসি প্রযুক্তিকে , আরও ভালোবাসি প্রযুক্তি সম্পর্কে বেশি বেশি জানতে- জানাতে। নিয়মিত মানসম্মত প্রযুক্তি বিষয়ক আর্টিকেল উপহার দেয়ার প্রত্যয়ে আছি টেকহাবস এর সাথে।

গুগল আইও ২০১৮ : নতুন অ্যানাউন্সমেন্টস এবং অ্যান্ড্রয়েড পি ফিচারস!

Previous article

রিবুট Vs রিসেট : এদের মধ্যের পার্থক্য কি? কেন আপনার জানা দরকার?

Next article

You may also like

12 Comments

  1. ভালোই ছিল আর্রটিকেলটি। ধন্যবাদ ভাইয়া।

    1. সময় করে পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

  2. darun mozar article chilo..
    Wowww. Egula buddhi pan koi Vau??

    1. ইন্টারনেট ঘেটে মজার মজার টপিক বের করি ☺

  3. ভালো লাগলো।

    1. ধন্যবাদ 🙂

  4. Vebe dekhini kokno evabe. WOW vai.

    1. ☺☺

  5. ভাইয়া জে এসকল এ+ আইডিয়া কোথায় পান আমি সম্পূর্ণ মুগ্ধ হয়ে যাই 😀

    1. কল্পবিজ্ঞান ????

  6. জানা হলো।

  7. সূর্য হঠাৎ হাওয়া হয়ে গেলে কেন পৃথিবী ছিটকে না গিয়ে বরং সুজা পথে চলবে?

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *