আপনার কি সারারাত ফোন চার্জে লাগিয়ে রাখা উচিৎ?

আপনার কি সারারাত ফোন চার্জে লাগিয়ে রাখা উচিৎ?

এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন সাথে অবশ্যই আমাদের প্রত্যেকদিনের জীবনের সাথে এই বিষয়টি মাখন আর ব্রেডের মতো সম্পর্ক যুক্ত। আপনি সারাদিন হয় লেখাপড়ায় অথবা চাকুরিয়ে বা ব্যবসার কাজে বাইরে থাকেন, রাতে বাড়িতে আসেন, সারারাত ফোনকে চার্জে ফেলিয়ে দেন এবং সকালে ফোনটি খুলে নিয়ে আবার দৈনন্দিন কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

ব্যাট এখানে বিশাল দ্বিধার প্রশ্নটি হচ্ছে, সারারাত ফোন চার্জে লাগিয়ে রাখাটা কি নিরাপদ? অনলাইনে এই টপিকের উপর সার্চ করলে এক গাদা ভিডিও আর ওয়েব আর্টিকেল খুঁজে পাবেন। অনেক বড় বড় ইউটিউবার’রা আপনাকে বলবে “না কোন সমস্যা নেই, আপনি সারারাত ফোন চার্জে লাগালে কিছুই হবে না!” আবার অনেক ওয়েব আর্টিকেলে দেখবেন, তারা ফোন সারারাত চার্জে লাগাতে নিষেধ করে। তাহলে আসল উত্তরটি কি? ঠিক আছে, চিন্তা করার কোন কারণ নেই, আমি এই প্রশ্নের বেস্ট উত্তর কভার করার চেষ্টা করেছি। তো মনোযোগ সহকারে আর্টিকেলটি পড়তে থাকুন…

সারারাত ফোন চার্জিং

আজকে যেভাবে নতুন নতুন স্মার্টফোন গুলো বাজারে আসছে, এতে আপনার যদি পর্যাপ্ত টাকা থাকে, তাহলে প্রতি ৬ মাস বা ১ বছরে স্মার্টফোন পাল্টাতে ইচ্ছা করে। আজকের অনেকেরই লেটেস্ট মডেল স্মার্টফোন ব্যবহার করার ট্রেন্ড দেখতে পাওয়া যায়। আপনি যদি তাদের দলে হয়ে থাকেন, যে ১ বছর পর পর স্মার্টফোন আপগ্রেড করেন, তো আপনার এটা চিন্তা করার কোন বিষয়ই না ফোন সারারাত চার্জে লাগিয়ে রাখলে কি হবে!

সারারাত ফোন চার্জিং

ব্যাট, আপনি যদি আপনার ফোন সম্পর্কে যত্নবান হোন এবং আপনার ফোনের দীর্ঘায়ু কামনা করেন, সেক্ষেত্রে কিছু বিষয় আপনাকে অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। দেখুন প্রথমেই প্রথম প্রশ্নের উত্তর দিয়ে নেওয়া যাক। তো সারারাত ফোন চার্জে লাগিয়ে রাখলে ফোনের কি কোন ক্ষতি হয়? বিশেষজ্ঞ শেন ব্রুস্কি’র মতে (Farbe Technik স্মার্টফোন চার্জার নির্মাতা কোম্পানির সহ – প্রতিষ্ঠাতা); আজকের স্মার্টফোন গুলো অনেক বেশি চালাক, প্রত্যেকটি ফোনে ওভার ভোল্টেজ প্রোটেকশন সার্কিট থাকে। আপনার স্মার্টফোনের ভেতরের সিস্টেম ঠিকই জানে কখন আপনার ফোনের কারেন্ট বন্ধ করে দিতে হবে আর কখন কারেন্ট প্রদান করতে হবে। তো উত্তর হলো “না” সারারাত চার্জে লাগিয়ে রাখলে ফোনের ওভার চার্জিং প্রবলেম হবে না। অন্তত ফোন ব্ল্যাস্ট হয়ে যাওয়ার কোন সম্ভবনা নেই।

বিষয়টি কিন্তু এখানেই শেষ নয়। আপনি সারারাত ফোন চার্জে লাগিয়ে ইনস্ট্যান্ট কোন সমস্যা না দেখা দিলেও আপনার ফোনের ব্যাটারি আয়ু কিন্তু ধিরেধিরে কমে যাবে। আজকের দিনের বেশিরভাগ স্মার্টফোন ব্যাটারি লিথিয়াম-আয়নের উপর হয়ে থাকে, আর লি-আয়ন ব্যাটারির জন্য তাপ হচ্ছে ওত পেতে থাকা শত্রুর মতো।

