অনলাইন টেক সাপোর্ট স্ক্যাম | জানুন এবং বাঁচুন

অনলাইন টেক সাপোর্ট স্ক্যাম

অনলাইন বা ইন্টারনেট মানুষের জন্য এবং তথ্য প্রযুক্তির উপর যেমন আশীর্বাদ বয়ে নিয়ে এসেছে ঠিক তেমনি উন্মুক্ত করেছে প্রতারিত হওয়ার নতুন নতুন পন্থা, যদিও এতে ইন্টারনেটের কোন দোষ নেই, দোষ কিছু লোভী মানুষের যারা টাকার লোভে অন্যদের প্রতারিত করছে। অনলাইন প্রতারণা; এই শব্দটি নিশ্চয় আপনার কাছে নতুন নয়, ইমেইল স্ক্যাম, ফোন কল স্ক্যাম, ক্রেডিট কার্ড স্ক্যাম, র‍্যান্সমওয়্যার ইত্যাদির পরে অনলাইন টেক সাপোর্ট স্ক্যাম যুক্ত হয়েছে নতুন এক স্ক্যামিং ট্রেন্ডে। এখানে আপনার কম্পিউটারের সাথে সাথে আপনাকেও আক্রান্ত করানো হয় (প্রতারিত করা) বিভিন্ন বিশ্বাসযোগ্য কথা সাজিয়ে এবং আপনার কাছ থেকে লুটে নিতে পারে শতশত ডলার। আজকের আর্টিকেলে এই নতুন স্ক্যামটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করবো এবং জানবো কীভাবে এই প্রতারণা থেকে বাঁচা সম্ভব।

অনলাইন টেক সাপোর্ট স্ক্যাম

অনলাইন টেক সাপোর্ট স্ক্যাম

আমাকে অনেকে জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা ভাই ভালো হ্যাকার কীভাবে হওয়া সম্ভব?” -দেখুন উত্তরটা কিন্তু অনেকটায় সহজ, কোন মেশিনের চাইতে মানুষকে বোকা বানানো এবং প্রতারিত করা অনেক সহজ। আর আপনি যদি কোন মানুষকে ছলনায় বোকা বানাতে পারেন, তবে ভেবে নিন আপনার অর্ধেক হ্যাকার হওয়া হয়ে গেছে। কিছু কিছু হ্যাকিং এ তো কোন টেক নলেজই লাগেনা, জাস্ট মানুষকে বোকা বানালেই হলো। অনলাইন টেক সাপোর্ট স্ক্যাম গুলোতে স্ক্যামাররা মানুষদের বোকা বানিয়েই ৮০% স্ক্যামিং সম্পূর্ণ করে। মানুষকে মিথ্যা বলে কোন বিষয়ে প্রতারিত করার এই পদ্ধতিকে হ্যাকিং জগতে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বলে।

স্ক্যামাররা বিভিন্ন ওয়েবসাইটটে ম্যালিসিয়াস অ্যাড বা সফটওয়্যার ইনজেক্ট করে রাখে, যখন সেগুলো আপনার ওয়েব ব্রাউজারে রান হয় আপনার সিস্টেমে গণ্ডগোল দেখা দিতে আরম্ভ করে। বারবার আপনার কাছে পপআপ আসতে আরম্ভ করে। এই পপআপ গুলোতে বেশিরভাগ সময়ই ফেক এরর ম্যাসেজ শো করে, “আপনার সিস্টেমটি এতো গুলো ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, অথবা অমুক হ্যাকার দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, সিস্টেমটিকে ক্লিন করতে বা ভাইরাস গুলো রিমুভ করতে অনলাইন টেক সাপোর্ট পেতে অমুক নাম্বারে কল করুন”। সাধারন মানুষ যখন সেই নাম্বার গুলোতে কল করে টেক সাপোর্ট নেওয়ার জন্য, ফোনের অপর পাশে স্ক্যামাররা আপনার টাকা লুটে নেওয়ার জন্য ওঁত পেতে থাকে।

তাদের কল করার পরে তারা এমন এক ভঙ্গী দেখানোর চেষ্টা করে, যেন তারা সত্যিই কোন টেক সাপোর্ট টিম থেকে আপনার সাথে কথা বলছে, কিছু স্ক্যামাররা তো সরাসরি আপনাকে বলেই দেবে, তারা মাইক্রোসফট থেকে কথা বলছে। তারা হয়তো আপনাকে বলবে, “আমরা অ্যামেরিকার অমুক স্টেট থেকে কথা বলছি” কিন্তু তাদের ইংরেজি বলার ভঙ্গী কখনোই অ্যামেরিকানদের মতো হয়না। ব্যাপারটা দুঃখের হলেও সত্যি, এখনো পর্যন্ত সিংহভাগ স্ক্যামারের অবস্থান ইন্ডিয়া। জী হ্যাঁ, বেশিরভাগ অনলাইন টেক সাপোর্ট স্ক্যামার ইন্ডিয়া থেকেই দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু এরা কোন ইন্ডিয়ান নাম্বারে কল করতে বলে না, এরা স্ক্যাম করার জন্য ফেক ইউএস নাম্বার এবং বেশিরভাগ সময়ে টোল ফ্রী নাম্বার (যে নাম্বারে কথা বলতে টাকা লাগে না) ব্যবহার করে যাতে স্ক্যাইপ ব্যবহার করে এদের সহজেই কল করা যায়।

যাই হোক, কল রিসিভ করে আপনার সমস্যা শোনার পরে তারা আপনার পিসি হতে রিমোট অ্যাক্সেস পেতে চাইবে। আর যেকেউই তার কম্পিউটার সমস্যা সমাধানে রিমোট অ্যাক্সেস দিয়ে দেবে। রিমোট অ্যাক্সেস নেওয়ার পরে এদের আসল সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং শুরু হয়। প্রথমে তো বলে, “আপনার সিস্টেমে কি সমস্যা হয়েছে সেটা দেখার জন্য আমাকে আপনার সিস্টেমটি ডায়াগনসিস করতে হবে, এরপরে “উইন্ডোজ ইভেন্ট ভিউয়ার” থেকে সিস্টেম লগ দেখিয়ে বলে আপনার সিস্টেমে এতো গুলো সমস্যা রয়েছে। অথবা স্ক্যামার আপনার কম্পিউটারে কোন অঝথা ডায়াগনস্টিক টুল ইন্সটল করে দেখাবে আপনার সিস্টেমে কতো গুলো সমস্যা রয়েছে। এরপরে আপনাকে জিজ্ঞেস করা হয় আপনি সমস্যা গুলোর সমাধান করাতে চান কিনা, যদি চান তবে আপনাকে কয়েক শত ডলার পে করতে হবে এবং পে করার পরে টেকনিশিয়ান তার কাজ করতে আরম্ভ করবে। এখানে উল্লেখ্য যে, আপনার কম্পিউটারে কোন সমস্যা না থাকলেও এরা আপনাকে অযৌক্তিক সমস্যা দেখানোর চেষ্টা করবে এবং জেনে রাখুন বেশিরভাগ ইন্ডিয়ান স্ক্যামাররা কম্পিউটারে একদম জিরো, এরা শুধু মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য পটু, এরা কখনোই আসল সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম নয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমি অনেক স্ক্যামারদের দেখেছি এরা লিনাক্স বা ম্যাকেও “সিএমডি” খোঁজার চেষ্টা করে।

