WireBD
স্পেস এক্স

স্পেস এক্স : মহাকাশযান প্রস্তুত এবং মহাকাশ যাতায়াত সেবার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়!

পৃথিবীর ভেতর একমাত্র প্রতিষ্ঠান যারা খুবই কম খরচে মহাকাশে রকেট এবং স্পেসক্রাফ্ট পাঠিয়ে দৃষ্টান্ত স্হাপন করেছে, সেই প্রতিষ্ঠানটির নাম হল স্পেস এক্স। স্পেস এক্স পৃথিবীর ভেতর একমাত্র প্রাইভেট কোম্পানি যারা কিনা খুবই কম খরচে নিয়মিত মহাকাশে বানিজ্যিক কাজে নানাসময়ে রকেট পাঠিয়ে আসছে। ২০০২ সালের আগে মহাকাশে যেকোনো কাজে মহাকাশযান পাঠানোর বা মহাকাশযান করে স্যাটেলাইট পাঠানোর ক্ষেত্রে যাবতীয় কার্যকলাপ পরিচালনা করত নিজ নিজ দেশের সরকার; যেমন: রাশিয়ার রসকসমস,ভারতের ইসরো,আমেরিকার নাসা। তবে ২০০২ সালে স্পেস এক্স প্রাইভেট কোম্পানিটি চালু হওয়ার মধ্য দিয়ে, এই রীতিটিই যেন বন্ধ হয়ে গেলো। স্পেস এক্স বর্তমানে পৃথিবীর একমাত্র কোম্পানি যারা তুলনামূলক খুবই কম খরচে মহাকাশে পাঠানো সম্ভব এমন রকেট তৈরি করছে এবং সেই রকেট এর এক্সপ্লোরেশন থেকে রিকোভার পর্যন্ত যাবতীয় ব্যবস্হা নিয়ন্ত্রন করছে।

স্পেসএক্স মহাকাশ যাতায়াত ক্ষেত্রে প্রথম প্রাইভেট কোম্পানি হিসেবে সারা পৃথিবীতে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

Elon Musk / Image Credit CNBC

স্পেস এক্স এর প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক পৃথিবীর ইতিহাসে বর্তমান সময়ের অন্যতম একজন জিনিয়াস ব্যাক্তি বলে আমি মনে করি। কেননা তিনি একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হয়ে স্পেস এবং রকেট সাইন্স এর প্রতি তার ব্যাপক ভালোবাসা দেখিয়ে এই কঠিন জ্ঞানকেও তার মাথায় রপ্ত করে নিয়েছিলেন। বন্ধুরা, আপনারা নিশ্চয়ই পেপাল এর নাম অবশ্যই শুনেছেন? সেই পেপাল নামক পিয়ার টু পিয়ার মানি ট্রানজেকশন সিস্টেমও কিন্তু এই ইলোন মাস্কই প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

অবশ্য পরে তিনি পেপাল ছেড়ে দেন। এমনকি টেসলা মোটরস এরও ফাউন্ডার হলেন এই জিনিয়াস ইলন মাস্ক। তবে এত সব সফল অর্জন বাস্তবায়ন করার পরও তার মনে তিনি শান্তি পাননি ; কেননা তার মন তো পড়ে ছিল মহাকাশে।  ২০০২ সালে স্পেসএক্স লঞ্চ করার সময় ইলোন মাস্ক লক্ষ্য করলেন যে, তাত্ত্বিক জ্ঞান এবং ফিজিক্যাল জ্ঞান এর ভেতর অনেক পার্থক্য রয়েছে। পরে তিনি চিফ টেকনোলজি অফিসার হিসেবে টম মুলারকে স্পেস এক্সে  নিয়োগ করেছিলেন।

Image Credit/ SpaceX

স্পেস এক্স এর পূর্নরূপ হচ্ছে “স্পেস এক্সপ্লোরেশন টেকনোলজিস কর্পোরেশন”। এটি ক্যালিফোর্নিয়ার হ্যাথ্রোনে অবস্হিত একটি এরোস্পেস নির্মাতা এবং স্পেস ট্রান্সপোর্টেশন নিয়ন্ত্রনকারী সংস্হা। একসময় যা কেবল ৬০ জন কর্মচারী নিয়ে শুরু হয়েছিল আজ সেখানে বর্তমানে প্রায় ৭০০০ কর্মচারী কাজ করছে। যেখানে নাসা, ভারতের ইসরো, রাশিয়ার রসকসমস অন্যান্য গ্রহে জীবন রয়েছে কিনা, অন্যান্য গ্রহে পানি বা মানুষের থাকার অবস্হা আছে কিনা এসব গবেষনা নিয়ে ব্যাস্ত ; সেখানে স্পেস এক্স এর মূল লক্ষ্য কেবল স্পেস ট্রাভেল এবং স্পেস এক্সপ্লোরেশন এর খরচ কমিয়ে এনে স্পেস ট্রাভেলিংকে আরও সমৃদ্ধ করা। মূলত স্পেস এক্স মহাকাশ ভ্রমন সম্পর্কিত যাবতীয় সকল কিছুকে সকলের জন্য সস্তা করার কাজ করে যাচ্ছে।

