বুট লোডার, কার্নেল, রিকভারি, রম, ফ্লাশিং | কি? কীভাবে কাজ করে?

বুট লোডার, কার্নেল, রিকভারি, রম, ফ্লাশিং

আমি এতোদিনে আমার অনেক পোস্টে বুট লোডার, কার্নেল, রিকভারি, রম, ফ্লাশিং ইত্যাদি বিষয় গুলোর নাম উচ্চারন করেছি। কিন্তু কখনো এগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করি নি। তাই আজ ভাবলাম এগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে একটি পোস্ট তৈরি করে ফেলি। কেনোনা অনেকেই জানেন না যে, এগুলো কি এবং কীভাবে কাজ করে থাকে। তো চলুন একে একে সব কিছুর সম্পর্কে জানা যাক।

আরো জানুন

বুট লোডার

বন্ধুরা চলুন সর্বপ্রথম আলোচনা করা যাক বুট লোডার নিয়ে। বুট লোডার এমন একটি কোড যা আপনার ফোন অন হতেই সবার আগে রান হয়ে পড়ে। এটি চেক করে দেখে যে আপনার অ্যান্ড্রয়েড এর সিস্টেম একদম ঠিকঠাক আছে কিনা, এবং সব কিছু ঠিকঠাক ভাবে কাজ করছে কিনা। এবং কোন ফাইল মিসিং আছে কিনা সেটাও চেক করে দেখে এটি। তো এসব কিছু চেকআপ করার পরেই আপনার অ্যান্ড্রয়েড রান হয়, এবং আপনি ঠিক ভাবে কাজ করা শুরু করতে পারেন।

বুট লোডার সাধারনত দুই প্রকারের হয়ে থাকে একটি হলো লক্‌ড এবং আরেকটি আনলক্‌ড। বুট লোডার আনলক করার প্রসেস আলাদা ফোনে আলদা আলদা হয়ে থাকে। কিছু নেক্সাস ফোনের যদি কথা বলি তো সেখানে এটি আনলক করা বড়ই সহজ, মাত্র এক ক্লিকে এটি আনলক করা যায়। আবার স্যামসাং বা এইচটিসি ফোন গুলোতে আনলক করা হালকা মুশকিল হয়ে থাকে। কিন্তু বুট লোডার আনলক করার পরেই আপনি আপনার ফোনে কাস্টম রম বা কাস্টম রিকভারি ইত্যাদি ফ্ল্যাশ করতে পারবেন। একটি লক্‌ড বুট লোডার আপনাকে এসব করার অনুমতি কখনোয় প্রদান করে না। একটি ফোন নির্মাতা কোম্পানি এজন্যই তাদের ফোনের বুট লোডার লক করে রাখে কেনোনা, তারা কখনোয় চায়না যে একজন ব্যবহারকারী তাদের ইচ্ছা মতো কোন সফটওয়্যার দিয়ে ফোনটি ফ্ল্যাশ করে। তারা সবসময় এটাই চায় যে, তারা যে সফটওয়্যারটি ফোনটির সাথে ডিফল্ট ভাবে দিয়ে দিয়েছে সেটাই একজন ব্যবহারকারী ব্যবহার করুক।

আবার আপনারা অনেকে এটাও শুনেছেন যে, ফোন রুট করে তারপর কাস্টম রম ফ্ল্যাশ করার পরে ফোনটি বুট লুপে চলে গেছে এবং ফোন অন হচ্ছে না। আপনি যদি ফ্লাশিং ঠিক মতো না করেন তবে ফোনটি বুট লুপে চলে যেতে পারে। কেনোনা আগেই বললাম ফোন অন হওয়ার সাথে সাথে বুট লোডার সব ফাইল গুলোকে চেক করে দেখে। যদি দেখে যে সব ঠিক আছে তবেই ফোনটি অন করে আর যদি কোন ফাইল মিসিং হয় তবে বুট লোডার অ্যান্ড্রয়েডকে রিস্টার্ট করে দেয় এবং একই প্রসেস বারবার হতে থাকে এবং আপনার ফোন বুট লুপে চলে যায়।

