রেজর ফোন : গেমারদের জন্য তৈরি স্মার্টফোন?

রেজর ফোন

আপনারা যারা ল্যাপটপ বা পিসিতে গেম খেলতে ভালবাসেন অথবা গেমিং ডিভাইসগুলো সম্পর্কে ভালো খোঁজ-খবর রাখেন, তাদের কাছে রেজর (Razer) নামটি বেশ জনপ্রিয়। কারণ, রেজর মূলত গেমিং ল্যাপটপ তৈরি করে। রেজর এর তৈরি গেমিং ল্যাপটপগুলো হয় একইসাথে প্রিমিয়াম, পাওয়ারফুল এবং এক্সপেন্সিভ। রেজর নামটিই স্পেশালি গেমিং ডিভাইস তৈরি করার জন্যই বিখ্যাত। এতদিন রেজর শুধুমাত্র গেমিং এর জন্য ল্যাপটপই তৈরি করে আসছে। কিন্তু এবার তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্মার্টফোন তৈরি করার। ঠিক ধরেছেন। যেহেতু রেজর নামের কোম্পানিটি স্মার্টফোন তৈরি করছে, তাই তাদের স্মার্টফোনগুলোও হবে গেমিং ফোকাসড। এবছর নভেম্বরেই তারা অ্যানাউন্স  করেছে তাদের নতুন এবং প্রথম স্মার্টফোন, যার নাম ” রেজর ফোন (Razer Phone) “। এই স্মার্টফোনটি হয়ত কখনো বাংলাদেশে আসবে না, বা আসলেও হয়ত সবাই কিনতে পারবে না। কিন্তু তবুও এটি নিয়ে লেখার কারণ, এটি একটি ভিন্নধর্মী স্মার্টফোন।

স্পেসিফিকেশনস

প্রথমেই শুরু করা যাক স্পেসিফিকেশন দিয়ে। এই ফোনটির ইন্টারনাল স্পেকস বেশ ভালো, যেটা হওয়ারই কথা যেহেতু এই স্মার্টফোনটি গেমারদের জন্য তৈরি। ৫.৭ ইঞ্চির কোয়াড এইচডি আইপিএস ডিসপ্লের ফোনটির ডিজাইন বেশ সিম্পল। আপনি যদি কখনো রেজর ল্যাপটপ ইউজ করে থাকেন, তাহলে আপনি এই ফোনটির সাথে রেজর ল্যাপটপের ডিজাইন ল্যাংগুয়েজের বেশ মিল পাবেন। এছাড়া এই ফোনটির ডিজাইনের সাথে গত বছর রিলিজ হওয়া ” নেক্সটবিট রবিন ” স্মার্টফোনটির ডিজাইনের কিছুটা মিল পাওয়া যায়, যেটা হওয়ারই কথা। কারণ, নেক্সটবিট কোম্পানিটিকে রেজর কিনে নিয়েছে। যাইহোক, ফোনটি সম্পূর্ণ অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি। ফোনটি শুধুমাত্র কালো রঙেই পাওয়া যাবে, যা দেখতে বেশ স্মার্ট এবং মিনিমাল। এই স্মার্টফোনটিতে ২০১৭ এর অন্যান্য বিখ্যাত স্মার্টফোন কোম্পানির তৈরি স্মার্টফোনগুলোর মত বেজেল-লেস স্ক্রিন থাকছে না। কিন্তু এই স্মার্টফোনটির ডিসপ্লেতে থাকছে তার থেকেও আরও ভালো কিছু, যা নিয়ে একটু পরে আলোচনা করবো।

এই ফোনটিতে চিপসেট হিসেবে দেওয়া হয়েছে কোয়ালকমের এখনও পর্যন্ত তৈরি করা সবথেকে পাওয়ারফুল চিপসেট, স্ন্যাপড্রাগন ৮৩৫ এবং জিপিউ হিসেবেও থাকছে কোয়ালকমের সবথেকে পাওয়ারফুল জিপিউ, অ‍্যাড্রেনো ৫৪০। এটি খুব বেশি ইমপ্রেসিভ কিছু না কারণ, ২০১৭ সালে রিলিজ হওয়া প্রায় সব হাই এন্ড অ্যান্ড্রয়েড ফোনেই (উদাহরনস্বরূপ : পিক্সেল ২, এলজি জি৬, গ্যালাক্সি এস৮) এই দুটি চিপসেট এবং জিপিউ ব্যাবহার করা হয়েছে। এছাড়া রেজর ফোনে থাকছে ৮ জিবি র‍্যাম এবং ৬৪ জিবি ইন্টারনাল স্টোরেজ। এছাড়া গেমিং ফোকাসড স্মার্টফোন হওয়ায়, এক্সটার্নাল মাইক্রো এসডি কার্ড সাপোর্টও থাকছে। এছাড়া প্রয়োজনীয় প্রায় সকল সেন্সরও থাকছে এই ফোনে।

রেজর ফোন

এটি গেমিং স্মার্টফোন হলেও এই ফোনের রিয়ারে থাকছে ডুয়াল ক্যামেরা সেটাপ, যার একটি হচ্ছে ১২ মেগাপিক্সেল ১.৮ অ্যাপারচারযুক্ত আরজিবি সেন্সর এবং আরেকটি সেকেন্ডারি ১৩ মেগাপিক্সেল ২.৬ অ্যাপারচারযুক্ত মনোক্রম সেন্সর। এই ফোনটির রিয়ার কামেরা সেটাপের সাথে হুয়াওয়ে মেট ১০ এর মিল রয়েছে। আর ফ্রন্ট ক্যামেরা হিসেবে থাকছে ৮ মেগাপিক্সেল ক্যামেরা। তবে এই ফোনটিতে ২০১৭ এর আরও অন্যান্য হাই এন্ড স্মার্টফোনের মতই কোনো হেডফোন জ্যাক থাকছে না। এছাড়াও থাকছে ডলবি অ্যাটমস সাউন্ড সিস্টেম এবং কোয়ালকম কুইক চার্জ ৪+ সাপোর্ট, যা ফোনটিকে ৩০ মিনিটের মধ্যেই ০% থেকে ৫০% চার্জড করে দিতে সক্ষম। আর এই সম্পূর্ণ ফোনটিকে ব্যাকআপ করছে ৪০০০ মিলি অ্যাম্পিয়ার ব্যাটারি। ফোনটির কিছুটা ডিটেইলড স্পেকস নিচের চার্টে দেখতে পারেন। রেজর ফোনের সম্পূর্ণ স্পেসিফিকেশন এখানে দেখতে পারেন।

চিপসেটস্ন্যাপড্রাগন ৮৩৫
জিপিউঅ্যাড্রেনো ৫৪০
র‍্যাম  এবং স্টোরেজ৮ জিবি এবং ৬৪ জিবি+এসডি কার্ড
ক্যামেরা (রিয়ার এবং ফ্রন্ট)ডুয়াল ১২+১৩ রিয়ার এবং ৮ মেগাপিক্সেল ফ্রন্ট
অ্যান্ড্রয়েড ভার্শন৭.১.১ (নুগাট)
ব্যাটারি ক্যাপাসিটি৪০০০ মিলি অ্যাম্পিয়ার
ডিসপ্লে রেজোলিউশান১৪৪০ পি (কোয়াড এইচডি)
ডিসপ্লে প্রোটেকশনগোরিলা গ্লাস ৩

