ওয়ানপ্লাস ফাইভ টি : বেজেল-লেস এবং আরও অনেক কিছু!

আমরা প্রায় সবাই জানি যে ওয়ানপ্লাস কোম্পানিটি বাজেট ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোন তৈরি করার জন্য বিখ্যাত। ২০১৬ সালে রিলিজ করা ফ্ল্যাগশিপ কিলার স্মার্টফোন ওয়ানপ্লাস থ্রি, এরপর ২০১৬ এর শেষের দিকে রিলিজ করা এটির একটি আপগ্রেড ওয়ানপ্লাস থ্রিটি এবং এবছর রিলিজ করা ওয়ানপ্লাস ফাইভ সবগুলোই ছিল অসাধারণ স্মার্টফোন। এই ৩ টি ফোনের কথা বললাম কারন, এই তিনটি স্মার্টফোনের জন্যই ওয়ানপ্লাস বর্তমানে এতোটা জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এছাড়া ওয়ানপ্লাসের প্রথম স্মার্টফোন ওয়ানপ্লাস ওয়ান, দ্বিতীয় স্মার্টফোন ওয়ানপ্লাস টু এবং তৃতীয় স্মার্টফোন ওয়ানপ্লাস এক্স ফোনগুলোও যথেষ্ট ভালো ছিল। ওয়ানপ্লাস থ্রি রিলিজ করার পর থেকে ওয়ানপ্লাসের একটি অভ্যাস হচ্ছে, ফোনের নামের সাথে একটি ” টি ” যুক্ত করে দিয়ে প্রত্যেকটি ফোনের একটি করে আপগ্রডেড ভার্শন রিলিজ করা। গতবছর ওয়ানপ্লাস থ্রির পরে তারা এর একটি আপগ্রেডেড ভার্শন রিলিজ করে যার নাম দেয়, ওয়ানপ্লাস থ্রিটি। সেই সুত্র ধরে এবছরও ওয়ানপ্লাস তাদের এবছরের স্মার্টফোন ওয়ানপ্লাস ফাইভের একটি আপগ্রেড রিলিজ করলো যার নাম, ওয়ানপ্লাস ফাইভ টি (Oneplus 5T)। আজকে আলোচনা করবো ওয়ানপ্লাসের রিলিজ করা এই নতুন স্মার্টফোনটি নিয়ে। তো আর কথা না বাড়িয়ে, চলুন দেখা যাক নতুন কি কি থাকছে এই স্মার্টফোনে এবং কি কি চেঞ্জ করা হয়েছে বা ইম্প্রুভ করা হয়েছে।

ডিসপ্লে

এই ডিসপ্লেই হচ্ছে ওয়ানপ্লাস ফাইভ এবং ফাইভ টি এর মধ্যে সবথেকে বড় পার্থক্য। ২০১৭ সালের সবথেকে বড় স্মার্টফোন ট্রেন্ড হচ্ছে, বেজেললেস ডিসপ্লে। শাওমি, এলজি, স্যামসাঙ, অ্যাপল, হুয়াওয়ে ইত্যাদি সব বড় স্মার্টফোন ম্যানুফ্যাকচারার-রা সবাই তাদের নতুন ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোনগুলোতে বেজেললেস স্ক্রিন ব্যবহার করেছে। করেনি শুধুমাত্র ওয়ানপ্লাস। ওয়ানপ্লাস ফাইভের স্ক্রিনটি বেজেললেস নয়। এটা আমাদের মত সাধারন ইউজারদের জন্য খুব বড় কোন ইস্যু না হলেও, ওয়ানপ্লাসের জন্য এটা বেশ লজ্জাজনক। কারন, বেজেললেস স্ক্রিন হচ্ছে ২০১৭ এর স্মার্টফোন ট্রেডমার্ক। যদিও ২০১৭ তে সর্বপ্রথম ওয়ানপ্লাস ফাইভ স্মার্টফোনটিই সবথেকে হাই এন্ড স্পেকস বাজারে এনেছিল, তবুও বেজেললেস স্ক্রিন না থাকার কারণে কিছুটা সমালোচনার শিকারও হতে হয়েছিল ওয়ানপ্লাসকে। তাই এবার আর তারা এই ভুল করেনি। ওয়ানপ্লাস ফাইভ টি-তে ওয়ানপ্লাস ব্যবহার করেছে ৬ ইঞ্চির এজ-টু-এজ এমোলেড ডিসপ্লে যার রেজোলিউশান ১০৮০পি এবং যার অ্যাসপেক্ট রেশিও ২ঃ১ ।