আবার কিছু কিছু চালাক স্ক্যামার থাকে যারা আপনার সিস্টেমে রিমোট অ্যাক্সেস নেওয়ার পরে সিস্টেমকে অকেজো করতে আসল ম্যালওয়্যার ইন্সটল করে দেয় বা র‍্যান্সমওয়্যার ইন্সটল করিয়ে দেয়। এতে আপনাকে স্ক্যামারকে টাকা দিয়েই হয়, না হলে আপনার ডাটা গুলো নিশ্চিত হারিয়ে ফেলবেন। কোন কোন স্ক্যামার আপনার কম্পিউটার থেকে ক্রেডিট কার্ড ডিটেইলস, ব্যাংক ডিটেইলস, আপনার ইমেইল অ্যাড্রেস, ব্রাউজিং হিস্টরি, ব্রাউজারে সেভড পাসওয়ার্ড ইত্যাদি চুরি করার চেষ্টা করে। যেহেতু স্ক্যামার আপনার পিসিকে সম্পূর্ণভাবে ব্যবহার করতে থাকে, তাই এরা এতে যেকোনো কিছু ইন্সটল করিয়ে দিতে পারে। আপনার কম্পিউটারকে তারা বটনেটের সাথেও যুক্ত করিয়ে দিতে পারে।

কীভাবে বাঁচবো?

এদের এই কর্মকাণ্ড গুলো থেকে বাঁচতে হলে চলে যেতে হবে শুরুর দিকে; কীভাবে প্রথমত আপনি এদের শিকার হতে পারেন। বেশিরভাগ সময়ই আপনি এমন ধরনের ম্যালওয়্যার দ্বারা আকান্ত হন কোন ওয়েবসাইটের পপআপ অ্যাড থেকে। দেখা যায় ফ্রী ডাউনলোড সাইট গুলোতে গেলে বা কোন অ্যাডাল্ট সাইটে অনেক পপআপ খুলে যায়, এগুলোতে বিভিন্ন ম্যালিসিয়াস কনটেন্ট থাকে বা ম্যালিসিয়াস কুকিজ আপনার ব্রাউজারে ইন্সটল হয়ে যায়, এতে আপনার কম্পিউটারে ফেক ম্যাসেজ সহ আপনার সকল তথ্য গুলো চুরিও হয়ে যেতে পারে। অনেকে আজকাল পপআপ অ্যাড গুলোকে ব্লক করার জন্য ব্রাউজারে অ্যাড ব্লক এক্সটেনশন ব্যবহার করেন, কিন্তু কিছু কিছু শক্তিশালী পপআপ রয়েছে যেগুলোকে অ্যাড ব্লকার ফিল্টার করতে পারে না। তাহলে এগুলো থেকে বাঁচার উপায়টা কি?

প্রথমত আমি সাজেস্ট করবো, পাইরেসিং কন্টেন্ট ডাউনলোড করা থেকে বিরত থাকুন এমন ওয়েবসাইটে প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকুন যারা পেইড কনটেন্ট ফ্রী প্রদান করার অফার করে। অ্যাডাল্ট সাইট গুলো ভিজিট করা থেকে বিরত থাকুন। এরপরেও যদি আপনার এই সাইট গুলো ভিজিট করতেই হয় তবে ব্রাউজারে ইনকগ্নিটো উইন্ডো খুলে নিন, এতে পপআপ থেকে কোন কুকিজ ব্রাউজারে প্ল্যান্ট হতে পারবে না, এই মুডে ব্রাউজার উইন্ডো ক্লোজ করার সাথে সাথেই সকল ডাটা গুলো ব্রাউজার রিমুভ করে দেয়। তাছাড়া বেশি সুক্ষিত থাকতে গুগল ক্রোম ব্রাউজার ব্যবহার করুন, এই ব্রাউজার সান্ড বক্স প্রযুক্তি ব্যবহার করে; অর্থাৎ কোন ভাইরাস যদি ব্রাউজারে লোড হয়েও যায় সেটি শুধু ঐ ট্যাবটি পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে বাকী সিস্টেমে ঐ ভাইরাসটিকে আসতে দেয় না। তাছাড়া অনলাইন ম্যালওয়্যার গুলো থেকে বাঁচতে অবশ্যই ভালো মানের এন্টিভাইরাস বা এন্টিম্যালওয়্যার প্রোগ্রাম ব্যবহার করুন এবং নিজের উপস্থিত বুদ্ধির ব্যবহার করুন। কিছু পপআপ অ্যাডে অনেক চালাকির সাথে আপনাকে আক্রান্ত করানোর চেষ্টা করানো হয়। সেখানে বলা থাকে, “আপনি জানেন কি, অ্যাডাল্ট সাইট ভিজিট করার পরে সেখান থেকে ম্যালিসিয়াস সফটওয়্যার আপনার সিস্টেমে চলে এসেছে? সেগুলো রিমুভ করতে অমুক টুল ইন্সটল করুন।” আর এই টুল গুলোই হলো আসল ভাইরাস।

আবার সবসময় এমনটা নাও হতে পারে, আগে আপনার সিস্টেমে স্ক্যামারদের নাম্বার শো করলো পরে আপনি তাদের কল করলেন; স্ক্যামাররা কোথা থেকে আপনার নাম্বার জোগাড়কে আপনাকেই আগে কল করতে পারে এবং মাইক্রোসফট থেকে কল করেছে বলে মিথ্যাচার করতে পারে। আপনার সিস্টেমে তারা সমস্যা দেখতে পেয়েছে বলে ফিক্স করার জন্য রিমোট অ্যাক্সেস পেতে চাইবে, তারপর তারা বিভিন্নভাবে আপনাকে প্রতারিত করবে এবং আপনার কাছ থেকে টাকা বা তথ্য চুরি করে নেবে। এরকম টেক সাপোর্ট থেকে আসা কল গুলোকে সরাসরি ইগনোর করে দিন। আর এভাবে মাইক্রোসফট থেকে কখনোই টেক সাপোর্ট দিয়ে কল করা হয় না, আর আপনি জেনুইন উইন্ডোজ ব্যবহার না করলে আপনার কাছে তো কিয়ামত পর্যন্ত মাইক্রোসফট কল করবেই না।

শেষ কথা


WiREBD এখন ইউটিউবে, নিয়মিত টেক/বিজ্ঞান/লাইফ স্টাইল বিষয়ক ভিডিও গুলো পেতে WiREBD ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুণ! জাস্ট, youtube.com/wirebd — এই লিংকে চলে যান এবং সাবস্ক্রাইব বাটনটি হিট করুণ!

তো আপনি জানলেন, কীভাবে অনলাইন টেক সাপোর্ট স্ক্যাম গুলো সংগঠিত হয়ে থাকে এবং কীভাবে স্ক্যামার আপনাকে প্রতারিত করতে পারে। যেকোনো স্ক্যামিং করার সময় মানুষকে বোকা বানানোর চেষ্টা করা হয়, আর আপনি এই আর্টিকেলটি পড়ে এবং সকলকে শেয়ার করার মাধ্যমে সকলকে সচেতন করতে সাহায্য করুন, যাতে এ ধরনের স্ক্যাম থেকে আমরা সকলেই বাঁচতে পারি। আপনি কখনো কোন স্ক্যামের শিকার হয়েছেন কি? হলে, আপনার অভিজ্ঞতা কি ছিল, নিচে আমাদের কমেন্ট করে জানান।

তাহমিদ বোরহান
প্রযুক্তির জটিল টার্মগুলো কি আপনাকে বিভ্রান্ত করছে? কিছুতেই কি আপনার মস্তিষ্কে পাল্লা পড়ছে না? তাহলে বন্ধু, আপনি এবার সঠিক জায়গায় এসেছেন—কেনোনা এখানে আমি প্রযুক্তির সকল জটিল বিষয় গুলো ভাঙ্গিয়ে সহজ পানির মতো উপস্থাপন করার চেষ্টা করি, যাতে সকলে সহজেই সকল টেক টার্ম গুলো বুঝতে পারে।