কার্নেল

চলুন এবার কথা বলি কার্নেল সম্পর্কে। দেখুন প্রত্যেকটি অপারেটিং সিস্টেমেই কার্নেল থাকে। সেটা উইন্ডোজ হোক বা লিনাক্স হোক বা অ্যান্ড্রয়েড হোক আর যেকোনো কিছুই হোক। কার্নেল হলো সফটওয়্যার এবং হার্ডওয়্যার এর মধ্যকার একটি ব্রীজ। অর্থাৎ সফটওয়্যার এর যখনই কোন হার্ডওয়্যারের প্রয়োজন পড়ে তখন সফটওয়্যার তা কার্নেলকে রিকুয়েস্ট করে এবং কার্নেল সেই রিকুয়েস্ট সম্পূর্ণ করে দেয়। অথবা হার্ডওয়্যার যদি সফটওয়্যারের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে চায় তবে সেটিও কার্নেলের মাধ্যমেই সম্পূর্ণ হয়ে থাকে।

উদাহরণ স্বরূপ মনে করুন আপনি আপনার ফোনের গুগল ভয়েস সার্চ আইকনে ট্যাপ করলেন। এর মানে আপনি আপনার ভয়েস ব্যবহার করে গুগলে কিছু সার্চ করতে চাচ্ছেন। তো যখনই আপনি ঐ জায়গায় ট্যাপ করেছেন সাথে সাথে আপনার ফোনের টাচ স্ক্রীনের কাছে সেই তথ্য চলে গেছে যে আপনি কথায় ট্যাপ করেছেন। তারপর টাচ স্ক্রীন কার্নেলকে সেই তথ্য পাঠিয়ে দেয় যে অমুক স্থানে ট্যাপ করা হয়েছে তারপর কার্নেল সফটওয়্যারকে সেই তথ্য সরবরাহ করে দেয়। সফটওয়্যারটি সেই তথ্য পাবার পরে বুঝতে পারে যে আপনি কোন কিছু অনুসন্ধান করতে চাচ্ছেন, তারপর সফটওয়্যার কার্নেল এর কাছে একটি রিকুয়েস্ট পাঠায় যে সে জেনো ফোনের মাইক্রোফোন কে অন হতে বলে এবং ইউজার কি বলল তা শুনে জেনো সফটওয়্যারকে বলে দেয়। এরপর কার্নেল মাইক্রোফোনকে অন হতে বলে, তারপর আপনি যা বলেন তা আপনার ফোনকে শুনতে দেয় এবং আপনার সার্চ সম্পূর্ণ হয়ে যায়।

তো কার্নেল হলো আপনার ফোনের সফটওয়্যার এবং হার্ডওয়্যার এর মাঝখানের একটি ব্রীজ। এবং এর সাহায্যে দুজনেই দুজনের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হয়। যদি আপনি আপনার ফোনের কার্নেল পরিবর্তন করেন তবে এর সাহায্যে আপনি আপনার ফোনের পারফর্মেন্স বাড়াতে পারবেন, ফোনের পারফর্মেন্স স্লো করতে পারবেন, আপনি যদি চান তো ব্যাটারি লাইফও বাড়াতে পারবেন।

আরো ভালো লাগতে পারে

রিকভারি

দেখুন রিকভারি এমন একটি টুল যেটিকে আপনি আপনার কম্পিউটারের বায়োসের সাথে তুলনা করতে পারেন। যদিও এটি পুরোপুরি বায়োস নয় তারপরেও আপনি উদাহরণ নেওয়ার জন্য তুলনা করতে পারেন। যাই হোক, রিকভারি সাধারনত ২ প্রকারের হয়ে থাকে, স্টক রিকভারি এবং কাস্টম রিকভারি। দেখুন প্রত্যেকটি অ্যান্ড্রয়েড ফোনে, সেটি যে কোম্পানিরই হোক না কেন, একটি স্টক রিকভারি থাকে। এবং সেই স্টক রিকভারিটি ঐ ফোনের নির্মাতা কোম্পানি সরবরাহ করে থাকে। এবং আপনি ঐ রিকভারির সাহায্যে আপনার ফোনে অফিসিয়াল রম ফ্ল্যাশ করতে পারেন, আপনি আপনার বর্তমান রমের ব্যাকআপ নিতে পারেন, আপনি আপনার ফোনকে ডিলিট করতে পারেন, ফোনকে ওয়াইপ করতে পারেন, ফোনকে ফরম্যাট করতে পারেন, আবার কিছু ইন্সটল করতে পারেন ইত্যাদি। তো এইসব কাজ আপনি এক স্টক রিকভারির সাহায্যে করতে পারেন।