ওয়ানপ্লাস ফাইভ টি

আমি জানিনা তারা কেন এখনো তাদের সুপার হাই এন্ড স্মার্টফোনগুলোতেও ১০৮০পি স্ক্রিন ব্যাবহার করে আসছে। কারন, এই স্মার্টফোনটি, এর আগের রিলিজ করা স্মার্টফোনটি, এবং এমনকি ওয়ানপ্লাসের গত বছরের রিলিজ করা স্মার্টফোনটিও ১৪৪০পি ডিসপ্লে ভালোভাবে হ্যান্ডেল করার জন্য যথেষ্ট পাওয়ারফুল। এটা নিঃসন্দেহে ওয়ানপ্লাসের একটি খারাপ সিদ্ধান্ত, যদিও ওয়ানপ্লাস দাবী করে যে, তারা ১০৮০পি ডিসপ্লে ব্যাবহার করে ফোনের ব্যাটারি লাইফ এবং পারফরমেন্স ইম্প্রুভ করার জন্য। কিন্তু, আমাদের মত সাধারন স্মার্টফোন ব্যবহারকারিদের স্ক্রিন রেজোলিউশান নিয়ে খুব বেশি সমস্যায় পড়তে হবেনা। আপনি যদি স্মার্টফোনের ডিসপ্লে নিয়ে খুব বেশি খুঁতখুতে না হন এবং হার্ডকোর গেমার না হন, তাহলে আপনি সাধারনভাবে দেখে বুঝতেও পারবেন না যে ১০৮০পি এবং ১৪৪০পি ডিসপ্লের মধ্যে পার্থক্য কি। ওয়ানপ্লাস ফাইভ টি-র স্ক্রিন বেজেললেস হওয়ায় এটি ওয়ানপ্লাসের তৈরি করা সবথেকে সুন্দর ডিজাইনের স্মার্টফোন, যদিও ওয়ানপ্লাস ফাইভের ডিজাইনও যথেষ্ট ভালো ছিল। এবং, আমার কাছে পারসোনালি ওয়ানপ্লাস ফাইভ টি-র ডিজাইন এবছর রিলিজ হওয়া অন্যান্য বেজেললেস স্ক্রিনের স্মার্টফোন যেমন, পিক্সেল ২ ও পিক্সেল ২ এক্সেল, এলজি ভি৩০ ইত্যাদির থেকে অনেক বেশি ভালো লেগেছে।

স্পেসিফিকেশনস

ওয়ানপ্লাস ফাইভ টি-র হার্ডওয়্যার সেকশনে ওয়ানপ্লাস তাদের আগের মডেলের থেকে তেমন কিছুই পরিবর্তন করেনি। করেনি না বলে, করার প্রয়োজন পড়েনি বলাই ভালো। কারন, তাদের আগের মডেল অর্থাৎ ওয়ানপ্লাস ফাইভ ফোনে আগে থেকেই এখনও পর্যন্ত এভেইলেবল সবথেকে হাই এন্ড হার্ডওয়্যার ব্যবহার করা হয়েছিল। বর্তমানে এর থেকে বেশি পাওয়ারফুল হার্ডওয়্যার বাজারে এভেইলেবল নয়। তাই ওয়ানপ্লাস ফাইভ এবং ফাইভ টি-র হার্ডওয়্যার সেকসশনে তেমন কোনো চেঞ্জ নেই। পরিবর্তন আনা হয়েছে শুধুমাত্র ফোনের ডুয়াল ক্যামেরা সেটাপ এবং ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর প্লেসমেন্টে। যেহেতু স্মার্টফোনটিতে থাকছে বেজেললেস ডিসপ্লে, তাই এবার আর ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সরটি ফোনের ফ্রন্টে রাখা সম্ভব হয়নি। তাই এবার ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সরটি ফোনের পেছনে রাখা হয়েছে, যেটা খুব বড় কোন সমস্যা নয়। এছাড়া আগের মতই এই স্মার্টফোনটি দুটি ভার্শনে পাওয়া যাবে। ৬ জিবি র‍্যাম এবং ৬৪ জিবি স্টোরেজের একটি ভার্শন থাকবে, এবং ৮ জিবি র‍্যাম এবং ১২৮ জিবি স্টোরেজের আরেকটি সুপার হাই এন্ড ভার্শন পাওয়া যাবে। আর চিপসেট এবং জিপিউ হিসেবে আগের মতই থাকছে স্ন্যাপড্রাগন ৮৩৫ এবং অ্যাড্রেনো ৫৪০ জিপিউ যা এখনো পর্যন্ত সবথেকে পাওয়ারফুল চিপসেট এবং জিপিউ।