ডিসপ্লে

সরাসরি ডিসপ্লে সেকশনে আসলাম কারণ, এই ফোনটির ডিসপ্লে নিয়ে বেশ কিছু বলার আছে। এই ফোনটির ডিসপ্লে বাইরে থেকে দেখতে অন্যান্য কোম্পানির হাই এন্ড ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোনগুলোর (নন বেজেল-লেস) মতই। কিন্তু, এই ফোনের ডিসপ্লের স্পেশালিটি হচ্ছে ডিসপ্লের পেছনে বা ফোনের সফটওয়্যারে। এই ফোনটিতে থাকছে পৃথিবীর প্রথম ১২০ ফ্রেমস/সেকেন্ড রিফ্রেশ রেট সাপোর্টেড ডিসপ্লে। আপনি যদি গেমার হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার অবশ্যই ধারণা আছে যে, ফ্রেমরেট বা ফ্রেমস/সেকেন্ড কি এবং এটার কাজ কি। যদি  জেনে থাকেন, তাহলে এইটুকু মনে রাখতে পারেন যে, যতো বেশি ফ্রেমরেট তত বেশি স্মুথ এবং ফ্লুইড এনিমেশন এক্সপেরিয়েন্স। সাধারণত আমাদের এখনকার সব অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন ৩০ এফপিএস বা ৩০ ফ্রেমস/সেকেন্ডে চলে। তাই, সোজা কথায় বলতে হলে, এই স্মার্টফোনটি আপনাদের এখনকার অন্যান্য হাই/মিডরেঞ্জ অ্যান্ড্রয়েড ফোনগুলোর থেকে প্রায় ৪ গুন ফ্লুইড এবং স্মুথলি চলবে।

রেজর ফোন

সফটওয়্যার

এই স্মার্টফোনটির সফটওয়্যার নিয়ে খুব বেশি কিছু বলার নেই। কারণ, এটিতে থাকছে অ্যান্ড্রয়েড ভার্শন ৭.১.১ যা একেবারেই স্টকের মত রাখা হয়েছে, অবশ্যই হালকা কিছু কাস্টোমাইজেশনের সাথে। কিছু কিছু অ্যাপ আইকন চেঞ্জ করা হয়েছে এবং আমার মতে এই ফোনের সফটওয়্যারের সবথেকে ভালো ব্যাপারটি হচ্ছে, এই ফোনে ডিফল্ট লঞ্চার হিসেবে দেওয়া হয়েছে Nova Launcher Prime এবং স্টক অ্যান্ড্রয়েড হওয়া সত্বেও থাকছে নিজস্ব থিম স্টোর। এছাড়া এই ফোনটির সফটওয়্যারকে গেমিং এর জন্য বিশেষভাবে অপটিমাইজও করা হয়েছে।

পারফরমেন্স

ক্যামেরার ব্যাপারে কিছু  বলে সরাসরি পারফরমেন্স সেকশনে গেলাম কারণ,  ফোনের ক্যামেরাটি বা ক্যামেরাগুলো মার্কেটের অন্যান্য ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোনের মতই। তেমন বিশেষ কোনো ফিচার নেই এই ফোনের ক্যামেরাতে। আর পারফরমেন্স নিয়ে বলতে হলে প্রথমেই লক্ষ্য করতে হবে এই ফোনের স্পেকসের দিকে।

আমরা সবাই জানি যে, এখনও পর্যন্ত পারফরমেন্স এবং ডে টু ডে ইউজেসের জন্য গুগল পিক্সেল সিরিজের স্মার্টফোনগুলো বেস্ট কারণ, এর সফটওয়্যার অপটিমাইজেশন এবং পাওয়ারফুল ইন্টারনাল কম্পোনেন্টস। স্টক অ্যান্ড্রয়েড চালিত স্মার্টফোনগুলোর পারফরমেন্স সাধারণভাবেই অন্যান্য কাস্টম ইউজার ইন্টারফেস চালিত অ্যান্ড্রয়েড ফোনগুলোর থেকে ভালো হয়। কারণ, স্টক অ্যান্ড্রয়েড অনেক কম রিসোর্স ব্যাবহার করে। তাই হাই এন্ড হার্ডওয়্যারের ফোনগুলোতে স্টক অ্যান্ড্রয়েড ব্যাবহার করলে সেগুলোর পারফরমেন্স খুবই ভালো হয়। গুগল পিক্সেল এবং ওয়ানপ্লাস ফোনগুলোর পারফরমেন্স ভালো হওয়ার এটাই প্রধান কারণ।

রেজর ফোন

আর রেজর ফোনে স্টক অ্যান্ড্রয়েড, পাওয়ারফুল হার্ডওয়্যার তো থাকছেই, এছাড়াও থাকছে রেজরের সফটওয়্যার অপটিমাইজেশন এবং ১২০ ফ্রেমস/সেকেন্ড এর অবিশ্বাস্য ফ্রেমরেট। যার ফলে আশা করাই যায় যে, এই ফোনেটি এতটাই স্মুথ এবং ফ্লুইড ইউজার এক্সপেরিয়েন্স দিতে সক্ষম হবে যা এখনও পর্যন্ত তৈরি হওয়া অন্য কোনো অ্যান্ড্রয়েড ফোন কখনো পারেনি। নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, এই ফোনটির পারফরমেন্স এবং ইউজার এক্সপেরিয়েন্স হবে টপ- নচ।

এছাড়া ফোনটির অ্যাডভান্টেজ সবথেকে ভালো বোঝা যাবে গেমিং করার সময়, যেহেতু এটি একটি গেমিং ফোকাসড স্মার্টফোন। যারা পিসিতে হাই এন্ড গেমস খেলে থাকেন তারাই ভালো জানেন যে গেমিং এর ক্ষেত্রে ফ্রেম রেট ভালো থাকা কতটা ইম্পর্ট্যান্ট। ফ্রেম রেট যতো বেশি হবে, গেমিং পারফরমেন্স তত ভালো হবে এবং গেম তত বেশি স্মুথলি খেলা সম্ভব হবে। এই ফোনে অবিশ্বাস্য রকমের ১২০ ফ্রেমস পার সেকেন্ড সাপোর্ট থাকায়, যেসব গেমে ফ্রেম রেট আনলকড থাকে, সেগুলো এই ফোনে অন্যান্য স্মার্টফোনের থেকে প্রায় ৪ গুন বেশি স্মুথলি চলবে। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এই ফোনে আপনি এমন অসাধারণ গেমিং এক্সপেরিয়েন্স পাবেন, যা আগে কখনো অন্য কোনো অ্যান্ড্রয়েড ফোনে পান নি।

শেষ কথা

এই ফোনটির প্রাইস প্রায় ৮৭৩ ইউএস ডলার যা এবছর রিলিজ হওয়া অন্যান্য হাই এন্ড ফ্ল্যাগশিপ ফোনগুলোর মতোই। রেজর ফোন এক কথায় একটি ভিন্নধর্মী, পাওয়ারফুল এবং অসাধারণ স্মার্টফোন। যে কোম্পানিটি গেমিং ল্যাপটপ তৈরি করার জন্য এতদিন বিখ্যাত ছিল, তাকে এবার স্মার্টফোন তৈরি করতে দেখাটা সত্যিই গেমারদের জন্য স্যাটিসফাইং। আপনি যদি স্মার্টফোন অনেক বেশি গেম খেলেন এবং সব গেমেই সবথেকে ভালো পারফরমেন্স আশা করেন, তাহলে এই রেজর ফোনই আপনার জন্য বেস্ট হবে যদি আপনি এটি বাংলাদেশে ইমপোর্ট করে আনতে পারেন বা অন্য কোনোভাবে ম্যানেজ করতে পারেন।


আজকের মত এখানেই শেষ করছি। আশা করি আর্টিকেলটি আপনাদের ভালো লেগেছে। কোনো প্রশ্ন  মতামত থাকলে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন। ভালো থাকবেন।


WiREBD এখন ইউটিউবে, নিয়মিত টেক/বিজ্ঞান/লাইফ স্টাইল বিষয়ক ভিডিও গুলো পেতে WiREBD ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুণ! জাস্ট, youtube.com/wirebd — এই লিংকে চলে যান এবং সাবস্ক্রাইব বাটনটি হিট করুণ!

Image Credit : MKBHD, Youtube

সিয়াম
অনেক ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তির প্রতি আকর্ষণ ছিলো এবং হয়তো সেই আকর্ষণটা আরো সাধারন দশ জনের থেকে একটু বেশি। নোকিয়ার বাটন ফোন থেকে শুরু করে ইনফিনিটি ডিসপ্লের বেজেললেস স্মার্টফোন, সবই আমার প্রিয়। জীবনে টেকনোলজি আমাকে যতটা ইম্প্রেস করেছে ততোটা অন্যকিছু কখনো করতে পারেনি। আর এই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ থেকেই লেখালেখির শুরু.....