কিন্তু আপনি যদি আপনার ফোনে একটি কাস্টম রম ব্যবহার করে ফ্ল্যাশ করেন তবে, আপনি স্টক রিকভারি থেকে অনেক বেশি অপশন উপভোগ করতে পারবেন। একটি কাস্টম রিকভারির সাহায্যে আপনি কাস্টম রম ফ্ল্যাশ করতে পারবেন, আপনি কার্নেল ফ্ল্যাশ করতে পারবেন, আপনি যদি চান তবে ফোনে আলাদা থিম ফ্ল্যাশ করতে পারবেন। অর্থাৎ সেই সকল বিষয় আপনি অনেক সহজেই করতে পারবেন যা আপনাকে স্টক রিকভারি করার অনুমতি প্রদান করে না। কাস্টম রিকভারির সাহায্যে আপনার ফোন ফরম্যাট করতে পারবেন, ইচ্ছা মতো মোডস ফ্ল্যাশ করতে পারবেন, ফোনের ব্যাকআপ নিতে পারবেন ইত্যাদি। আপনি যদি আপনার ফোনকে রুট করেন এবং আপনার ফোনের সাথে অনেক আডভান্স কিছু করার চিন্তা করেন তবে কাস্টম রিকভারি আপনার জন্য উপযুক্ত হবে।

রম

রম (ROM) কে সাধারন ভাষায় বলা হয়ে থাকে রীড অনলি মেমোরি (Read Only Memory)। কিন্তু শুধু এর পুরা নাম জেনে এর কাম আন্দাজ করা মুশকিল। রমের ভেতর আপনার ফোনের পুরো সফটওয়্যার অবস্থান করে। এবং ফোন অন করার সাথে সাথে যে বিষয় গুলো ঘটতে আরম্ভ করে তা সব রম থেকে শুরু হয়। আপনি রম থেকে সব কিছু রীড করতে পারবেন কিন্তু বদলে আপনি কিছু রাইট বা বদল করতে পারবেন না। অর্থাৎ রম শুধু আপনার ফোন থেকে আপনাকে তথ্য সরবরাহ করবে, কিন্তু আপনি সেখানে কোন কিছু এডিট বা এড করতে পারবেন না।

রমও দুই প্রকারের হয়ে থাকে, স্টক রম এবং কাস্টম রম। স্টক রম হচ্ছে যেটা গুগল নিজে বানিয়ে বিভিন্ন কোম্পানির কাছে সরবরাহ করে সেটা। কিন্তু বিভিন্ন অ্যান্ড্রয়েড ডেভেলপার সেই রমকে কিছু পরিবর্তন করে নির্দিষ্ট ফোনের জন্য নির্দিষ্ট ভাবে ডিজাইন করে আর এই পরিবর্তিত রমই হলো কাস্টম রম। মনে করুন আপনি এলজি জি৫ ব্যাবহার করছেন। তো সেই ফোনের সাথে এলজি যে রম ফ্ল্যাশ করে দিয়েছে বা আপনি কেনার পর থেকে যা ব্যবহার করছেন তা হলো এলজির স্টক রম। কিন্তু আপনি যদি সেটি পরিবর্তন করতে চান তবে কাস্টম রিকভারির সাহায্যে একটি কাস্টম রম আপনার ফোনে ফ্ল্যাশ করতে হবে এবং কাস্টম রম ব্যাবহারের ফলে আপনার ফোনের সম্পূর্ণ ইন্টারফেস পরিবর্তন করে ফেলা যেতে পারে। এবং আপনি আপনার ফোনে অনেক বেশি আডভান্স ফিচার ব্যবহার করতে পারবেন। তবে কত আডভান্স ফিচার ব্যবহার করতে পারবেন তা নির্ভর করে আপনি কোন কাস্টম রমটি ফ্ল্যাশ করেছেন তার উপর। যেমন সবচাইতে জনপ্রিয় কাস্টম রম হলো সাইনজেন মোড, যেটি অনেক লেটেস্ট ফোনের জন্য সহজ প্রাপ্য এবং সবচাইতে বেশি ব্যবহার করা হয়। তাছাড়াও অনেক ডেভেলপারের অনেক রম পাওয়া যায়, যেগুলো তারা স্টক রম থেকে পরিবর্তন করে বানিয়েছেন। এবং সেগুলো ব্যাবহারের মাধ্যমে আপনার ফোনকে এক আলাদা লেভেল দেওয়া সম্ভব।