ওয়ানপ্লাস ফাইভ টি ওয়ানপ্লাস ফাইভ টি-র প্রধান কয়েকটি স্পেসিফিকেশন নিচের চার্টে দেখতে পারেন। এবং বিস্তারিতভাবে সম্পূর্ণ স্পেসিফিকেশন এখানে দেখতে পারেন।

চিপসেটস্ন্যাপড্রাগন ৮৩৫
জিপিউঅ্যাড্রেনো ৫৪০
র‍্যাম৬ জিবি বা ৮ জিবি
স্টোরেজ৬৪ জিবি বা ১২৮ জিবি
ডিসপ্লে সাইজ ও রেজোলিউশান৬ ইঞ্চি ও ১০৮০ পি
ডিসপ্লে প্রোটেকশনগোরিলা গ্লাস ৫
ক্যামেরা (ব্যাক ও ফ্রন্ট)২০+১৬ ব্যাক ও ১৬ ফ্রন্ট

ক্যামেরা

ক্যামেরার কথা বলতে হলে, তাদের আগের মডেল অর্থাৎ ওয়ানপ্লাস ফাইভে আগে থেকেই ডুয়াল ক্যামেরা সেটাপ ছিল, যার প্রাইমারি ক্যামেরা সেন্সরটি ছিল ২৪ মিলিমিটার ১৬ মেগাপিক্সেল এফ ১.৭ অ্যাপারচারযুক্ত এবং সেকেন্ডারি ক্যামেরাটি ছিল ২০ মেগাপিক্সেল ৩৬ মিলিমিটার লেন্স, যার অ্যাপারচার এফ ২.২। আর, এবার ওয়ানপ্লাস ফাইভ টি-তে থাকছে প্রাইমারি ২০ মেগাপিক্সেল সেন্সর এবং সেকেন্ডারি ১৬ মেগাপিক্সেল সেন্সর যাদের দুটিই ২৭ মিলিমিটার লেন্স এবং দুটিই ১.৭ অ্যাপারচারযুক্ত। ওয়ানপ্লাসের ভাষ্যমতে, ওয়ানপ্লাস ফাইভ টি-র সেকেন্ডারি ক্যামেরাটির পিক্সেল সাইজ একটু বড় এবং এটি লো লাইটে ছবি তোলার সময় সাহায্য করবে।

ওয়ানপ্লাস ফাইভ টি

ওয়ানপ্লাস ফাইভ টি ৩০ এফপিএস-এ ৪কে ভিডিও করতে সক্ষম। আর ফ্রন্টে থাকছে ১৬ মেগাপিক্সেল ক্যামেরা যা বেশ ভালো মানের ছবি তুলতে এবং ১০৮০ পি ভিডিও করতে সক্ষম। জুম লেন্স না থাকলেও ওয়ানপ্লাস ফাইভ টি বেশ ভালোভাবেই পোরট্রেইট ছবি তুলতে পারবে, কিন্তু শুধুমাত্র সফটওয়্যার ব্যবহার করে, যেমনটা পিক্সেল ২ করছে।

