ক্যামেরা, সেন্সর, অ্যাপারচার, লেন্স, ওআইএস, ফোকাস | ইত্যাদি নিয়ে বিস্তারিত

ক্যামেরা

বন্ধুরা যখনই আমরা দুইটি স্মার্টফোন ক্যামেরা তুলনা করার চেষ্টা করি তখনই স্পেসিফিকেশনে অনেকবার এমন কিছু টার্ম চলে আসে, যে টার্ম গুলোর সম্পর্কে ভালো জ্ঞান না থাকলে তুলনা করা অনেক মুশকিল হয়ে পড়ে। তো আজকের এই পোস্টে ক্যামেরা নিয়ে সকল টার্ম গুলো এবং তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করতে চলেছি। পোস্টটি মনোযোগ সহকারে পড়ুন, আশা করি অনেক কিছু নতুন বিষয় সম্পর্কে জানতে পারবেন।

আরো পড়ুন

ক্যামেরা সেন্সর ( Sensor)

ক্যামেরা বৃত্তান্ত

দেখুন যেকোনো ক্যামেরার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশটি হচ্ছে সেন্সর। মোবাইল ফোনে সাধারনত দুই ধরনের সেন্সর দেখতে পাওয়া যায়, একটি হলো সিমোস (CMOS) এবং আরেকটি হলো বিএসআই (BSI)। বিএসআই সেন্সর সিমোস সেন্সরের তুলনায় লো লাইট পারফর্মেন্সের ক্ষেত্রে সামান্য একটু বেশি ভালো হয়। এবং সর্বোপরি একটি ঝকঝকে ইমেজ আপনাকে তৈরি করে দেয়। বিএসআই সেন্সরটি ফ্লিপ করে লাগানো থাকে, ফলে ক্যামেরায় যে লাইট প্রবেশ করে তা সেন্সর এর পেছনে চলে যায় এবং লাইট প্রতিফলিত খুব কম হয় তাই ঝকঝকে ইমেজ কোয়ালিটি দেখতে পাওয়া যায়।

সেন্সরে আরেকটি টার্ম থাকে যেটাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো সেন্সর সাইজ। দেখুন প্রত্যেকটি সেন্সর সাইজ বর্ণনা করার জন্য একটি নাম্বার থাকে। যেমন ১/২.৩, ১/২.৬ ইত্যাদি। তো সহজ ভাবে বুঝতে ১ ভগ্নাংশের সাথে যে নাম্বার থাকবে তা যতো ছোট হবে আপনার সেন্সর সাইজ ততো বড় হবে। আর আপনার সেন্সর সাইজ যতো বড় হবে তো বড় পিক্সেলস ও পাবেন আপনি। আর যতো বড় পিক্সেলস হবে ইমেজও ততো বেশি আলোকিত এবং ঝকঝকে হবে।

অ্যাপারচার (Aperture)

ক্যামেরা অ্যাপারচার

চলুন এবার কথা বলি অ্যাপারচার নিয়ে। আপনি হয়তো দেখে থাকবেন যে f/1.8, f/2.0, f/2.2 ইত্যাদি নাম্বার দিয়ে ক্যামেরার অ্যাপারচার প্রকাশ করা থাকে। কিন্তু এগুলো আসলে কি হয়? দেখুন এই নাম্বারে যে ছোট হাতের এফ দেখতে পাওয়া যায় তা হলো আপনার ক্যামেরার লেন্সের ফোকাল লেন্থ। এবং যে নাম্বারটি নিচে থাকে তা হলো আপনার ক্যামেরার যে ওপেনিং থাকে মানে ক্যামেরাতে যে হোল থাকে যার মাধ্যমে আলো ক্যামেরাতে প্রবেশ করে তার ডায়ামিটার। এই নাম্বারটি মূলত একটি রেসিয়ো আপনার লেন্সের ফোকাল লেন্থ এবং ক্যামেরার ওপেনিং ডায়ামিটার এর মধ্যকার। যেসকল বড় ডিএসএলআর ক্যামেরা থাকে সেখানে এটি ম্যানুয়ালি অ্যাডজাস্ট করার অপশন থাকে। কিন্তু মোবাইল ফোনে এটি ম্যানুয়ালি অ্যাডজাস্ট করার সুবিধা পাবেন না। অর্থাৎ কোম্পানির পক্ষথেকে ডিফল্ট ভাবে যে অ্যাপারচার পাওয়া যায় সেটিই সবসময় থাকে।

