ইন্টারনেট হিস্টোরি কি সত্যিই ডিলিট করা সম্ভব?

আমরা সবাই ফেসবুক এবং প্রায় অন্যান্য সব সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি খুব সাধারন Meme ম্যাটেরিয়াল দেখে থাকি, তা হচ্ছে ব্রাউজিং হিস্টোরি ডিলিট করা বা ইন্টারনেট হিস্টোরি ডিলিট করা। তাই আমাদের সবারই এতোদিনে এই ধারনা হয়ে গিয়েছে যে, আমরা ইন্টারনেটে যখন যাই করে থাকি না কেন, আমাদের ব্রাউজিং হিস্টোরি ডিলিট করলেই সব নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এবং যাই হয়ে যাক না কেন, ব্রাউজিং হিস্টোরি ডিলিট করতেই হবে। আমি জানি, ব্রাউজিং হিস্টোরি ডিলিট করার প্রয়োজনীয়তা কি। তবে সত্যিই কি ব্রাউজারের ব্রাউজিং হিস্টোরি ডিলিট করলেই সব শেষ? সত্যিই কি ইন্টারনেট হিস্টোরি মুছে ফেলা সম্ভব? আজকে এই বিষয়েই আলোচনা করা যাক।


১৯৯০ থেকে শুরু করে আস্তে আস্তে ইন্টারনেট আমাদের প্রতিদিনের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গিয়েছে। প্রায় ৪ বিলিয়নেরও বেশি মানুষ বর্তমানে সক্রিয়ভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। এই মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা আমাদের সম্পূর্ণ পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকেরও বেশি। এই মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২০০০ সালের দিকে ছিল পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার মাত্র ৭ শতাংশ। ইন্টারনেট জিনিসটি আসলে আস্তে আস্তে সৌখিনতা থেকে বর্তমানে মানুষের মৌলিক চাহিদাতে পরিনত হয়েছে। তবে ইন্টারনেট একটি মজার জায়গা। কারন, এখানে আপনি এমনও মানুষ খুঁজে পাবেন যাদের অনলাইন উপস্থিতি তাদের রিয়াল লাইফের উপস্থিতির থেকে বেশি ইম্পরট্যান্ট। যাইহোক, এসব ভূমিকা করতে করতে আমরা মূল বিষয় থেকে সরে যাচ্ছি।

ইন্টারনেট এত বড় একটি জায়গা এবং মানুষের লাইফের সাথে এত ভালোভাবে জড়িয়ে আছে বলেই ইন্টারনেট ইউজারদের ডেটা কালেক্ট করা এখন অনেক বেশি সহজ হয়ে গিয়েছে এবং বর্তমানে ইউজার ডেটা কালেক্ট করা অনেক বড় একটি বিজনেসই বলা চলে। ইউজার ডেটা কালেক্ট করা নিয়ে ফেসবুকের রিসেন্ট স্ক্যান্ডালের বিষয়ে তো আমরা সবাই জানি। তবে এমনটা ভাবার কোন কারন নেই যে ফেসবুকই একমাত্র ইউজার ডেটা কালেক্ট করছে। সত্যি কথা বলতে, আমি পার্সোনালি এখানে ফেসবুকের কোন দোষ দেখিনা। ইউজার ডেটা কালেক্ট করা এবং সে অনুযায়ী অ্যাড টার্গেট করা এবং প্লাটফর্মকে আরও ভালো করার জন্য সেগুলোকে ব্যবহার করা, এটা সব ধরনের টেক ইন্ডাস্ট্রি অনেক আগে থেকেই করে আসছে, যাদের অনলাইন উপস্থিতি আছে।

ফেসবুকের ডেটা কালেক্ট করার কথা বাদই দিলাম। আপনি হয়তো জানেন না যে, ইউজার ডেটা জিনিসটিকে প্রোডাক্টের মতো সেল করা এবং কেনাও সম্ভব এবং অনেক কোম্পানি অনেক আগে থেকে ইউজার ডেটা কেনা-বেচার কাজ করে আসছে (অন্যান্য কোম্পানি, ফেসবুক না)। আর এই ইউজার ডেটা জিনিসটি অনেকের কাছে বা অনেক কোম্পানির কাছে সোনার থেকেও মূল্যবান। আপনি হয়তো বিশ্বাস করবেন না যে, এসব ইউজার ডেটা কালেক্ট করা এবং সেল করা এবং সেগুলো কেনা এবং আবার কাজে লাগানো, এই সম্পূর্ণ প্রোসেসটি লক্ষ লক্ষ ডলারের বিজনেসও হতে পারে। এমনকি বর্তমানে ইউজার ডেটা তেলের থেকেও বেশি মূল্যবান কিনা সে বিষয়ে ইন্টারনেটে যথেষ্ট আর্গুমেন্ট চলেছে। যদিও এখানে তেল জিনিসটিকে জাস্ট একটি উদাহরণস্বরূপ ব্যবহার করা হয়।