সফটওয়্যার

ওয়ানপ্লাস এই ফোনটির সফটওয়্যার এক্সপেরিয়েন্সের তেমন কোন পরিবর্তন করেনি। এই ফোনটিতেও ওয়ানপ্লাসের অন্যান্য ফোনের মতই সফটওয়্যার হিসেবে থাকছে অক্সিজেন ওএস যা অ্যান্ড্রয়েড ৭.১ বেজড (আপগ্রেডেবল টু অ্যান্ড্রয়েড ৮)। আক্সিজেন ওএস প্রায় গুগলের পিওর স্টক অ্যান্ড্রয়েডের মতই। কিন্তু অক্সিজেন ওএসে এমন কিছু এক্সট্রা ফিচার আছে যা স্টক অ্যান্ড্রয়েডে নেই। যেমন, হোমস্ক্রিন সোয়াইপ করে কাস্টোমাইজড শেলফ আনা, সিস্টেম ওয়াইড ডার্ক মোড, সিস্টেম ওয়াইড কাস্টম অ্যাকসেন্ট কালার, রিডিং মোড এবং আরও অনেক ধরনের পারসোনালাইজেশন ফিচারস। আর ক্লোজ টু স্টক সফটওয়্যার হওয়ায়, এবং ভালো সফটওয়্যার অপটিমাইজেশনের কারণে ওয়ানপ্লাস স্মার্টফোনগুলোর পারফরমেন্স সবসময়ই টপ-নচ হয়। ওয়ানপ্লাসের ২০১৬ এর পরে রিলিজ হওয়া প্রত্যেকটি স্মার্টফোনই প্রায় গুগল পিক্সেলের মত হাই এন্ড পারফরমেন্স এবং ইউজার এক্সপেরিয়েন্স দেয়। আর এটি ওয়ানপ্লাসের সবথেকে হাই এন্ড স্মার্টফোন তাই এটির ক্ষেত্রেও কোন ব্যাতিক্রম ঘটবে না।

ওয়ানপ্লাস ফাইভ টি

এবছর ওয়ানপ্লাস ফাইভ টি-র অন্যতম বড় একটি ফিচার হচ্ছে এর ফেসিয়াল রিকগনিশন টেকনোলজি। অর্থাৎ, নিজের মুখ স্ক্যান করে ফোন আনলক করার প্রোসেস। ঠিক ধরেছেন, এই বিষয়টি আমরা এবছর আইফোন এক্সে দেখেছি। এটিই ছিল আইফোন এক্সের সবথেকে হাইলাইটেড ফিচার। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই ফেসিয়াল রিকগনিশন ফিচারটি ওয়ানপ্লাস ফাইভ টি-র কোন হাইলাইটেড ফিচার না হলেও, এটি আইফোন এক্সের থেকে অনেক বেশি দ্রুত কাজ করে। এটি অবিশ্বাস্যভাবে আইফোন এক্সের ফেসিয়াল রিকগনিশনের তুলনায় ৫-১০ গুন দ্রুত কাজ করে। তার থেকেও মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই ফেসিয়াল রিকগনিশন টেকনোলজি বাস্তবায়ন করার জন্য অ্যাপলের আলাদা IR ক্যামেরা ফিচারস এবং এমনকি স্পেশাল সেন্সরযুক্ত চিপসেট দরকার হয়েছিল। কিন্তু ওয়ানপ্লাসের তেমন কিছুই দরকার পড়েনি।

তো, এই ছিল ওয়ানপ্লাস ফাইভ টি। এটি এখন ওয়ানপ্লাসের তৈরি নতুন ফ্ল্যাগশিপ কিলার স্মার্টফোন। এই ফোনটির বেস মডেলের দাম ৪৯৯ ইউ এস ডলার। বাংলাদেশে এখনও এভেইলেবল নয় এটি। যখন এভেইলেবল হবে তখন এটির দাম বাংলাদেশি টাকায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজারের মধ্যেই হবে আশা করা যায়। এমন হলে, নিশ্চিতভাবেই এই দামের মধ্যে এটিই বেস্ট ভ্যালু ফর মানি হবে।


আজকের মত এখানেই শেষ করছি। আশা করি আর্টিকেলটি আপনাদের ভালো লেগেছে। কোনো প্রশ্ন মতামত থাকলে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন। ভালো থাকবেন।


WiREBD এখন ইউটিউবে, নিয়মিত টেক/বিজ্ঞান/লাইফ স্টাইল বিষয়ক ভিডিও গুলো পেতে WiREBD ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুণ! জাস্ট, youtube.com/wirebd — এই লিংকে চলে যান এবং সাবস্ক্রাইব বাটনটি হিট করুণ!

Image Credit : MKBHD,Youtube

সিয়াম
অনেক ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তির প্রতি আকর্ষণ ছিলো এবং হয়তো সেই আকর্ষণটা আরো সাধারন দশ জনের থেকে একটু বেশি। নোকিয়ার বাটন ফোন থেকে শুরু করে ইনফিনিটি ডিসপ্লের বেজেললেস স্মার্টফোন, সবই আমার প্রিয়। জীবনে টেকনোলজি আমাকে যতটা ইম্প্রেস করেছে ততোটা অন্যকিছু কখনো করতে পারেনি। আর এই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ থেকেই লেখালেখির শুরু.....