কোন অ্যাপারচারটি বেশি ভালো তা জানার জন্য একটি সহজ বিষয় আপনাকে বলে দেয়, দেখুন অ্যাপারচার নাম্বারে এফ ভগ্নাংশের পরে যে নাম্বারটি থাকে তা যতো ছোট হবে আপনার ক্যামেরার ওপেনিং তোতোই বড় হবে। এবং ওপেনিং যতো বড় হবে আপনার ক্যামেরা ততো ভালো ভাবে লো লাইট ফটোস উঠাতে পারবে। এবং যে শ্যালো ডেফত অফ ফিল্ড ইফেক্ট থাকে তাও ভালোভাবে দেখতে পাওয়া যাবে। শ্যালো ডেফত অফ ফিল্ড ইফেক্ট হলো, আপনি হয়তো দেখেছেন যে ছবি উঠানোর সময় আপনার সামনে থাকা সাবজেক্ট এর ছবি পরিষ্কার হয় এবং সাবজেক্ট এর পেছনে ঘোলা ইফেক্ট থাকে, তো আপনার ক্যামেরার অ্যাপারচার নাম্বার যতো কম হবে এই ইফেক্ট ততো ভালো দেখতে পাওয়া যাবে।

লেন্স (Lense)

ক্যামেরা লেন্স

বন্ধুরা চলুন এবার কথা বলি লেন্স নিয়ে। দেখুন সত্য কথা বলতে লেন্স আজকের দিনে ক্যামেরা তুলনা করার জন্য তেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। সাধারনত মোবাইল ফোনে ৫ এলিমেন্ট লেন্স অথবা ৬ এলিমেন্ট লেন্স দেখতে পাওয়া যায়। আবার কিছু মোবাইল ফোনে বড় ব্র্যান্ডের লেন্স ব্যাবহার করার নাম শুনতে পাওয়া যায়, যেমন স্ন্যাইডার অপটিক্স বা কার্ল জিস অপটিক্স ইত্যাদি। তো আসলে লেন্স তেমন একটি জরুরী বিষয় নয়, এবং তুলনা করা একটু মুশকিলের কাজ তাই এই বিষয়টি আপনি ইগনোরও করতে পারেন।

ওআইএস (OIS)

এবার কথা বলা যাক ক্যামেরার ওআইএস প্রযুক্তি নিয়ে। ওআইএস নিয়ে বিস্তারিত করে একটি আলাদা পোস্ট করে ফেলবো একসময়। এখন এর কিছু বেসিক বিষয় গুলো সম্পর্কে জানি। দেখুন অনেক সময় হয় কি, ফটো উঠানোর সময় আপনার হাত হয়তো সামান্য একটু কেপে যায় ফলে ছবি ঘোলা আসে। কিন্তু আপনার ক্যামেরায় যদি ওআইএস ফিচারটি থাকে তবে হাত কেপে গেলেও ভালো পিকচার উঠানো সম্ভব। তাছাড়াও এটি থাকার ফলে আপনি লো লাইট পারফর্মেন্সও ভালো দেখতে পাবেন। আবার ভিডিও রেকর্ড করার সময় ওআইএস থাকার ফলে রেকর্ডিং কাপাকাপা না উঠে একটি স্থির ভিডিও রেকর্ডিং হয়ে থাকে। তো আপনার ক্যামেরায় ওআইএস থাকা অনেক ভালো একটি ব্যাপার। যদি আপনার ক্যামেরায় ওআইএস থাকে তবে এটি আপনার জন্য সুবিধা জনক।

আরো পড়ুন

ফোকাস টেকনোলজি (Focus Technology)

