শাওমি মি এ১ : শাওমির তৈরি বাজেট পিক্সেল ?

শাওমি মি এ১

আজকের দিনে, শাওমি কোম্পানিটির নাম শোনেনি এমন মানুষ বাংলাদেশে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। আপনি যদি স্মার্টফোন নিয়ে বেশি ঘাটাঘাটি করে থাকেন তাহলে আপনি অবশ্যই শাওমি কোম্পানিটির নাম শুনেছেন এবং হয়ত শাওমির প্রোডাক্ট ব্যাবহারও করেছেন। শাওমি একটি চাইনিজ স্মার্টফোন নির্মাতা যারা স্মার্টফোন ছাড়াও আরো বিভিন্ন ধরনের ডিভাইস ও ইলেকট্রনিক প্রোডাক্ট তৈরি করে থাকে যেমন, স্মার্ট ওয়াচ, পাওয়ার ব্যাংক, রাউটার এবং আরও অনেক কিছু। কিন্তু বাংলাদেশে শাওমি স্মার্টফোনের জন্যই বেশি বিখ্যাত। এর কারণ হচ্ছে, শাওমি বেশ কম দামের মধ্যেই অনেক ভালো স্মার্টফোন বা অনেক ভালো হার্ডওয়্যারযুক্ত স্মার্টফোন তৈরি করে। বাংলাদেশের অধিকাংশ স্মার্টফোন ইউজাররাই শাওমির স্মার্টফোনগুলোকে বেস্ট ভ্যালু ফর মানি হিসেবে দেখেন। আজকে শাওমির যে স্মার্টফোনটি নিয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছি তার নাম হচ্ছে শাওমি মি এ১ ।

এই স্মার্টফোনটির নাম এমন কারণ এটি গুগলের AndroidOne প্রজেক্টের একটি অংশ। এর আগে আমরা এই প্রজেক্টের আওতায় থাকা অনেক স্মার্টফোন দেখেছি। যেমন আমাদের দেশের সিম্ফোনি রোর এ৫০ স্মার্টফোনটিও গুগলের AndroidOne প্রজেক্টের আওতায় ছিল। কিন্তু গত ২ বছর গুগলের এই প্রজেক্টটি বন্ধ ছিল। ২০১৭ সালের শেষের দিকে এই প্রজেক্টটি আবার চালু করা হয় শাওমি মি এ১ স্মার্টফোনটি এনাউন্স করার মাধ্যমে।  এই স্মার্টফোনটি শাওমির তৈরি, কিন্তু ফোনের সফটওয়্যার সরাসরি গুগল নিয়ন্ত্রণ করে। বিষয়টি অনেকটা গুগলের আগের নেক্সাস ডিভাইসগুলোর মত।

শাওমি মি এ১

এই মি এ১ স্মার্টফোনটির সবকিছু শাওমির আরেকটি স্মার্টফোন মি ৫এক্স এর মতই। আসলে মি এ১ এবং মি ৫এক্স ফোন দুটি একেবারেই একই ফোন। শুধুমাত্র দুটি স্মার্টফোনের সফটওয়্যার আলাদা। যেখানে মি ৫এক্স স্মার্টফোনে থাকছে শাওমির নিজস্ব মিইউআই (MIUI), সেখানে মি এ১ স্মার্টফোনে থাকছে গুগলের স্টক অ্যান্ড্রয়েড। এছাড়া এই দুটি ফোনের মধ্যে আর কোনো পার্থক্য নেই। তো চলুন দেখা যাক কি কি থাকছে শাওমি মি এ১ স্মার্টফোনটিতে।

