ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট কি? দিনদিন কম্পিউটারকে এতো ছোট কে বানাচ্ছে? [ওয়্যারবিডি ব্যাখ্যা!]

ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট কি?

১৯৪০ সালের কম্পিউটার গুলোর সাইজ ৩-৪টা ডবল-ডেকার বাসের সমান ছিল আর সেখানে লাগানো থাকতো ১৮,০০০ শোঁশোঁ শব্দ করা ইলেক্ট্রনিক সুইচ যেগুলো ভ্যাকুয়াম টিউব (Vacuum Tubes) নামে পরিচিত। আজকের ল্যাপটপ গুলো আঁকারে ঐদিনের কম্পিউটার থেকে প্রায় ১০০ গুন ছোট এবং প্রায় ১,০০০ গুন কম পাওয়ারে চলে। কম্পিউটারের ইতিহাস অনেকটা রোমাঞ্চকর আবার জাদুর মতোও বটে, এতো বিরাট সাইজের জিনিস কীভাবে মাত্র কয়েক বছরে পকেটে এসে ঢুঁকে পড়েছে? এই অদ্ভুদ আবিষ্কার শুধু ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট (Integrated Circuits) বা আইসি (IC) এর ফলেই সম্ভব হয়েছে। একটি আঙ্গুলের সমান চিপে লাখো, বলতে পারেন কোটি ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রাংশ এঁটে যায়। তো কীভাবে এরকমটা সম্ভব হয়, চলুন বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক…

ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট কি?

ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট

কোন টেলিভিশন বা রেডিও খুলে ফেললে দেখা যাবে একটি প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ডের (Printed Circuit Board (PCB) উপর সকল যন্ত্রাংশ গুলো সাজানো রয়েছে। এই সার্কিট বোর্ডকে কাছ থেকে দেখলে মনে হবে আপনি কোন শহরের উপর থেকে গুগল ম্যাপ দিয়ে একে দেখছেন। সার্কিটের উপর অনেক ছোট রেজিস্টর এবং ক্যাপাসিটর লাগানো থাকে, আর একটি কপারের লাইন এই সকল যন্ত্রাংশ গুলোকে একে অপরের সাথে লিঙ্ক করে যেটা দেখতে মনে হয় কোন শহরের মেটালের সড়ক।

সার্কিট বোর্ড দিয়ে কোন জেনারেল ইলেক্ট্রনিক্স বানানো অনেক সহজ কিন্তু যদি কোন কমপ্লেক্স ইলেক্ট্রনিক মেশিন তৈরি করার কল্পনা করা হয়, যেমন- কম্পিউটার, তবে আপনি অনেক সহজেই নিরাশ হয়ে পড়বেন। কেনোনা কম্পিউটারের ১বাইট সেভ করার মতো ব্যবস্থা তৈরি করতে ৮টি ইলেক্ট্রনিক সুইচ লাগানোর প্রয়োজনীয়তা পড়বে। ধরুন আপনি একটি কম্পিউটার তৈরি করতে চান একটি সার্কিট বোর্ডের উপর যেটি শুধু মাত্র এই প্যারাগ্রাফটি সেভ করতে পারবে, তাহলেও আপনাকে কয়েক হাজার সুইচ লাগাতে হবে। আর এক একটি সুইচের আঁকার প্রায় আপনার বুড়ো আঙ্গুলের সমান—তাহলে এবার একটু কল্পনা করে দেখুন ১ মেগাবাইট ডাটা প্রসেস করতে পারবে এরকম কম্পিউটার বানাতে কতোবড় সিস্টেম উন্নতি করতে হবে?

এই সমস্যা দূর করার জন্য বিজ্ঞানীরা ট্র্যানজিস্টর আবিষ্কার করেন, যেটা ভ্যাকুয়াম টিউব থেকে বহু গুনে ছোট হওয়ার পরেও একই আচরণ করে এবং অনেক কোন এনার্জিতে কাজ করতে পারে। কিন্তু আগের দিনের সবচাইতে বড় সমস্যা ছিল এই ট্র্যানজিস্টর গুলোকে একটি কমপ্লেক্স সার্কিটে সকলের সাথে লিঙ্ক করা। এজন্য ট্র্যানজিস্টর আবিস্কারের পরেও কম্পিউটার গুলোতে হাজারো তারের মাঝে জট পাকিয়ে রাখার প্রয়োজন পড়তো।

তবে ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট আসার পরে এই সমস্ত বিষয়টিই সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন করা সম্ভব হয়েছে, এখানে লাখো যন্ত্রাংশের মধ্যে লিঙ্ক তৈরি করে একটি সম্পূর্ণ সার্কিট তৈরি করা হয় একটি সিলিকন পৃষ্ঠে। আর এই অত্যন্ত চালাক আইডিয়া কাজে লাগিয়েই আজকের প্রত্যেকটি মাইক্রো-ইলেক্ট্রনিক্স গ্যাজেট বানানো সম্ভব হয়েছে। পকেট ক্যালকুলেটর থেকে শুরু করে, কম্পিউটার চিপ, ডিজিটাল হাত ঘড়ি, এমনকি চাঁদে ল্যান্ড করা রকেটেও ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট ব্যবহার করা হয়।