ফোকাস টেকনোলজি

ফোকাস প্রযুক্তি সম্পর্কে আপনি হয়তো অনেক নাম শুনেছেন। যেমন লেজার অটো ফোকাস, ফেজ ডিটেকশন অটো ফোকাস, এবং সাধারন অটো ফোকাস। এখন এই তিন ফোকাস প্রযুক্তির মধ্যে লেজার অটো ফোকাস সবচাইতে উন্নত প্রযুক্তি। লেজার অটো ফোকাস হলো আপনার ফোনের ক্যামেরার পাশে থাকা একটি ছোট যন্ত্রাংশ। এটি একসাথে একটি বড় এরিয়া জুড়ে অনেক গুলো লেজার বিম ছড়িয়ে দেয়। এবং এই বিম গুলো সামনে থাকা বিষয় বস্তুর সাথে ধক্কা খেয়ে ফিরে আসে। মনে করুন আপনার সামনে লেজার অটো ফোকাস নেওয়া হলো। এখন এই ফোকাস থেকে বের হওয়া কিছু বিম আপনার শরীরের সাথে ধাক্কা লেগে ফেরত আসবে এবং কিছু বিম আপনাকে পাশ কাটিয়ে আপনার পিছনের কোন পরিবেশের উপর ধাক্কা লেগে ফেরত আসবে। আপনার আপনার ফোন এই দুই প্রকার বিমের দূরত্ব মেপে এবং ফেরত আসার সময়ের উপর নির্ভর করে সাবজেক্ট এর আসল অবস্থান নির্ণয় করে। এবং সে অনুসারে এটি ক্যামেরার লেন্সকে মুভ করে একটি ফোকাসড ইমেজ তুলতে সাহায্য করে থাকে। তো একই ভাবে আপনি যখন কোন লেজার অটো ফোকাস ওয়ালা ফোনে ট্যাপ টু ফোকাস করে থাকেন তখন ক্যামেরাতে আপনি যেখানে ট্যাপ করেন আপনার ফোনের লেজার সেখানে লখ্য করে বিম ছুড়ে মারে। আবার সেই বিম ফেরত আসার সময়ের উপর নির্ভর করে বস্তুটির দূরত্ব নির্ণয় করে এবং ক্যামেরার লেন্সকে ঐ দিকে মুভ করে ফোকাস করাতে সাহায্য করে।

এবার কথা বলি ফেজ ডিটেকশন অটো ফোকাস নিয়ে। ফেজ ডিটেকশন অটো ফোকাস আইফন ও স্যামসাং এ দেখতে পাওয়া যায়। এতে কি হয়, দেখুন আপনার ফোনে যে সেন্সর থাকে সেটি অবজেক্ট থেকে আসা ইঙ্কামিং লাইট এর ফেজকে ডিটেক্ট করে। এর মানে সামনে যে বস্তু থেকে আলো ক্যামেরায় এসে পৌছায় ক্যামেরা চেষ্টা করে সে আলোর উপর নির্ভর করে ফোকাস লক করতে।

এবার কথা বলি সাধারন অটো ফোকাস এর ব্যাপারে যেটি প্রায় সকল সাধারন ক্যামেরায় দেখতে পাওয়া যায়। দেখুন এটি একটি কনট্রাস্ট নির্ভর ফোকাস প্রযুক্তি। এটি আপনি এবং আপনার ব্যাকগ্রাউন্ডের কনট্রাস্ট লেভেলের উপর ফোকাস করার চেষ্টা করে থাকে। এতে কোন লেজার বিম বা ফেজ ডিটেকশন প্রযুক্তি থাকে না। আপনি যখনই ট্যাপ করবেন ফোকাস করার জন্য তখন এটি ফোকাস করে নেবে। অনেক সময় আবার এটি ফোকাস করতে একটু দেরি করে থাকে। আবার লো লাইটে এটি ভালো ফোকাস করার জন্য ফ্ল্যাশ ফায়ার করে। কেনোনা লো লাইটে কনট্রাস্ট নির্ভর ফোকাস করতে বেশ মুশকিল হয়ে থাকে। এর জন্যই এটি ফ্ল্যাশের মাধ্যমে পরিবেশকে আলোকিত করে এবং ফোকাস সম্পূর্ণ করে ইমেজ উঠিয়ে ফেলে।

ফ্ল্যাশ (Flash)

ক্যামেরা ফ্ল্যাশ

ক্যামেরার ফ্ল্যাশে মোট তিন প্রকারের ফ্ল্যাশ দেখতে পাওয়া যায়। সিঙ্গেল এলিডি ফ্ল্যাশ, ডুয়াল এলিডি ফ্ল্যাশ, এবং ডুয়াল টোন ফ্ল্যাশ। আগে কিছু নোকিয়ার ফোনে এবং সনির ফোনে জেনন ফ্ল্যাশ দেখতে পাওয়া যেতো কিন্তু আজকের দিনে তা আর দেখতে পাওয়া যায় না। দেখুন সিঙ্গেল এলিডি ফ্ল্যাশের মানে হলো এতে একটি এলিডি রয়েছে। যখন আপনি ফ্ল্যাশ করবেন তখন এই এক এলিডি তার লাইট উৎপন্ন করবে এবং আপনি ছবি পেয়ে যাবেন। ডুয়াল এলিডি ফ্ল্যাশ মানে এতে দুটি এলিডি রয়েছে ফলে ফ্ল্যাশে আপনি বেশি আলো দেখতে পাবেন।