শেন বর্ণনা করেছেন, “স্মার্টফোন চার্জ করার সময় ফোনটি অবশ্যই উত্তাপ জেনারেট করে, আর এই উত্তাপের সাথে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি লাইফের প্রভাব রয়েছে।” —যতোবেশি গরম পরিবেশে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি রাখা হবে, এর পারফর্মেন্স, নামে ওভারঅল ক্যাপাসিটি ততো আঁটো হয়ে যাবে। আজকের বেশিরভাগ ফোন গুলো অত্যন্ত চিকন ডিজাইনের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে সাথে ব্যাটারি গুলোকে নন-রিমুভেবল করা হচ্ছে, অর্থাৎ ফোনে বাতাস ঢোকার কোন জায়গাই থাকছে না, এতে চার্জে লাগালে ব্যাটারি অনেক দ্রুত গরম হয়ে যাচ্ছে।

যদি আপনার ফোনের ঢাকনা খোলার মতো ব্যবস্থা থাকে, তো অবশ্যই সারারাত চার্জে লাগানোর ক্ষেত্রে ঢাকনা খুলে ফেলবেন। যদি আপনার ফোনটির ঢাকনা খোলা না যায়, সেক্ষেত্রে ফোনটি কিছু দ্বারা ঢেকে রাখবেন না।

চার্জিং সাইকেল এবং অভ্যাস

চার্জিং সাইকেল এবং অভ্যাস

স্মার্টফোন ব্যাটারি সুস্থ রাখার সবচাইতে ভালো পদক্ষেপ হচ্ছে চার্জিং অভ্যাসে পরিবর্তন নিয়ে আসা। বিশেষজ্ঞদের মতে কখনোই ব্যাটারি ১০০% পর্যন্ত চার্জ করা আদর্শ অভ্যাস নয়। হ্যাঁ, পয়েন্ট’টি শুনতে একটু আজব লাগতে পারে, ব্যাট এটাই সত্য। লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ১০০% পর্যন্ত চার্জ করলে এটি অনেকবেশি উত্তপ্ত হয়ে যায়, কেনোনা এতে অনেক পাওয়ার চলে আসে। তাই সঠিক নিয়ম হচ্ছে, ৪০-৮০% এর মধ্যে চার্জ নিয়ন্ত্রন করা। কখনোই ব্যাটারি ০% ডিসচার্জ করবেন না এবং ০% থেকে ১০০% চার্জ করবেন না। ৩০-৪০% হয়ে যেতেই ফোন চার্জে লাগিয়ে দিন এবং ৮০% চার্জ হয়ে গেলে ফোনটি খুলে ফেলুন।

আপনি যদি এই চার্জিং সাইকেল ব্যবহার করেন, তো কখনোই আপনার ফোনকে সারারাত চার্জে লাগানোর প্রয়োজনীয়তা পড়বে না। কেনোনা এখনকার অনেক ফোন ফাস্ট চার্জিং সমর্থন না করলেও ফুল চার্জ করতে ১ থেকে ১.৫ ঘণ্টা সময় লাগে, সেক্ষেত্রে ৪০%-৮০% চার্জ করতে মাত্র কয়েক মিনিটই সময় লাগবে। তবে হ্যা, সব সময় চার্জিং এর এই রাউন্ড ফিগার নিয়ন্ত্রন করা একটু মুশকিলের কাজ, তবে যদি সেটা করতে পারেন, আপনার ফোনের ব্যাটারি লাইফ অনেক বেড়ে যাবে এবং ক্যাপাসিটির দিকেও অনেক কম পার্থক্য আসবে।

সাথে মনে রাখবেন, প্রত্যেকটি ব্যাটারির লিমিটেড চার্জ সাইকেল থাকে। মানে কোন ব্যাটারির এটি নির্দিষ্ট করা থাকে, এটি কতোবার চার্জড এবং ডিসচার্জড হতে পারবে। তাই আবারো বলছি, সবসময় সম্পূর্ণ ডিসচার্জড মানে ০% এবং ফুল চার্জড ১০০% করবেন না। সাথে অবশ্যই ফোন চার্জে লাগিয়ে ব্যবহার করবেন না, অনেকেই বলে চার্জে লাগিয়ে ফোন ব্যবহার করলে কিছুই হয়না। কিন্তু ফোন সেক্ষেত্রে আরো অনেক গরম হয়, ফোনের প্রসেসর আলাদা তাপ উৎপন্ন করে, এতে ব্যাটারি লাইফের বারোটা বেজে যায়। বর্তমানের ব্যাটারি টেকনোলজি আর কয়েক বছর আগের ব্যাটারি টেকনোলজি প্রায় একই রয়েছে। শুধু ব্যাটারি সাইজ কমিয়ে ক্যাপাসিটি আরো বাড়ানো হয়েছে।

