উইন্ডোজ কেন ম্যাক বা লিনাক্সের তুলনায় বেশি ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়?

উইন্ডোজ

আপনাকে যদি প্রশ্ন করি, কে ভাইরাস দ্বারা বেশি আক্রান্ত হয়, উইন্ডোজ, ম্যাক, নাকি লিনাক্স? —সহজেই উত্তর দিয়ে দেবেন, “উইন্ডোজ”! কিন্তু কেন? কেন উইন্ডোজ বেশি আক্রান্ত হয়। এটার উত্তরে নিশ্চয় বলবেন, “উইন্ডোজ সবচাইতে জনপ্রিয় এবং সবচাইতে বেশি ব্যবহার হওয়া অপারেটিং সিস্টেম, তাই ভাইরাস মেকার’রা উইন্ডোজকে টার্গেট করেই বেশিরভাগ ভাইরাস তৈরি করে”। হ্যাঁ, আপনার কথা ঠিক আছে, ব্যাট এটাই একমাত্র কারণ নয়, যার জন্য উইন্ডোজ কম্পিউটার গুলো বেশি ভাইরাস বা অন্যান্য ম্যালওয়্যার দ্বারা আক্রান্ত হয়। আমি নিচে কিছু পয়েন্ট নিয়ে আলোচনা করছি, যেগুলো জানা অত্যন্তবেশি প্রয়োজনীয়…

উইন্ডোজে ম্যালওয়্যার

হ্যাঁ, উইন্ডোজ কম্পিউটার এতোবেশি ম্যালওয়্যার অ্যাটাকের শিকার হওয়ার পেছনের মূল কারণই বলতে পারেন জনপ্রিয়তা। যেখানে পৃথিবীর বেশিরভাগ ডেক্সটপ আর ল্যাপটপই উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমের উপর নির্ভরশীল, সেখানে হ্যাকারের কাছে এটি সহজেই ভালো টার্গেট হয়ে যায়। যদি কোন হ্যাকার কোন ভাইরাস তৈরি করতে চায়, যেটা কম্পিউটারকে অকেজো করে দেবে কিংবা কোন কী-লগার তৈরি করে যেটা ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, অনলাইন অ্যাকাউন্ট তথ্য চুরি করবে; উইন্ডোজ অবশ্যই তাদের প্রথম পছন্দ হবে। লিনাক্সের উপর ভাইরাস তৈরি করে করবেই টা কি? বেশিরভাগ হোম ইউজার তো ভুল করেও লিনাক্স ইন্সটল করে না, আর সার্ভার অথবা ডাটা সেন্টারে তো পাগলেরা বসে থাকে না, যে যখন ইচ্ছা চাইল হ্যাক করে নিয়ে চলে গেলো! কিন্তু আপনার বাসার দাদু পর্যন্ত উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করেই কম্পিউটার ব্যবহার করে। দাদু কি কম্যান্ড টাইপ করে কম্পিউটিং করবে? আর এই জন্যই দুর্ভাগ্যবসত ভাবে প্রায় যেকোনো বড় ছোট সাইবার অ্যাটাক বা হ্যাকিং অ্যাটাক উইন্ডোজের ভাগ্যেই পরে যায়। কিন্তু এটাই একমাত্র কারণ নয়…

উইন্ডোজের দুঃখজনক সিকিউরিটি

সত্যি কথা বলতে এবং উইন্ডোজের ইতিহাস ঘেঁটে দেখলে, উইন্ডোজ আগে দিনে সিকিউরিটির তোয়াক্কায় করেনি। সবসময় এরা ইউজার ইন্টারফেসের উপর এতোবেশি ধ্যান দিয়েছে যে, বড় বড় নিরাপত্তা ধ্বংসকারী সুড়ঙ্গ নিজেরায় খুঁড়ে রেখেছে। কিন্তু অপর দিকে লিনাক্স এবং অ্যাপেলের ম্যাক ওএস বিশেষ করে সিকিউরিটির দিকে বিশেষ খেয়াল রেখে তৈরি করা হয়েছে। উইন্ডোজের সর্বপ্রথম যে ভার্সন ডস (DOS) ছিল, সেটা একটি সিঙ্গেল ইউজার অপারেটিং সিস্টেম ছিল। যেখানে আগে থেকেই লিনাক্সে এবং ম্যাকে মাল্টি ইউজার অ্যাকাউন্ট সিস্টেম, সাথে গ্রুপ ইউজার, এবং বিভিন্ন অ্যাকাউন্টের বিভিন্ন সিস্টেম লিমিট করার অপশন ছিল। উইন্ডোজ ৯৫, ৯৮ তৎকালীন সময়ের সবচাইতে অ্যাডভানস অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে গণ্য করা হলেও, সেটি রান হলো সিঙ্গেল ইউজার অপারেটিং সিস্টেম ডসের উপরে। ডসের মধ্যে একেবারেই কোন স্পেশাল অ্যাকাউন্ট সিস্টেম, ফাইল সিকিউরিটি, বা সিকিউরিটির বাঁধা ছিল না, যেটা সত্যিই একটি স্টুপিড ব্যাপার।