ডুয়াল টোন ফ্ল্যাশে দুটি এলিডি লাগানো থাকে কিন্তু দুটি এলিডির কালার আলাদা আলদা হয়ে থাকে। একটি হয়ে থাকে কুল টাইপ অর্থাৎ ব্লুইস এবং আরেকটি হয়ে থাকে ওয়ার্ম টাইপ অর্থাৎ ইয়োলোইস। এই ফ্ল্যাশ তার আলো অনুসারে এবং সাবজেক্ট অনুসারে এর দুটি আলোকে একসাথে মিশিয়ে গড়ে একটি কালার উৎপন্ন করে এবং আপনি একটি ন্যাচারাল ফটো দেখতে পান।

ইমেজ প্রসেসিং (Image Processing)

ইমেজ প্রসেসিং সিস্টেম প্রতিটি ক্যামেরার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি কোন যন্ত্রাংশ নয় বরং এটি একটি সফটওয়্যার। আলাদা আলদা কোম্পানি ইমেজ প্রসেসিং এর জন্য আলাদা আলাদা প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকে। যেমন অ্যাপেলের ইমেজ প্রসেসিং সফটওয়্যার অনেক ভালো হয়ে থাকে, ফোনে হয়তো ক্যামেরার জন্য বেশি অপশন থাকে না, জাস্ট টাইমার সেট ফ্ল্যাশ অন অফ ইত্যাদি থাকে। কিন্তু যখনই আপনি ফটো উঠান তখন অ্যাপেল সেই ফটোকে এতো ভালো করে প্রসেসিং করে যে আউটপুট অনেক ভালো আসে।

স্যামসাং এর ফোন গুলোতে দেখেছি ইমেজ প্রসেসিং হওয়ার সময় ইমেজকে বেশি কালারফুল করে দেয়। সনি এবং এলজির ফোন গুলো তাদের ইমেজকে অনেক বেশি শার্প করে দেয়, ফলে একদম ন্যাচারাল ইমেজ দেখতে পাওয়া যায় না। তো ইমেজ প্রসেসিং মূলত এমন একটি সিস্টেম যেখানে খারাপ ইমেজকেও ভালো বানানো যায় এবং আপনার ক্যামেরায় যদি অনেক ভালো যন্ত্রাংশও লাগানো থাকে কিন্তু আপনার ইমেজ প্রসেসিং সিস্টেম যদি তেমন ভালো না হয় তবে আপনি ভালো ইমেজ আউটপুট দেখতে পাবেন না। তো এজন্যই দুটি স্মার্টফোনের ক্যামেরার সকল স্পেসিফিকেশন যদি এক হয় কিন্তু ইমেজ প্রসেসিং সিস্টেম যদি আলাদা আলাদা হয় তবে দুইটি ফোন এক মতো করে ছবি উঠাতে পারবে না।

শেষ কথা


WiREBD এখন ইউটিউবে, নিয়মিত টেক/বিজ্ঞান/লাইফ স্টাইল বিষয়ক ভিডিও গুলো পেতে WiREBD ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুণ! জাস্ট, youtube.com/wirebd — এই লিংকে চলে যান এবং সাবস্ক্রাইব বাটনটি হিট করুণ!

আশা করছি এই পোস্টটি পড়ার পরে আপনি আপনার নতুন ক্যামেরা ফোনটি আসল ভাবে নির্বাচন করতে পারবেন এবং অন্য ফোনের ক্যামেরার সাথে খুব ভালোভাবে তুলনা করতে পারবেন। প্রয়োজনে আপনি ফোন গুলোর রিভিউ দেখুন তারপর দেখুন কোনটির অ্যাপারচার ভালো, কোনটির ইমেজ প্রসেসিং সফটওয়্যার ভালো এবং এসকল বিষয় খেয়াল রেখে আপনার নতুন ফোনটি ক্রয় করুন। যাই হোক, পোস্টটি ভালো লাগলে বা আপনার উপকারে আসলে অবশ্যই শেয়ার করুন এবং আপনার যেকোনো প্রকারের প্রশ্নে কমেন্ট করে জানান।

তাহমিদ বোরহান
প্রযুক্তির জটিল টার্মগুলো কি আপনাকে বিভ্রান্ত করছে? কিছুতেই কি আপনার মস্তিষ্কে পাল্লা পড়ছে না? তাহলে বন্ধু, আপনি এবার সঠিক জায়গায় এসেছেন—কেনোনা এখানে আমি প্রযুক্তির সকল জটিল বিষয় গুলো ভাঙ্গিয়ে সহজ পানির মতো উপস্থাপন করার চেষ্টা করি, যাতে সকলে সহজেই সকল টেক টার্ম গুলো বুঝতে পারে।