প্রথমে ইঞ্জিনিয়াররা একটি চিপের মধ্যে ডজন খানেক যন্ত্রাংশ জুড়ে দেন আর এটাকে স্মল-স্কেল ইন্টিগ্রেশন (Small-Scale Integration (SSI) বলা হতো। তারপরে খুব শীঘ্রই একই সাইজের চিপের উপর শতাধিক যন্ত্রাংশ লাগানো সম্ভব হয়ে উঠে, যাকে মিডিয়াম-স্কেল ইন্টিগ্রেশন (Medium-Scale Integration (MSI) বলা হয়। এভাবে একই আকারের চিপের উপর হাজার যন্ত্রাংশ জুড়ে দেওয়া হয় যেটাকে লার্জ-স্কেল ইন্টিগ্রেশন (Large-Scale Integration (LSI), ১০ হাজার যন্ত্রাংশ জুড়ে দিয়ে ভেরি-লার্জ-স্কেল ইন্টিগ্রেশন (Very-Large-Scale Integration (VLSI), এবং আগের চেয়ে অনেক ছোট আকারের চিপে মিলিয়ন যন্ত্রাংশ লিঙ্ক করিয়ে তৈরি করা হয় আলট্রা-লার্জ-স্কেল (Ultra Large Scale)। গর্ডন মুর (Gordon Moore) আর তার ইনটেল কোম্পানি—যারা পৃথিবীর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ চিপ মেকার— তারা লক্ষ্য করলেন যে, প্রত্যেক কয়েক বছরে একই সাইজের চিপের উপর ডবল যন্ত্রাংশ লাগানো যাচ্ছে। তাই তারা প্রত্যেক বছর বা কয়েক বছর পরপরই তাদের চিপে আরো বেশি যন্ত্রাংশ লাগাতে সক্ষম হচ্ছে এবং আরোবেশি শক্তিশালি কম্পিউটার চিপ তৈরি করছে।

ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট কীভাবে তৈরি হয়?

সার্কিটআমরা জানি, সকল ম্যাটেরিয়াল (Materials) দুই শ্রেণির মধ্যে পড়ে, এক ধরনের ম্যাটেরিয়াল রয়েছে যারা নিজের মদ্ধ দিয়ে ইলেক্ট্রিসিটি পরিবহন করতে পারে, এদের কন্ডাক্টর (Conductors) বা পরিবাহী বলা হয়, এবং আরেক ধরনের ম্যাটেরিয়াল ইলেক্ট্রিসিটি পরিবহন করতে পারে না, এদের ইন্সুলেটর (Insulators) বা অপরিবাহি বলা হয়। সকল ধাতু সাধারনত পরিবাহী হয়ে থাকে, কিন্তু অধাতু যেমন- প্ল্যাস্টিক, কাঠ, কাঁচ —এগুলো অপরিবাহি হয়ে থাকে। সাধারন নজরে দেখলে যেকোনো ম্যাটেরিয়ালের বৈশিষ্ট্য অনেক পরিষ্কার মনে হবে, হয়তো কেউ পরিবাহী আর না হলে অপরিবাহি, তাই না? কিন্তু ব্যস্তবিকভাবে ম্যাটেরিয়ালরা এতোটাও সহজ না, বিশেষ করে পর্যায় সারণীর মাঝের দিকের ম্যাটেরিয়াল গুলো, যেমন- সিলিকন এবং জার্মেনিয়াম। এখানে এই অপরিবাহি গুলোকে পরিবাহীর মতো আচরণ করানো সম্ভব, শুধু এতে কিছু পরিমানে অমেধ্য মিশ করে দেওয়া প্রয়োজনীয়, আর এই প্রসেসকে ডোপিং (Doping) বলা হয়। যদি আপনি সিলিকনের সাথে রসাঁজন যোগ করে দেন, এর মানে আপনি এতে সাধারনের চেয়ে আরো বেশি ইলেকট্রন যোগ করিয়ে দিলেন—এবং এতে ইলেক্ট্রিসিটি পরিবহন করার ক্ষমতা যোগ করিয়ে দিলেন। এই উপায়ে ডোপ হওয়া সিলিকনকে এন-টাইপ (N-Type) বলে।