শাওমি মি এ১ স্পেসিফিকেশন

স্মার্টফোনটির স্পেসিফিকেশন বলার আগে বলে নিতে চাই যে এটি কোনো হাই এন্ড ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোন নয়। এটি একটি আপার মিড রেঞ্জ স্মার্টফোন। অর্থাৎ স্মার্টফোনটি ফ্ল্যাগশিপ লেভেলের খুব ভালো স্মার্টফোনও নয়, আবার একেবারে খারাপ বা লো এন্ড স্মার্টফোনও নয়। ৭.৩ মিলিমিটার থিকনেসের ফুল মেটাল বডির তৈরি এই স্মার্টফোনটি দেখতে বেশ সুন্দর। এতে থাকছে ১৯২০×১০৮০ অর্থাৎ  ১০৮০ পি রেজোলিউশনের ৫.৫ ইঞ্চির ২.৫ডি কার্ভড আইপিএস ডিসপ্লে যা গরিলা গ্লাস ৩ দ্বারা প্রটেক্টেড। থাকছে স্ন্যাপড্রাগন ৬২৫ চিপসেট এবং এড্রেনো ৫০৬ জিপিউ। থাকছে ১২ মেগাপিক্সেল রিয়ার ডুয়াল ক্যামেরা যা ৪কে ভিডিও করতে সক্ষম এবং ফ্রন্টে থাকছে ৫ মেগাপিক্সেল ক্যামেরা। ক্যামেরার বিষয়ে বিস্তারিত ক্যামেরা সেকশনে বলা যাবে। এই ফোনে  থাকছে ৪ জিবি র‍্যাম এবং ৬৪ জিবি ইন্টারনাল স্টোরেজ। হাইব্রিড সিম কার্ড স্লট থাকায় মাইক্রো এসডি কার্ড ব্যাবহার করার সুবিধাও থাকছে। কিন্তু এই ফোনের সবথেকে হাইলাইটেড ফিচার হচ্ছে এর সফটওয়্যার অর্থাৎ স্টক অ্যান্ড্রয়েড ৭.১ (নুগাট) যা সরাসরি গুগলের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং এর ডুয়াল ক্যামেরা সেটাপ। স্পেসিফিকেশন সম্পর্কে বিস্তারিত এখানে দেখতে পারেন।

চিপসেটস্ন্যাপড্রাগন ৬২৫
র‍্যাম ও স্টোরেজ৪ জিবি ও ৬৪ জিবি
জিপিউএড্রেনো ৫০৬
ডিসপ্লে রেজোলিউশান১০৮০ পি
ক্যামেরা (রিয়ার+ফ্রন্ট)ডুয়াল ১২ রিয়ার+৫ মেগাপিক্সেল ফ্রন্ট
ডিসপ্লে সাইজ৫.৫ ইঞ্চি
অ্যান্ড্রয়েড ভারশন৭.১.২ (নুগাট)
ব্যাটারি ক্যাপাসিটি৩০৮০ এমএএইচ
ডিসপ্লে প্রোটেকশনগোরিলা গ্লাস ৩

 

সফটওয়্যার

সরাসরি সফটওয়্যার সেকশনে চলে গেলাম কারন এই ফোনটির ডিসপ্লে কোয়ালিটি নিয়ে তেমন কিছু বলার নেই। শাওমির অন্যান্য মিড বাজেট স্মার্টফোন যেমন রেডমি নোট ৪ বা নোট ৩ এর মতই। এগুলোর থেকে একটু বেশি ইম্প্রুভড কিন্তু সেটা খুব একটা বড় ব্যাপার নয়। এই ফোনের অন্যতম একটি স্পেশালিটি হচ্ছে এর সফটওয়্যার। সাধারনত শাওমির সব মোবাইলে শাওমির নিজের ইউআই ব্যাবহার করা হয় যার নাম মিইউআই (MIUI)। কিন্তু এই মিইউআই স্টক অ্যান্ড্রয়েডের তুলনায় অনেক বেশি হেভি এবং স্টক এন্ড্রয়েডের মত এত স্মুথ এবং রেস্পমসিভও নয়।

কিন্তু শাওমির এই ফোনটিতে মিইউআই থাকছে না। থাকছে গুগলের পিওর স্টক এন্ড্রয়েড। এর ফলে এই ফোনটি শাওমির এই বাজেটের অন্যান্য মিইউআই চালিত অন্যান্য ফোনের থেকে অনেক স্মুথ এবং রেস্পন্সিভ। এছাড়া সরাসরি গুগলের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত স্টক এন্ড্রয়েড হওয়ায় কোন ব্লোটওয়্যারও থাকছে না। এই ফোনের সফটওয়্যার প্রায় গুগল পিক্সেলের সফটওয়্যারের মত। এবং এই স্মার্টফোনটি তার সকল সফটওয়্যার আপডেট সরাসরি গুগলের কাছ থেকেই পাবে। তাই অন্যান্য ফোনের তুলনায় অনেক দ্রুত সিকিউরিটি প্যাচ এবং সফটওয়্যার আপডেট পাবে। অর্থাৎ সেগুলো প্রায় রিলিজ হওয়ার পরপরই এই স্মার্টফোনটি পেয়ে যাবে। ইতোমধ্যে শাওমি এবং গুগল এই স্মার্টফোনে এবছরের শেষের দিকেই অ্যান্ড্রয়েড ৮.০ (অরিও) আপডেট দিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। মুলত এই স্মার্টফোনটির হার্ডওয়্যার সেকশনটি শাওমির তৈরি, কিন্তু সফটওয়্যার সেকশনটি গুগলের নিজের দখলে। তাহলে ধারনা করতেই পারছেন এই ফোনের সফটওয়্যার কেমন হতে পারে।