আর শুরু থেকে এই লক্ষ্য নিয়ে স্পেস এক্স তৈরি হয়েছিল,আর আজ পর্যন্তও তারা সেই লক্ষ্যে অবিচল থেকে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে স্পেস এক্স ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে নানারকম কার্গো পাঠানো থেকে শুরু করে মহাকাশে উপগ্রহ স্হাপনের কাজ নিয়মিতভাবে করে যাচ্ছে। স্পেস এক্স দাবি করে যে, নাসা এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যদি কেবল স্পেস ট্রাভেলিং নিয়ে ভালোভাবে কাজ করে তবে স্পেস ট্রাভেলিং এর খরচ প্রতি কেজিতে অর্ধেকেরও নিচে নামিয়ে আনা যাবে।

Falcon Heavy/Image Credit SpaceX

প্রথম দিকে স্পেস এক্স এর প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক রাশিয়া থেকে কমদামে রকেট কিনে তা মডিফাই করে ব্যবহার করার চিন্তা করলেও ; পরিশেষে তিনি রাশিয়া থেকে তার কাঙ্খিত দামে রকেট কিনতে সক্ষম হননি। অতঃপর ইলন মাস্ক এবং তার টীম এই সিদ্ধান্তে উপনিত হলেন যে তারা নিজেরাই রকেট তৈরি করবেন। আর সত্যি কথা বলতে আধুনিক রকেট ইন্ডাস্ট্রির জন্য এটি ছিল একটি বড় বিপ্লব। ইলন মাস্ক জানতেন যে একটি তৈরি রকেটের যে বিক্রয় দাম নির্ধারন করা হত ; তার তুলনায় কাচামাল বা Raw ম্যাটেরিয়াল এর দাম মাত্র ৩-৪%। সুতরাং তারা যদি রকেট না কিনে নিজেরা তৈরি করতে পারেন ; তবে কম দামে ভালো রকেট প্রস্তুত করতে পারবেন; পাশাপাশি সেই রকেট বিক্রয় করে ৭০% পর্যন্ত বেশি মুনাফাও অর্জন করে নিতে পারবেন। যেই কথা সেই কাজ ইলোন মাস্ক অতঃপর স্পেস এক্স এর ইনভেস্টরদের থেকে রকেট প্লান্ট বানানোর ইনভেস্টমেন্ট হাতে নেয়ারর পর স্পেস এক্স পুরোদমে কাজ করতে শুরু করে দেয়। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটি রকেট তৈরি করতে ৮৫% শতাংশ কাজ স্পেস এক্স নিজেরাই করে আসছে।

প্রাইভেট কোম্পানি হিসেবে স্পেস এক্সই একমাত্র যারা কিনা ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে স্পেসক্রাফ্ট পাঠিয়েছে ; এতদিন যা করছিলো কেবল নাসা। স্পেস এক্সের এই স্পেসক্রাফ্টের নাম হল ড্রাগন ; আর তারা ২৫শে মে,২০১২ সালে নাসার একটি কার্গো ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে তাদের স্পেসক্রাফ্টের মাধ্যমে নিয়ে যায়। বর্তমানে স্পেস এক্স এর সবচাইতে ভালো রকেট হলো ফ্যালকন ৯ ; তবে অতিশীঘ্রই তাদের সবচেয়ে শক্তিসালী রকেট ‘ফ্যালকন হেভি’ মহাকাশ যাত্রার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে। বর্তমানে স্পেস এক্সের কাছে চার প্রকার রকেট ইঞ্জিন রয়েছে, এগুলো হলো: Merlin, Kestrel, Draco এবং SuperDraco।