সাথে ফোন গুলোতে সফটওয়্যার নির্ভর অপটিমাইজেসন নিয়ে আসা হয়েছে, ফলে চার্জ আগের চেয়ে বেশি লাস্টিং করে। কিন্তু ব্যাটারির কাজ করার পদ্ধতি এবং ব্যাটারি তৈরির ম্যাকানিজম কিন্তু আগের মতোই রয়েছে। মানে সারারাত চার্জিং এ রেখে দেওয়াতে সমস্যা নেই, কিন্তু সারারাত চার্জিং মানে ফোনকে সারারাত উত্তপ্ত করে রাখা, আর উত্তপ্ত করে রাখা মানে? আমি আগেই উপরে আলোচনা করেছি!

অরিজিন্যাল চার্জার নাকি যেকোনো চার্জার?

অরিজিন্যাল চার্জার নাকি যেকোনো চার্জার?

এটিও একটি বিশাল বড় প্রশ্ন, যেটা আমাদের মনে অনেক সময়ই ঘণ্টা নাড়ায়! ধরুন আপনি এক ব্র্যান্ডের ফোন ব্যবহার করেন, আর আপনার বন্ধু আরেক ব্র্যান্ডের ফোন; তো আপনারা কোথাও বেড়াতে গেলেন, আর মানুষের ভুলে যাওয়া স্বভাব থেকে আপনি চার্জার বহন করতে ভুলে গেছেন। এখন আপনি চাইছেন বন্ধুর চার্জার ব্যবহার করে ফোন চার্জ করতে, কেনোনা আজকের যেকোনো অ্যান্ড্রয়েড ফোনেই মাইক্রো ইউএসবি সাপোর্ট থাকে। এখন আপনার বন্ধু আপনাকে বলল, সে শুনেছে শুধু মাত্র অফিশিয়াল চার্জার দ্বারায় ফোন চার্জ করা উচিৎ, না হলে ক্ষতি হবে! এই কথাটি কতোটা সত্য?

দেখুন, ইলেক্ট্রিক্যাল লেভেলের সার্কিট গুলো সাধারণ টাইপের হয়ে থাকে। এই সার্কিট গুলো নির্দিষ্ট পরিমাণের ভোল্টেজ এবং অ্যাম্পস গ্রহন করতে পারে। যদি বেশি ভোল্টেজ এবং অ্যাম্পস প্রদান করা হয়, তবে সার্কিটটিতে গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে। যদি অ্যাম্পস কমে যায় তবে সার্কিটটি পরিচালনা করার জন্য যথেষ্ট কারেন্ট পাবে না, তাই এতেও কাজ হবে না। ভোল্টেজ হলো মূলত ওয়াটার প্রেসারের মতো। বেশির ভোল্টেজ মানে পানির নলে বেশি প্রেসার, ফলে নলটি ফেটে যেতে পারে। আর অ্যাম্পস হলো একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কতোগুলো পানি বহন হতে পারে তার পরিমাপ। যাই হোক, এতোক্ষণে আপনার কাছে ব্যাপারটি পরিষ্কার হয়ে গেছে হয়তো।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, অফিশিয়াল চার্জার বাদে কি যেকোনো চার্জার ফোনে ব্যবহার করা যাবে? —অবশ্যই যাবে। কেনোনা অফিশিয়াল চার্জারে তো আর বিশেষ ম্যাজিক নেই তাই না। চার্জার মূলত ভোল্ট আর অ্যাম্পস সরবরাহ করে, তো সেটা তো দুনিয়ার সব চার্জারই একই কাজ করে। তবে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এক্ষেত্রে আপনাকে মাথায় রাখতেই হবে। প্রথমত, অবশ্যই আলাদা চার্জারটির সঠিক পরিমাণের আউটপুট ভোল্টেজ থাকতে হবে, যেটা আপনার ফোনের জন্য প্রয়োজনীয়। আর দ্বিতীয়ত অবশ্যই আপনার ফোন অপারেট হওয়ার জন্য যতোটা অ্যাম্পিয়ার দরকার তার চেয়ে কিছু বেশি অ্যাম্পস চার্জারে থাকতে হবে, যাতে কারেন্ট ব্যাটারিতে স্টোর হতে পারে।