শাওমি মি এ১

ক্যামেরা

ক্যামেরা হচ্ছে এই স্মার্টফোনটির অন্যতম হাইলাইটেড একটি ফিচার। কারন এই ফোনটিতে রিয়ারে থাকছে ডুয়াল ১২ মেগাপিক্সেল ক্যামেরা সেটাপ, যার একটি ক্যামেরা হচ্ছে ২৬ মিলিমিটার লেন্স এবং এফ ২.২ অ্যাপারচার যুক্ত এবং অপরটি হচ্ছে ৫০ মিলিমিটার লেন্স এবং এফ এফ ২.৬ অ্যাপারচার যুক্ত। দুটি ক্যামেরাই ১২ মেগাপিক্সেল। এই ফোনটির ডুয়াল ক্যামেরা ইমপ্লিমেন্টেশন অনেকটা আইফোন ৭ প্লাসের মত। এই দামের মধ্যে অন্যান্য কিছু কিছু ফোনেও ডুয়াল ক্যামেরা সেটআপ আছে (যেমনঃ Honor 6X) কিন্তু সেসব ক্যামেরা ইমপ্লিমেন্টেশন  মি এ১ এর মত এতটা স্মার্ট ও উপযোগী নয়। শাওমি মি এ১ এর রিয়ারের সেকেন্ডারি ক্যামেরাতে ৫০ মিলিমিটার লেন্স থাকায় এর সাহায্যে আপনি ২এক্স লসলেস জুম করতে পারবেন। অর্থাৎ ছবি তোলার সময় দ্বিগুণ পর্যন্ত জুম করতে পারবেন কোন ধরনের পিকচার কোয়ালিটি না হারিয়েই। এই ফিচারটি দুরের ছবি ক্যাপচার করার সময় অনেক সাহায্য করবে। এটিই হচ্ছে মি এ১ এর ডুয়াল ক্যামেরার সবথেকে বড় ফিচার।

শাওমি মি এ১

এছাড়া এই ডুয়াল ক্যামেরার সাহায্যে আপনি পরট্রেইট ছবি তুলতে পারবেন। অর্থাৎ অবজেক্টের ব্যাকগ্রাউন্ড ব্লার করে ছবি ক্যাপচার করতে পারবেন, অনেকটা ডিএসএলআর এর মত। শাওমি মি এ১ এর তোলা পরট্রেইট অনেকটা আইফোন ৭ প্লাসের কাছাকাছি রেজাল্ট দিতে পারে  যদিও সম্পূর্ণ আইফোন ৭ প্লাসের মত বা তার থেকে ভালো নয়। কিন্তু এই ফোনটি ব্যাবহার করলে আপনি রিয়ার ক্যামেরার পারফরমেন্স নিয়ে হতাশ হবেন না এটি নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়। আর এই ফোনটির রিয়ার ক্যামেরা যথেষ্ট ভালো হলেও, ফ্রন্ট ক্যামেরা এভারেজ লেভেলের। অর্থাৎ খুব বেশি ভালোও না আবার একেবারে খারাপও বলা যায়না।

পারফরমেন্স

এটি যেহেতু একটি হাই এন্ড ফোন বা কোন ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোন নয় তাই এটির পারফরমেন্স ফ্ল্যাগশিপ লেভেলের হবে এটা আশা করাই উচিৎ নয়। কিন্তু এই ফোনটির পারফরমেন্স শাওমির  এই বাজেটের অন্যান্য ফোনের থেকে অনেক ভালো হবে এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। এর একটি বড় কারন হচ্ছে এর সফটওয়্যার যা সরাসরি গুগল নিয়ন্ত্রন করে। সফটওয়্যার অপ্টিমাইজেশনের কারনে এই ফোনের পারফর্মেন্স এই বাজেটের আরও অন্যান্য স্মার্টফোনের থেকে ভালো হবে।

