ক্যামকরডার, ভিডিও ক্যামেরা | কিভাবে চোখ মস্তিষ্ককে বোকা বানায়?

ক্যামকরডার

আজকের যেকোনো সাধারন ডিজিটাল ক্যামেরা, সাথে আপনার ফোনের ক্যামেরাও নিঃসন্দেহে অসাধারণ ফটো ক্যাপচার করতে সক্ষম। প্রফেশনাল ফটোগ্রাফি ক্যামেরা বা ডিএসএলআর ক্যামেরা গুলোর তো কোন জবাবই হয় না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ফটোতে এই পৃথিবীটা স্থির আর নীরব হয়ে থাকে—যেখানে আমাদের চারপাশে সর্বদা কিছু না কিছু নড়াচড়া করেই চলছে। ভাগ্যক্রমে, ক্যামকরডার বা ভিডিও ক্যামেরা—আমাদের চারপাশের নড়াচড়া করা বস্তুগুলোর মুভিং ইমেজ নিতে পারে এবং পৃথিবীকে সঠিক প্রাণবন্তভাবে আমাদের সামনে উপস্থাপন করতে পারে। মুভি ক্যামেরা বা ক্যামকরডারে এমনকি আপনার সেলফোন ভিডিও ক্যামেরা দক্ষভাবে পরিচালনার মাধ্যমে আপনিও হয়ে যেতে পারেন পরবর্তী ইউটিউব স্টার! অথবা কোন ফিল্ম প্রোডাকশন কোম্পানিতে আপনার ক্যারিয়ার চালু করতে পারেন—যাইহোক, সে এক আলাদা গল্প। আজ আলোচনা করবো, ভিডিও ক্যামেরা কিভাবে কাজ করে সেই সম্পর্কে, তো চলুন শুরু করা যাক…

চোখ আর মস্তিষ্কের খেলা

ক্যামকরডার

কোন মুভি ক্যামেরা বা ক্যামকরডারকে দেখতে ব্যাস একটি ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রের ঢোক মনে হতে পারে। এটিকে খুললে, সাধারনত নানান ধরনের ম্যাকানিক্যাল এবং ইলেক্ট্রিক্যাল যন্ত্রপাতির ঢের দেখতে পাওয়া যাবে। কিন্তু আপনি জানেন কি, কোন ভিডিও ফুটেজ তৈরি করতে ক্যামেরার লেন্স, প্রসেসর, ইলেকট্রিক মোটর, বা আরো বাকি সব ইলেক্ট্রনিক্স এর তেমন কোন কাজই নেই—সমস্থ ব্যাপারই হলো আপনার চোখ আর মস্তিষ্কের।

আপনার চোখের সামনে দিয়ে একই অবজেক্টের বিভিন্ন নড়াচড়ার অনেক ফটো অনেক দ্রুত পাড় করে নেওয়া হলে আপনার কাছে সেই ফটো গুলোকে জীবন্ত বা চলমান মনে হবে। উদাহরণ নেওয়ার জন্য আপনার ফোন ক্যামেরার ব্যার্স্ট সট (Burst) নিতে পারেন। আপনার ফোন ক্যামেরার ফটো ক্যাপচার বাটনটিকে চেপে ধরে থাকলে এটি অনেক দ্রুত গতিতে একসাথে অনেক ফটো ক্যাপচার করবে। এখন আপনার ফোনের ক্যামেরাকে কোন মুভিং অবজেক্টের দিকে ধরুন এবং ব্যার্স্ট সট নিন। সট নেবার পরে ফটো গুলোকে অনেক দ্রুত ব্রাউজ করুন বা স্লাইড শো তৈরি করুন—দেখবেন আপনার চোখের সামনে দিয়ে যখন ফটো গুলোকে দ্রুত মুভ করা হবে, আপনার মনে হবে আপনি কোন ভিডিও দেখছেন।