যাই হোক, তারপরের উইন্ডোজ এনটি কোরের উপর রান করানো অপারেটিং সিস্টেম যেমন- উইন্ডোজ ২০০০, এক্সপি, ভিস্তা, ৭, ৮, ৮.১ এবং বর্তমানের ১০ এ সকল সিকিউরিটি ফিচার এবং সাথে মাল্টি ইউজার অ্যাকাউন্ট সুবিধা রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন ইউজারকে বিভিন্ন পারমিশন থেকে বাঁধা দেওয়া সম্ভব। যদিও কনজিউমারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সিকিউরিটি ব্যবস্থা উইন্ডোজ এক্সপি সার্ভিস প্যাক ২ থেকে আনা হয়েছে। উইন্ডোজ এক্সপি মাল্টি ইউজার অ্যাকাউন্ট সমর্থন করলেও বেশিরভাগ ইউজার অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেই কম্পিউটার ব্যবহার করে। শুধু উইন্ডোজ এক্সপি নয়, আমার দেখা, উইন্ডোজ ৭, ৮, ১০ এ ও সবাই অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেই কম্পিউটিং করে। যেখানে অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট থেকে ম্যালওয়্যার গুলো ঢুঁকে পড়ে আরামে কাজ করতে আরম্ভ করে। কিন্তু ইউজারদের অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করার পেছনে কারণও রয়েছে। অনেক প্রোগ্রাম রয়েছে, যেগুলো অ্যাডমিন পারমিশন ছাড়া কাজই করে না। তো ইউজার আর কি করবে?

সবচাইতে ভয়াবহ ব্যাপার কি জানেন? — উইন্ডোজ এক্সপিকে বিনা ফায়ারওয়ালেই রিলিজ করে দেওয়া হয়েছিলো! – চিন্তা করতে পারেন, কতো সহজেই ওয়র্মস আপনার কম্পিউটারকে আক্রান্ত করে ফেলতে পারে? ওয়র্মস কোন সিস্টেমকে আক্রমণ করার জন্য ইন্সটল হওয়ার প্রয়োজন অনুভব করে না, এটি নেটওয়ার্কের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে দুর্বল ফায়ারওয়াল আর ত্রুটিপূর্ণ কম্পিউটার গুলো স্ক্যান করতে থাকে, একবার খুঁজে পেয়ে গেলে, আরামে সিস্টেমে ঢুঁকে পড়ে আর কাজ কাম স্টার্ট করে দেয়। তার মধ্যে আপনার কম্পিউটার যদি উইন্ডোজ এক্সপি দ্বারা রান হয়, মানে কোনই ফায়ারওয়াল নেই সাথে, এখন নিজেই চিন্তা করে দেখুন!

তাছাড়া উইন্ডোজ এক্সপির আরেকটি বাজে ফিচার ছিল, অটোরান প্রোগ্রাম। অর্থাৎ যদি কোন প্রোগ্রাম সিডি, ডিভিডি, বা পেনড্রাইভ জাস্ট সিস্টেমে ইন্সার্ট করান সেটি সাথে সাথে কম্পিউটারে রান হয়ে যাবে। এখন যদি কেউ ম্যালিসিয়াস প্রোগ্রাম পেনড্রাইভে লোড করে আপনার পিসিতে লাগিয়ে দেয়? চিন্তা করে দেখুন, সে আপনার পিসিতে হাত পর্যন্ত দেবে না, জাস্ট ইউএসবি ডিভাইজ লাগিয়ে দিয়েই কাজ শেষ করে ফেলবে। আর যেহেতু আপনি অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে কম্পিউটার ব্যবহার করছেন, তাই বাঁচার আর কোন প্রশ্নই আসে না।

তবে উইন্ডোজে অটোরান ফিচার থাকার একটি সুবিধাও ছিল। যেকোনো ড্রাইভার ইন্সটলেশন ডিস্ক ডুকানো মাত্রই ইন্সটল প্রসেস শুরু হয়ে যেতো। কিন্তু হ্যাকার যদি ভুয়া সফটওয়্যার অটোরানে লাগিয়ে দেয়, তখন? তবে অনেক ঠেকে ঠেকে শেখার পরে বর্তমানে উইন্ডোজ সিকিউরিটি নিয়ে সিরিয়াস হয়ে গেছে। পরে উইন্ডোজ এক্সপি সার্ভিস প্যাক ২ বেড় করা হয়, যেখানে অনেক শক্তিশালী ফায়ারওয়াল ব্যবহার করা হয়েছিলো। তাছাড়া উইন্ডোজ ৭, ৮, ৮.১, ১০ এ ডিফল্ট এন্টিভাইরাস প্রোগ্রাম উইন্ডোজ ডিফেন্ডার যোগ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারপরেও এখনো ইন্টারনেটে অনেক উইন্ডোজ এক্সপি ব্যবহার করা কম্পিউটার রয়েছে, যেগুলোকে খুব সহজেই আক্রান্ত করানো সম্ভব।