ফ্লাশিং

এতোক্ষণ ধরে ফ্ল্যাশ করা বা ফ্লাশিং করা সম্পর্কে অনেক শুনলেন, চলুন এবার এর সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক। দেখুন আসলে ইন্সটল করা কেই ফ্লাশিং করা বলা হয়ে থাকে। আমরা যখন কোন কিছু ইন্সটল করি তখন তা কোন অপারেটিং সিস্টেমের উপর করা হয়। কিন্তু ফ্লাশিং করা মানে আগের সবকিছু ঝেড়ে ফেলে দিয়ে নতুন করে একদম ক্লিন করে ইন্সটল করা। ফ্ল্যাশ করে সাধারনত ফোনের রম পরিবর্তন করা হয়। আপনি স্টক রম দ্বারা ফ্ল্যাশ করতে পারেন কিংবা চাইলে কাস্টম রিকভারির সাহায্যে কাস্টম রম দিয়েও ফোন ফ্ল্যাশ করতে পারেন। এবং এই বিষয়টিকেই মূলত ফ্ল্যাশ করা বা ফ্লাশিং করা বলা হয়ে থাকে।

আরো জানুন

শেষ কথা


WiREBD এখন ইউটিউবে, নিয়মিত টেক/বিজ্ঞান/লাইফ স্টাইল বিষয়ক ভিডিও গুলো পেতে WiREBD ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুণ! জাস্ট, youtube.com/wirebd — এই লিংকে চলে যান এবং সাবস্ক্রাইব বাটনটি হিট করুণ!

আশা করছি আজকের আলোচিত বুট লোডার, কার্নেল, রিকভারি, রম, ফ্লাশিং সম্পর্কে সকল তথ্য আপনি ঠিকঠাক ভাবে বুঝে গেছেন। এবং এরপর যখন আপনি আপনার ফোনে কাস্টম রম ফ্ল্যাশ করবেন বা কাস্টম রিকভারি ফ্ল্যাশ করবেন তখন আপনি অবশ্যই বুঝতে পারবেন যে এগুলো কীভাবে কাজ করে, এবং আপনি জানেন যে আপনার ফোনের সাথে আপনি আরো আডভান্স কিছু কীভাবে করতে পারবেন। তো আজকের পোস্ট ব্যাস এটুকুই ছিল। ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করবেন এবং যেকোনো প্রশ্নের জন্য অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন।

তাহমিদ বোরহান
প্রযুক্তির জটিল টার্মগুলো কি আপনাকে বিভ্রান্ত করছে? কিছুতেই কি আপনার মস্তিষ্কে পাল্লা পড়ছে না? তাহলে বন্ধু, আপনি এবার সঠিক জায়গায় এসেছেন—কেনোনা এখানে আমি প্রযুক্তির সকল জটিল বিষয় গুলো ভাঙ্গিয়ে সহজ পানির মতো উপস্থাপন করার চেষ্টা করি, যাতে সকলে সহজেই সকল টেক টার্ম গুলো বুঝতে পারে।