এখন এখানে খুব সহজ একটি প্রশ্ন থেকে যায়। তা হচ্ছে, যেখানে ইউজার ডেটা কালেক্ট করা  এবং সেই ডেটা সেল করাও পর্যন্ত এত বড় একটি ব্যাবসার মতো হয়ে গিয়েছে, সেখানে আপনি কিভাবে ধারনা করেন যে, শুধুমাত্র আপনার ব্রাউজারের ব্রাউজিং হিস্টোরি ডিলিট করলেই সব শেষ? আপনি হয়তো এও জানেন না যে, আপনি ব্রাউজার থেকে যে ব্রাউজিং হিস্টোরি ডিলিট করছেন, আপনার সেই ব্রাউজিং হিস্টোরিগুলো শুধুমাত্র ব্রাউজারেই আছে তা নয়। আপনি শুধুমাত্র আপনার ব্রাউজারে সেভ হয়ে থাকা অফলাইন ব্রাউজিং হিস্টোরি ডিলিট করছেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে। যদিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে আপনি সব ব্রাউজিং হিস্টোরিও ডিলিট করতে পারবেন।

যেমন ধরা যাক, আপনি ক্রোম ব্রাউজার ব্যবহার করেন এবং আপনি ক্রোমের সেটিংস থেকে আপনার সব ব্রাউজিং হিস্টোরি, আপনার ব্রাউজার কুকিস সবকিছুই ডিলিট করে দিলেন বা ক্লিয়ার করে দিলেন। তার মানে কি সেগুলো সবই সারা জীবনের মতো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল? অবশ্যই না। প্রথমিকভাবে গুগল নিজেই আপনাকে বলে দেয় যে এখানে সুধুমাত্র আপনার একই গুগল অ্যাকাউন্টে সাইন ইন করা ডিভাইসগুলোত অফলাইন ব্রাউজিং হিস্টোরি ডিলিট হচ্ছে। গুগল নিজেই আপনাকে জানিয়ে দেবে যে, Your Google account may have other forms of browsing history অর্থাৎ, আপনার গুগল অ্যাকাউন্টে অনলাইনে আরও অনেক ব্রাউজিং হিস্টোরি থাকতে পারে। এবং এসব ব্রাউজিং হিস্টোরি আপনি কোথায় গেলে পাবেন তাও বলে দেয় গুগল, যা আমরা অধিকাংশ ইন্টারনেট ইউজার খেয়াল করেও দেখিনা।

myactivity.google.com এই অ্যাড্রেসে গেলে আপনি দেখতে পাবেন যে আপনার কি কি হিস্টোরি এখনও গুগলের কাছে আছে। এখানে আপনি রিসেন্টলি কি কি সাইট ভিজিট করেছেন, কি কি ভিডিও দেখেছেন এবং এমনকি রিসেন্টলি আপনি আপনার ফোনে কি কি অ্যাপ ওপেন করেছেন সেগুলোর নিখুঁত হিস্টোরি এখানে আছে। প্রত্যেকটি হিস্টোরির পাশে দেখবেন অপশন আছে সেগুলো ডিলিট করার। এবং এমনকি আপনি চাইলে সেখানে যতরকম হিস্টোরি আছে, সবকিছুই একবারে ডিলিট করে দিতে পারবেন। তাহলেই তো সব হিস্টোরি একেবারেই ডিলিট হয়ে গেল, তাই না? না। এখনো আপনার কোন হিস্টোরিই ডিলিট হয়ে যায়নি বা সম্পূর্ণভাবে মুছে যায়নি। হিস্টোরিগুলো ডিলিট করার পরে আপনাকে বলা হবে যে, These items will be permanently deleted from your Google Account অর্থাৎ, যেগুলো আপনি ডিলিট করছেন সেগুলো আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট থেকে সম্পূর্ণভাবে মুছে যাবে। কিন্তু, তার মানে কিন্তু কখনোই এই নয় যে, এই ডেটাগুলো গুগলের সার্ভার থেকে ডিলিট হয়ে যাচ্ছে। তারা শুধুমাত্র আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে এই ডেটাগুলো মুছে ফেলছে। কিন্তু তার ফলে এটা ভাবার কোন কারন নেই যে গুগল তাদের সার্ভার থেকেও এগুলো মুছে ফেলবে।

এখন আপনি কি করবেন? আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট ডিলিট করবেন? গুগল অ্যাকাউন্ট ডিলিট করার মানে এই নয় যে, গুগল আপনার সব ডেটা তাদের সার্ভার থেকে পারমেনেন্টলি ডিলিট করে দেবে। এমনক  গুগল নিজে তাদের টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনসে বলেছে যে আপনার সম্পর্কে কিছু ডেটা তারা সবসময়ই তাদের সার্ভারে রেখে দেবে যদি আপনি আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট ডিলিট করেন তবুও। এবং এই কন্ডিশনটি আপনি না পড়েই অ্যাক্সেপ্ট করেছেন গুগল অ্যাকাউন্ট ক্রিয়েট করার সময়। গুগল বলেনি যে ঠিক কি কি ডেটা তারা রেখে দেবে। গুগল শুধুমাত্র এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে তারা আপনার কোন ডেটা কখনো থার্ড পার্টি কারো কাছে সেল করবেনা বা দেবে না। উল্লেখ্য, এই থার্ড পার্টির মধ্যে কিন্তু আপনি যে দেশে বাস করছেন, সেই দেশের সরকার পড়েনা।