আজকের বেশিরভাগ চার্জারে মাইক্রো ইউএসবি ক্যাবল থাকে, আর বেশিরভাগ অ্যান্ড্রয়েড ফোন গুলোও মাইক্রো ইউএসবি’র উপর চলে, সুতরাং যেকোনো ডিভাইজ কানেক্ট করা বা চার্জিং করা অনেক সহজ বা ইউনিভার্সাল হয়ে গেছে। মাইক্রো ইউএসবি পোর্ট সবসময়ই যেকোনো মাইক্রো ইউএসবি ক্যাবল সমর্থন করবে আর চার্জার গুলো সবসময়ই ৫ ভোল্টের উপর কাজ করে।

আপনার ফোনের মডেলের উপর ভিত্তি করে ০.৫ থেকে ২ অ্যাম্পস পর্যন্ত প্রয়োজন হয় ফোনটি চার্জ করার ক্ষেত্রে। আমি রেকোমেন্ড করবো আপনার অরিজিন্যাল চার্জারে রেটিং করা থাকা অ্যাম্পসের উপর মিল রেখে যেকোনো চার্জার ব্যবহার করতে পারেন, এতে কোনই সমস্যা নেই। তবে হ্যাঁ, একেবারে লো কোয়ালিটি চার্জার বা তার জোড়াতালি দেওয়া ক্যাবল বা চার্জার ব্যবহার না করায় ভালো।

আরেকটি কথা, যদি আপনার ফোনের ওয়্যারেন্টি পলিসি’তে লেখা থাকে শুধু অরিজিন্যাল চার্জারই ব্যবহার করতে হবে, সেক্ষেত্রে সেটা অনুসরণ করায় বেশি ভালো। যদিও এর পেছনে বিশাল কোন সায়েন্স নেই, তারপরেও রিস্ক নেওয়ার প্রয়োজন নেই। অনেক সময় কিছু কিছু ফোন অন্য আলাদা মাপের অ্যাম্পস ব্যবহার করে, সেক্ষেত্রে অফিশিয়াল চার্জার ব্যবহার করায় বেস্ট হবে।


তো এই ছিল সেই সম্পূর্ণ তথ্য গুলো যেগুলো আপনার জানা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল। আমার বিশ্বাস আমি সকল টার্ম গুলো এই আর্টিকেলে কভার করেছি। বুঝতেই পাড়ছেন, ব্যাটারি স্মার্টফোনের জন্য কতোটা গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ, ব্যাটারি ছাড়া আপনার স্মার্টফোন কোন পেপার ওয়েটের চেয়ে একটু দামী কিছু জিনিষ। যাই হোক, আমি যে স্টোরি আর তত্ত্ব এখানে কভার করেছি হতে পারে আপনার রিয়াল লাইফের এক্সপেরিয়েন্স সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে।

তো আপনার এক্সপেরিয়েন্স আমাদের সাথে নিচে কমেন্টে শেয়ার করুণ। আপনি সারারাত ফোন চার্জে লাগিয়ে রাখার পক্ষে নাকি বিপক্ষে, সবকিছু কমেন্ট করে জানান আমাদের।


WiREBD এখন ইউটিউবে, নিয়মিত টেক/বিজ্ঞান/লাইফ স্টাইল বিষয়ক ভিডিও গুলো পেতে WiREBD ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুণ! জাস্ট, youtube.com/wirebd — এই লিংকে চলে যান এবং সাবস্ক্রাইব বাটনটি হিট করুণ!

ইমেজ ক্রেডিট; Shutterstock

তাহমিদ বোরহান
প্রযুক্তির জটিল টার্মগুলো কি আপনাকে বিভ্রান্ত করছে? কিছুতেই কি আপনার মস্তিষ্কে পাল্লা পড়ছে না? তাহলে বন্ধু, আপনি এবার সঠিক জায়গায় এসেছেন—কেনোনা এখানে আমি প্রযুক্তির সকল জটিল বিষয় গুলো ভাঙ্গিয়ে সহজ পানির মতো উপস্থাপন করার চেষ্টা করি, যাতে সকলে সহজেই সকল টেক টার্ম গুলো বুঝতে পারে।