কিন্তু এতে যদি রসাঁজনের পরিবর্তে বোরন মিশিয়ে দেওয়া হয় এবং সিলিকন থেকে কিছু ইলেকট্রন নিয়ে নেওয়া হয়, তবে এটি নেগেটিভ চার্জ হিসেবে কাজ করবে। আর এই ধরনের সিলিকনকে পি-টাইপ (P-Type) বলা হয়। পি-টাইপ এবং এন-টাইপ সিলিকনকে পরস্পরের সাথে রাখার মাধ্যমে একটি সংযোগস্থল তৈরি হয় এবং ইলেকট্রন গুলো মজাদারভাবে আচরণ করতে থাকে। আর এইভাবেই আমরা ইলেক্ট্রনিক সেমি-কন্ডাক্টার নির্ভর যন্ত্রাংশ যেমন- ডায়োড (Diodes), ট্র্যানজিস্টর (Transistors), এবং মেমোরি (Memories) তৈরি করি।

একটি চিপের ভেতরে

ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট তৈরির শুরুর দিকটাতে একটি বিশাল আকারের সিলিকন ক্রিস্টাল নেওয়া হয়, যেটার আঁকার কোন নলের মতো, কিন্তু এটা ফাঁপা হয় না। এবার এই নলের আকারের সিলিকনকে অনেক পাতলা করে কাঁটা হয়, যার ফলে এক একটি কাঁটা অংশ ডিস্কের ন্যায় আঁকার ধারণ করে, অনেকটা সিডি’র মতো। এই ডিস্কের গায়ে অনেক গুলো চারকোনা এবং আয়তকার দাগ টানা হয় এবং দাগ টানার ফলে এতে লাখো কোটি আলাদা এরিয়া তৈরি হয়। আর এই এরিয়া গুলোকে পি-টাইপ অথবা এন-টাইপ তলে পরিণত করা হয়।

অবশ্যই ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট তৈরি হওয়াটা যতো সহজে বুঝালাম, এর প্রসেসটি কিন্তু মোটেও তেমন সহজ নয়, কেনোনা আপনার আঙ্গুলের চেয়েও ছোট জায়গাতে এখানে কোটিকোটি যন্ত্রাংশ থাকতে পারে। আবার চিন্তা করে দেখুন, আপনি এমন কিছু নিয়ে কাজ করছেন যেটার আঁকার মাইক্রোস্কপিক বা ন্যানস্কপিক। চিপ গুলোকে তৈরি করার পরে প্রত্যেকটি চিপকে কম্পিউটার দ্বারা পরীক্ষা করানো হয়, যদি কোন চিপ না কাজ করে তবে একে রিজেক্ট করে দেওয়া হয়। আর যে চিপ গুলো ঠিকঠাক মতো কাজ করে, সেগুলো কম্পিউটারে বা যেকোন ইলেক্ট্রনিক উপকরণে ব্যাবহারের জন্য রেডি হয়ে যায়।


ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট বানানোর জন্য এর আবিষ্কারকগনদের ধন্যবাদ না জানালেই নয়। আজকের দিনে কোটিকোটি কম্পিউটার মেশিন, সেলফোন, এবং অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক্স এ এটি ব্যবহার করা হয়। ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট ছাড়া কম্পিউটারের সাইজ কখনোয় এতোটা ছোট এবং দ্রুতগতির করা সম্ভব হয়ে উঠত না। তার সাথে ধন্যবাদ জানাই অ্যাপেল, ইনটেল, আইবিএম, এবং মাইক্রোসফটকে, যারা সিঙ্গেল-চিপ কম্পিউটারের ডিজাইন উন্নতি করেছে এবং কম্পিউটারকে বাড়ির ব্যাবহারে সস্তায় উপযোগী করে তুলেছে।


WiREBD এখন ইউটিউবে, নিয়মিত টেক/বিজ্ঞান/লাইফ স্টাইল বিষয়ক ভিডিও গুলো পেতে WiREBD ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুণ! জাস্ট, youtube.com/wirebd — এই লিংকে চলে যান এবং সাবস্ক্রাইব বাটনটি হিট করুণ!

আশা করছি, আর্টিকেলটি অসাধারণ ছিল এবং আপনার অনেক ভালো লেগেছে। ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট সম্পর্কে আপনার যেকোনো প্রশ্ন আমাকে নিচেকমেন্ট করে জানাতে পারেন।

তাহমিদ বোরহান
প্রযুক্তির জটিল টার্মগুলো কি আপনাকে বিভ্রান্ত করছে? কিছুতেই কি আপনার মস্তিষ্কে পাল্লা পড়ছে না? তাহলে বন্ধু, আপনি এবার সঠিক জায়গায় এসেছেন—কেনোনা এখানে আমি প্রযুক্তির সকল জটিল বিষয় গুলো ভাঙ্গিয়ে সহজ পানির মতো উপস্থাপন করার চেষ্টা করি, যাতে সকলে সহজেই সকল টেক টার্ম গুলো বুঝতে পারে।