ফ্যালকন সিরিজের সকল রকেটে সাধারনত Merlin রকেট ইঞ্জিনটি ব্যবহার করা হয়। আর ফ্যালকন রকেটের দ্বিতীয় স্টেজে সাধারনত Kestrel ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়। আর ড্রাগন নামক স্পেসক্রাফ্টটিতে ব্যবহার করা হয় Draco ইঞ্জিনটি। আর Draco ইঞ্জিনটির আবার নতুন এবং শক্তিসালী ভার্সন বের হয়েছে যার নাম SuperDraco। তাছাড়াও স্পেস এক্স Rapter নামক একটি ইঞ্জিন ডেভেলপ করছে, যেটিকে আন্তঃপৃথিবী মহাকাশে ঘোরার জন্য একটি স্পেসক্রাফ্ট তৈরি করা হবে, তাতে ব্যবহার করা হবে।  স্কেসএক্স এর স্পেসক্রাফ্ট ড্রাগন প্রথম স্টেজে একবার ২০১২ সালে ; আবার দ্বিতীয় স্টেজে তথা ২০১৭ সালে ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন ভ্রমন করে।

Image Credit/ Space X

স্পেস এক্স এর মূল রকেট ম্যানুফ্যাকচারিং কারখানা মূলত স্পেস এক্সের এর প্রধান কার্যালর বা ক্যালিফোর্নিয়া তেই অবস্হিত। টেক্সাসে স্পেস এক্স এর একটি টেস্টিং স্টেশন রয়েছে ; আর এখানে তারা তাদের নতুন উদ্ভাবনকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখে। স্পেস এক্সের কাছে মোট ৪ টি স্পেসক্রাফ্ট এবং রকেট লঞ্চসাইট রয়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে এদের একটি স্যাটেলাইট বা উপগ্রহ ডেভেলপমেন্ট সেন্টার ও গবেষনাগার রয়েছে।

Image Credit/ Space X

স্পেস এক্স একমাত্র প্রাইভেট কোম্পানি যারা মহাকাশে প্রথম রকেট পাঠিয়ে, তা আবার রিকভারও করেছিল। স্পেস এক্স একমাত্র প্রাইভেট কোম্পানি যারা নিজেদের ফান্ডে লিকুইড ফিউলড রকেট মহাকাশে পাঠিয়েছিল। স্পেস এক্স একমাত্র প্রাইভেট কোম্পানি যারা ইন্টারন্যাশানাল স্পেস স্টেশন পর্যন্ত কোনো প্রাইভেট স্পেসক্রাফ্ট নিয়ে গিয়েছিল। এবং স্পেস এক্সই একমাত্র কোম্পানি যারা ২০১২ সালে যে স্পেসক্রাফ্ট ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে পাঠিয়েছিল ; একই স্পেস ক্রাফ্টে করে আবার দ্বিতীয় বারের মত ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে কার্গো বহন করে নিয়ে গিয়েছিল।

স্পেস এক্স এর মহাকাশ যানসমূহঃ

ট্রান্সপোর্ট রকেট ( স্যাটেলাইট ও স্পেসক্র্যাফট  এর জন্য) ফ্যালকন ৯
পৃথিবীর সবচাইতে শক্তিশালী রকেট ফ্যালকন হেভি
স্পেসক্র্যাফট ড্রাগন

স্পেসএক্স কোম্পানিটি থেকে আমরা একজন মানুষের ইচ্ছাশক্তির চরম বাস্তবতার রূপটি দেখতে পাই। বর্তমানে আমাদের দেশের প্রথম স্যাটেলাইট তথা কৃত্রিম উপগ্রহ ‘বঙ্গবন্ধু ১’  যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে স্পেসএক্স এর স্যাটেলাইট পরীক্ষাগারে রয়েছে। এইমাস অথবা আগামী মাসে এটিকে নিয়ে স্পেসএক্স এর ফ্যালকন রকেট মহাকাশের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবে।

তৌহিদুর রহমান মাহিন

কোন কিছু জেনে সেটা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার মধ্য দিয়েই সার্থকতা । আমি মোঃ তৌহিদুর রহমান মাহিন- ভালোবাসি প্রযুক্তিকে , আরও ভালোবাসি প্রযুক্তি সম্পর্কে বেশি বেশি জানতে- জানাতে। নিয়মিত মানসম্মত প্রযুক্তি বিষয়ক আর্টিকেল উপহার দেয়ার প্রত্যয়ে আছি টেকহাবস এর সাথে।

16 comments

সোশ্যাল মিডিয়া

লজ্জা পাবেন না, সোশ্যাল মিডিয়া গুলোতে টেকহাবসের সাথে যুক্ত হয়ে সকল আপডেট গুলো সবার আগে পান!