এখানে ইন্টারনেট হিস্টোরি বলতে শুধুমাত্র গুগলের কথা বললাম কারন, আমরা সবাই প্রায় ক্রোম ব্রাউজারই ব্যবহার করি এবং আমরা ব্রাউজার ব্যবহার করে যেসব ওয়েবসাইটে ভিজিট করি আক্ষরিক অর্থেই ইন্টারনেটে যা যা করি সবকিছুই রেকর্ডই গুগল রাখে। এখন কথা হচ্ছে, শুধুমাত্র গুগলের কারনেই আমরা আমাদের ব্রাউজিং হিস্টোরি এবং অন্যান্য সব ইন্টারনেট হিস্টোরি একেবারে মুছে ফেলতে পারিনা? উমম, না। ফেসবুকের কথাই চিন্তা করা যাক। এটা তো গোপন কোন কথা নয় যে ফেসবুক তাদের ইউজারদের পার্সোনাল ডেটা কালেক্ট করছে এবং করে আসছে। তবে এটা জানা কথা যে, আপনি যদি আপনার ফেসবুক আইডি পারমানেন্টলি ডিলিটও করে দেন, তবুও ফেসবুক আপনার সব ডেটা তাদের সার্ভারে রেখে দিতে পারবে এবং রাখবে। বরং আপনিই তাদেরকে এটা করার পারমিশন দিয়েছেন তাদের টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনস অ্যাকসেপ্ট করার মাধ্যমে।

ঠিক তেমনি, একটি ইউটিউব ভিডিও যদি ইউটিউবের নীতিমালা ভঙ্গ করে, তবে তা আপনি টেকডাউন করতেই পারেন রিপোর্ট করে। ভিডিওটি ইউটিউব তাদের সাইট থেকে ঠিকই ডিলিট করে দেবে। তবে সেটি তাদের সার্ভারে ঠিকই থেকে যাবে। ধরুন, আপনি কিছু অবৈধ কাজ করার জন্য একটি ওয়েবসাইট ক্রিয়েট করলেন এবং কাজ শেষে সাইটটি বন্ধ করে দিলেন। কিন্তু আপনি হয়তো জানেন না যে সাইটটি এখনও খুঁজে পাওয়া সম্ভব। আপনি The Wayback Machine ইউজ করে ১০ বছর আগে ডিলিট করা ওয়েবসাইটও খুঁজে বের করতে পারবেন এবং তখন সেই ওয়েবসাইটে কি কি করা হয়েছে তাও দেখতে পাবেন। এখন ভাবুন, আপনি একজন সাধারন মানুষ হয়েই যদি এতটা করতে পারেন, তাহলে প্রোফেশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি এবং আপনার দেশের সরকার ও সিকিউরিটি এক্সপার্টরা আরও কতদূর করতে পারবে। আর সেখানে জাস্ট ব্রাউজারের অফলাইন হিস্টোরি ডিলিট করে গোপন থাকার আশা করা কতোটা হাস্যকর? Because Internet isn’t a joke !


যাইহোক, এই সিম্পল বিষয় নিয়ে অনেক বকবক করলাম। আশা করি কিছুটা হলেও ব্যাখ্যা করতে পেরেছি যে কেন ইন্টারনেট হিস্টোরি সত্যিকারেই ডিলিট করা সম্ভব নয়। ইন্টারনেট হিস্টোরি যদি সত্যিই ডিলিট করা সম্ভব হতো তাহলে সাইবার অপরাধীদের ধরা অনেক অনেক কঠিন হয়ে যেত। আজকের মতো এখানেই শেষ করছি। আশা করি আজকের আর্টিকেলটিও আপনাদের ভালো লেগেছে। কোন ধরনের প্রশ্ন বা মতামত থাকলে অবশ্যই কমেন্ট সেকশনে জানাবেন।


WiREBD এখন ইউটিউবে, নিয়মিত টেক/বিজ্ঞান/লাইফ স্টাইল বিষয়ক ভিডিও গুলো পেতে WiREBD ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুণ! জাস্ট, youtube.com/wirebd — এই লিংকে চলে যান এবং সাবস্ক্রাইব বাটনটি হিট করুণ!

Image Credit : Pexels 

সিয়াম
অনেক ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তির প্রতি আকর্ষণ ছিলো এবং হয়তো সেই আকর্ষণটা আরো সাধারন দশ জনের থেকে একটু বেশি। নোকিয়ার বাটন ফোন থেকে শুরু করে ইনফিনিটি ডিসপ্লের বেজেললেস স্মার্টফোন, সবই আমার প্রিয়। জীবনে টেকনোলজি আমাকে যতটা ইম্প্রেস করেছে ততোটা অন্যকিছু কখনো করতে পারেনি। আর এই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ থেকেই লেখালেখির শুরু.....