এটি আসলে কোন ভিডিও নয় এটি আপনার দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতা (Persistence of Vision) ব্যবহার করে কাজ করে। চলুন আমাদের চোখ কিভাবে কোন অবজেক্টকে দেখে তার সম্পর্কে সামান্য একটু ধারণা নেওয়া যাক। কোন অবজেক্ট থেকে আলো প্রতিফলিত হয়ে আপনার চোখের মাধ্যমে সেটি আপনার ব্রেইনে গিয়ে পৌঁছায়। প্রথমে অবজেক্টটির একটি উল্টা প্রতিবিম্ব আপনার চোখের ভেতরে তৈরি হয় এবং সেটি ব্রেইনে পৌঁছানোর পরে আবার ঠিক হয়ে আসল অবজেক্ট দেখতে সাহায্য করে। এভাবে অবজেক্টটি যতক্ষণ আপনার চোখের সামনে থাকে, ততক্ষণ সেটি থেকে আলো চোখে আসে এবং ব্রেইন তা দেখতে পায়। কিন্তু দেখতে থাকা কোন অবজেক্ট হঠাৎ করে সরিয়ে নিলেও সেটি কিন্তু তাৎক্ষনিক আপনার ব্রেইন থেকে সড়ে যায় না—সেটির অস্তিত্ব কিছুক্ষণ পর্যন্ত আপনার ব্রেইনে রয়েই যায়। আর একেই দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতা বা পারসিসটেন্স অফ ভিশন বলা হয়। বিষয়টিকে আরো পরিষ্কার করার জন্য আপনি এই ভিডিওটি দেখতে পারেন; https://www.youtube.com/watch?v=YismwdgMIRc

ক্যামকরডার কিভাবে কাজ করে?

এখনকার ডিজিটাল ক্যামকরডার বা ভিডিও ক্যামেরা আগের ক্ল্যাসিক ক্যামেরা গুলো থেকে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে কাজ করে। ক্ল্যাসিক ক্যামেরা গুলো একটি অনেক বড় ম্যাকানিক্যাল ডিভাইজ হতো, এবং এতে একটি বিশাল লম্বা আকারের প্ল্যাস্টিক ফিল্মে একের পর এক ছবি উঠিয়ে যেতো। পরে এই ছবি গুলোকে একত্রিত করে দ্রুত চোখের সামনে দিয়ে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে ভিডিও দেখতে পাওয়া যেতো। ক্ল্যাসিক ক্যামেরা গুলো অ্যানালগ পদ্ধতিতে কাজ করতো, কেনোনা এতে পিকচারকে সরাসরি পিকচার হিসেবেই সেভ করা হয়। কিন্তু ডিজিটাল ক্যামেরাতে পিকচারকে নাম্বার বা ডিজিট হিসেবে সংরক্ষিত করা হয়।

ক্ল্যাসিক মুভি ক্যামেরা

ক্ল্যাসিক মুভি ক্যামেরা

ক্ল্যাসিক মুভি ক্যামেরা অনেকটা আগের পুরাতন প্ল্যাস্টিক ফিল্ম ক্যামেরার মতোই কাজ করে। পুরাতন প্ল্যাস্টিক ফিল্ম ক্যামেরা গুলোতে ফটো উঠানোর সময় স্যাটার খুলে ভেতরে আলো প্রবেশ করানোর প্রয়োজন পড়তো এবং এর ভেতরে অবস্থিত থাকা ফিল্ম একটির পরে আরেকটি এগিয়ে আসতো। কিন্তু মুভি ক্যামেরাতে অনবরত স্যাটার খোলা এবং বন্ধের প্রয়োজন হয়—সাধারনত এটি প্রতি সেকেন্ডে ২৪ বার খোলে এবং বন্ধ হয়। স্যাটার খোলা এবং বন্ধের সাথে এর ভেতরে থাকা প্ল্যাস্টিক ফিল্মকেও অনবরত ঘোরানোর প্রয়োজন পড়ে, যাতে এটি সকল ফটো গুলোকে ফ্রেম বাই ফ্রেম ক্যাপচার করতে পারে। তারপর এই লম্বা প্ল্যাস্টিক ফিল্মকে প্রোজেক্টর মেশিনে লাগানো হয়—যেখানে ফিল্মে থাকা ফটো গুলো অনেক দ্রুত একের পর এক অবস্থান পরিবর্তন করে এবং আপনার কাছে এর ফাইনাল রেজাল্টকে ভিডিও বা চলমান ছবি বলে মনে হয়।