তৃতীয়পক্ষ সফটওয়্যার সোর্স

আপনার অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইজে কোন সফটওয়্যার লোড করতে হলে কি করবেন, অবশ্যই গুগল প্লে স্টোরে চলে যাবেন। আবার লিনাক্সের ক্ষেত্রেও প্যাকেজ ডাউনলোড কোন ট্র্যাস্টেড সোর্স থেকেই করা হয়ে থাকে। কিন্তু চিন্তা করে দেখুন উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমে সফটওয়্যার ডাউনলোড করার কথা। জাস্ট ব্রাউজার ওপেন করবেন, আর সফটওয়্যারের জন্য সার্চ করতে গুগল করবেন। আমরা এটা ভেবেই দেখি না, কোন ওয়েবসাইট ঠেকে সফটওয়্যারটি ডাউনলোড করছি। ব্যাস লিঙ্ক পেয়ে গেলেই ডাউনলোড লাগিয়ে দেই। আবার সফটওয়্যার ডাউনলোড করার ওয়েবসাইট গুলোতে থাকে ম্যালিসিয়াস অ্যাড, এবং ফেইক ডাউনলোড বাটন, যেগুলোতে ক্লিক করার মাধ্যমে অঝথা সফটওয়্যার ডাউনলোড হয়ে আপনার সিস্টেমে ইন্সটল হয়ে যাবে, আর এতে মাইক্রোসফটের কোনই নিয়ন্ত্রন নেই। অ্যান্ড্রয়েডকে নিয়মিত আপডেটেড রাখলে এবং প্লে স্টোর ঠেকে সফটওয়্যার ডাউনলোড করলে, কখনোই এন্টিভাইরাস ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তা পড়বে না। কেন ফোনে এন্টিভাইরাস প্রয়োজনীয় না, এ ব্যাপারে আমার ডেডিকেটেড একটি আর্টিকেল রয়েছে।

যাই হোক, অর্থাৎ আপনি নিজেই জানেন না, কোন সফটওয়্যার ঠেকে ম্যালওয়্যার এসে আপনার কম্পিউটারকে আক্রান্ত করবে। উইন্ডোজ ৮ এর সাথে সাথে আমরা উইন্ডোজ অ্যাপ স্টোরের সাথে পরিচিত হই, বর্তমানের উইন্ডোজ ১০ এও অ্যাপ স্টোর রয়েছে, কিন্তু সেখানে সফটওয়্যারের সংখ্যা অত্যন্ত কম। প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার গুলো নেই বললেই চলে। যদি উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম, ট্র্যাস্টেড সফটওয়্যার সোর্স প্রদান করতো তাহলে নিরাপত্তা অনেক বৃদ্ধি পেত। আপনি হয়তো কোন সফটওয়্যার তার অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকেই ডাউনলোড করছেন, কিন্তু আপনার নেটওয়ার্কে অ্যাটাক করে সফটওয়্যারটি চেঞ্জ করে দেওয়া সম্ভব। আপনি কখনোই এ ব্যাপারে পুরোপুরি নিরাপদে নেই।

শেষ কথা


WiREBD এখন ইউটিউবে, নিয়মিত টেক/বিজ্ঞান/লাইফ স্টাইল বিষয়ক ভিডিও গুলো পেতে WiREBD ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুণ! জাস্ট, youtube.com/wirebd — এই লিংকে চলে যান এবং সাবস্ক্রাইব বাটনটি হিট করুণ!

হ্যাঁ, উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম অনেকবেশি জনপ্রিয়, তাই এর হ্যাক অ্যাটাকও অনেকবেশি, কিন্তু জনপ্রিয়তা একমাত্র কারণ নয় ফলে উইন্ডোজে ভাইরাস বেশি। মাইক্রোসফটের নিজেরও কিছু অমনোযোগীতা রয়েছে। তাছাড়া আমাদের ইউজারদেরও কিছু বেপরোয়ার কারণে আমরা প্রায়ই হ্যাক অ্যাটাকের সম্মুখীন হই, উইন্ডোজকে আপডেট করতে যে কি গা ব্যাথা আমাদের, কিছুই বুঝি না। সামান্য ব্যান্ডউইথের ভয়ে আপডেট করি না, কিন্তু র‍্যানসমওয়্যার অ্যাটাক করলে ৩০০ ডলার হ্যাকারকে দিতে দৌড়াই! তো আপনি আপনার উইন্ডোজ ডেক্সটপকে সুরক্ষিত রাখতে কি কি পদক্ষেপ গ্রহন করেন, নিচে আমাদের কমেন্ট করে জানান।

তাহমিদ বোরহান
প্রযুক্তির জটিল টার্মগুলো কি আপনাকে বিভ্রান্ত করছে? কিছুতেই কি আপনার মস্তিষ্কে পাল্লা পড়ছে না? তাহলে বন্ধু, আপনি এবার সঠিক জায়গায় এসেছেন—কেনোনা এখানে আমি প্রযুক্তির সকল জটিল বিষয় গুলো ভাঙ্গিয়ে সহজ পানির মতো উপস্থাপন করার চেষ্টা করি, যাতে সকলে সহজেই সকল টেক টার্ম গুলো বুঝতে পারে।