স্ন্যাপড্রাগন ৬২৫ যদিও ৮২০/৮২১/৮৩৫ এর মত এতটা পাওয়ারফুল নয়, কিন্তু ফোনের সাধারন প্রতিদিনের টাস্কস ভালভাবেই হ্যান্ডেল করতে পাড়ে এবং এড্রেনো ৫০৬ জিপিউ  মোটামোটি সব ধরনের লাইট ও মোটামোটি হেভি ২ডি/৩ডি গেমগুলো স্মুথলি চলার জন্য যথেষ্ট। গুগল নিয়ন্ত্রিত সফটওয়্যার বলেই এটা ভাববেন না যে এর পারফরমেন্স গুগল পিক্সেল বা পিক্সেল ২ এর মত হবে। কারন পারফর্মেন্স এর জন্য সফটওয়্যার অপ্টিমাইজেশনের সাথে সাথে হার্ডওয়্যারও একটি বড় ব্যাপার। স্ন্যাপড্রাগন ৬২৫মূলত একটি পাওয়ার সেভিং চিপসেট। তাই এটা পারফরমেন্স এর দিকে লক্ষ্য রাখার সাথে সাথে ব্যাটারি লাইফ ইম্প্রুভ করার দিকে বেশি নজর দেয়। তাই এই ফোনের ব্যাটারি লাইফ নিয়ে অবশ্যই সন্তুষ্ট হবেন। এবং গুগলের সফটওয়্যার হওয়ায় পারফরমেন্স নিয়েও কেউ অসন্তুষ্ট হবেন না আশা করা যায়।

শাওমি মি এ১

আর এই ফোনের ইউজার এক্সপেরিয়েন্সও আপনি এই বাজেটের অন্যান্য স্মার্টফোন থেকে ভালো পাবেন। এই স্মার্টফোনে আপনি শাওমি আরও অধিকাংশ ফোনের মত বিল্ট ইন IR সেন্সর যার সাহায্যে আপনি স্মার্টফোনের সাহায্যে যেকোনো টেলিভিশন, এসি বা অন্যান্য যেকোনো ধরনের রিমোট কনট্রোল ডিভাইস কনট্রোল করতে পারবেন। অর্থাৎ রিমোট হিসেবে ব্যাবহার করতে পারবেন। আর একটা বিষয় হয়ত আপনারা জানেন না যে, এই স্মার্টফোনটি AndroidOne হওয়ায়, এর স্মার্টফোনের সাথে আপনি পাবেন আনলিমিটেড গুগল ফটোস স্টোরেজ। যার সাহায্যে আপনার স্মার্টফোনে তোলা সকল ছবি আপনি ফ্রিতে গুগল ফটোসে ব্যাকআপ করে রাখতে পারবেন এবং তাও আবার ফুল রেজোলিউশানে।

শেষ কথা

শাওমি মি এ১ স্মার্টফোনটি যদি আপনি MI Bangladesh থেকে ২ বছরের ওয়ারেন্টিসহ নিলে প্রায় ২৩-২৪ হাজারের মধ্যেই পাবেন। আর লোকাল শপ থেকে নিলে আরও কিছু কমে পেতে পারেন। কোথা থেকে নিবেন এটা আপনার পারসোনাল চয়েজ। তো এই ফোনের এতসব ফিচারস এবং স্টক এন্ড্রয়েড এবং ভালো ক্যামেরা বিবেচনা করে এটিকে শাওমির তৈরি একটি বাজেট পিক্সেল বলাই যায়। যারা গুগলের পিওর স্টক এন্ড্রয়েড পছন্দ করেন কিন্তু বাজেটের কথা চিন্তা করে গুগল পিক্সেল বা পিক্সেল ২ নিতে পারছেন না , আমার মতে তাদের জন্য বেস্ট স্মার্টফোন হচ্ছে শাওমি মি এ১।

আজকের মত এখানেই শেষ করছি। আশা করি আর্টিকেলটি আপনাদের ভালো লেগেছে। আপনার কোন ধরনের প্রশ্ন বা কোন মতামত থাকলে অবশ্যই কমেন্ট সেকশনে জানাবেন। ভালো থাকবেন।


WiREBD এখন ইউটিউবে, নিয়মিত টেক/বিজ্ঞান/লাইফ স্টাইল বিষয়ক ভিডিও গুলো পেতে WiREBD ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুণ! জাস্ট, youtube.com/wirebd — এই লিংকে চলে যান এবং সাবস্ক্রাইব বাটনটি হিট করুণ!

You can find me on : Facebook
ইমেজ ক্রেডিট : MI.com, Android Authority

সিয়াম
অনেক ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তির প্রতি আকর্ষণ ছিলো এবং হয়তো সেই আকর্ষণটা আরো সাধারন দশ জনের থেকে একটু বেশি। নোকিয়ার বাটন ফোন থেকে শুরু করে ইনফিনিটি ডিসপ্লের বেজেললেস স্মার্টফোন, সবই আমার প্রিয়। জীবনে টেকনোলজি আমাকে যতটা ইম্প্রেস করেছে ততোটা অন্যকিছু কখনো করতে পারেনি। আর এই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ থেকেই লেখালেখির শুরু.....