ডিজিটাল ভিডিও ক্যামেরা বা ক্যামকরডার

ক্যামকরডার

যখন প্রথম ভিডিও ক্যামেরা আবিষ্কার হয়, তখন প্ল্যাস্টিক ফিল্মের জায়গায় চলে আসে ম্যাগনেটিক প্ল্যাস্টিক ভিডিও টেপ। এটি ফিল্ম থেকে অনেক বেশি সস্তা, সহজ এবং একে ব্যবহার করার আগে কোন ডেভেলপমেন্ট করার প্রয়োজনও পড়ে না। আজকের মডার্ন ইলেক্ট্রনিক ডিজিটাল ভিডিও ক্যামেরা গুলো ডিজিটাল ভিডিও ব্যবহার করে। এই ক্যামেরা গুলো সরাসরি কোন অবজেক্টের ফটো না উঠিয়ে এতে থাকা একটি আলোক সংবেদনশীল চিপ লেন্স থেকে আসা তথ্যকে ডিজিটাল ফরম্যাটে পরিণত করে—এই মাইক্রো চিপটিকে সিসিডি বলা হয়। অন্যভাবে বলতে গেলে ডিজিটাল ক্যামেরায় প্রত্যেকটি ফ্রেম সরাসরি ইমেজ হিসেবে সংরক্ষিত না থেকে ডিজিটাল ফরম্যাট বা নাম্বার হিসেবে সংরক্ষিত থাকে। আর এর ভিডিও ডিজিটাল ফরম্যাটে হওয়ার কারণে একে ডিভিডি, বিভিন্ন ফ্যাশ ড্রাইভ, হার্ডড্রাইভ ইত্যাদিতে সংরক্ষিত করে রাখা যায়। ভিডিওকে ডিজিটাল ফরম্যাটে সেভ করে রাখার জন্য আপনি চাইলে একে কম্পিউটারে এডিট করতে পারেন, ওয়েবসাইটে আপলোড করতে পারেন, বিভিন্ন ডিভাইজে কপি করে প্লে করতে পারেন—যেটা আগের ক্ল্যাসিক ভিডিও রেকর্ডিং থেকে কখনোই সম্ভব হতো না।

শেষ কথা


WiREBD এখন ইউটিউবে, নিয়মিত টেক/বিজ্ঞান/লাইফ স্টাইল বিষয়ক ভিডিও গুলো পেতে WiREBD ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুণ! জাস্ট, youtube.com/wirebd — এই লিংকে চলে যান এবং সাবস্ক্রাইব বাটনটি হিট করুণ!

আশা করি আজকের আর্টিকেল থেকে আপনি সহজেই বুঝতে পারলেন, কিভাবে ভিডিও ক্যামেরা কাজ করে এবং আপনার চোখ কিভাবে মস্তিস্ককে ধোঁকা দিয়ে ফটোকে ভিডিও রূপে প্রদর্শিত করে। আমি ডিজিটাল ক্যামেরা নিয়ে আরো একটি বিস্তারিত আর্টিকেল লিখবো এবং সেখানে সহজ ব্যাখ্যার সাথে কিছু টেকনিক্যাল টার্মও আলোচনা করবো। আজকের আর্টিকেলটি সম্পর্কে যেকোনো প্রশ্ন করতে অবশ্যই নিচে কমেন্ট করুন এবং আপনার ভিডিও রেকর্ডিং অভিজ্ঞতা আমাদের সাথে শেয়ার করুন।

প্রযুক্তির জটিল টার্মগুলো কি আপনাকে বিভ্রান্ত করছে? কিছুতেই কি আপনার মস্তিষ্কে পাল্লা পড়ছে না? তাহলে বন্ধু, আপনি এবার সঠিক জায়গায় এসেছেন—কেনোনা এখানে আমি প্রযুক্তির সকল জটিল বিষয় গুলো ভাঙ্গিয়ে সহজ পানির মতো উপস্থাপন করার চেষ্টা করি, যাতে সকলে সহজেই সকল টেক টার্ম গুলো বুঝতে পারে।

8 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *