অনলাইন রিভিউ কতোটা নির্ভরযোগ্য? ভালো রেটিং মানেই কি চোখ বন্ধ করে কেনা উচিৎ?

অনলাইন রিভিউ

নভেম্বর ও ডিসেম্বরের এই সময়ে এতো এতোবেশি অফার আসতে শুরু করে যে, যে কখনো অনলাইন শপিং করেনি সেও শপিং করতে শুরু করে। কিন্তু কোন কিছু কেনার আগে কাকে জিজ্ঞাস করবেন, প্রডাক্টটা কেমন হবে, টাকাটা পানিতে যাবে না তো? এর সঠিক উত্তর এক মাত্র তারায় দিতে পারবে যারা অলরেডি প্রডাক্টটা কিনেছে তাই না? আর এই জন্যই অনলাইন রিভিউ সিস্টেম কাজে চলে আসে! প্রায় প্রত্যেকটা ই-কমার্স সাইটে প্রত্যেকটা প্রডাক্টটের জন্য আলাদা আলাদা রিভিউ সেকশন থাকে, রেটিং সিস্টেম থাকে। তো ভালো রেটিং মানেই কি চোখ বন্ধ করে কেনা উচিৎ? ওয়েল, এই প্রশ্নের উত্তরটি একটু ট্যারা টাইপের হতে পারে, তো চলুন পূর্বে আলোচনা করা যাক, তারপরে উত্তর হয়তো আপনি নিজেই খুঁজে বের করতে পারবেন!


অনলাইন রিভিউ

প্রিয়জনকে নিয়ে কোন রেস্টুরেন্ট বা বড় হোটেলে বেড়াতে যাবেন কিছু কোয়ালিটি টাইম এক সাথে খরচ করার জন্য। কাকে জিজ্ঞাস করবেন, রেস্টুরেন্টটা কেমন? বেস্ট পদ্ধতি হচ্ছে গুগল ম্যাপের রেটিং দেখা, কিছু রিভিউ পড়ে দেখা, tripadvisor.com থেকে হোটেল বা রেস্টুরেন্ট এর সম্পর্কে রিভিউ পড়ে নেওয়া! তারপরে সেখানে ভ্রমণ করলে আর কোনই অসুবিধা থাকবে না, আপনি আগে থেকেই সবকিছু জেনে গেলেন! ওয়েট! সত্যিই কি তাই?

কোন কিছুর অনলাইন রিভিউ যতোটা সহজ মনে করেছিলেন, আসলে ব্যাপারটা ততোটা সহজ নয়। আপনি মনে মনে যে প্রডাক্ট বা সার্ভিসের কথায় চিন্তা করবেন, অনলাইনে অলরেডি সেটার লাখো বা কোঁটি রিভিউ পূর্বে থেকেই রয়েছে। কিন্তু এগুলো কতোটা ভরসার? আপনি যার থেকে মতামত নিয়ে দামি কার কেনার চিন্তা করছেন বা ছুটির দিনে হোটেল বুক করতে চাচ্ছেন, তাকে কিন্তু আপনি মোটেও চেনেন না, কিভাবে জানবেন সে সত্যটাই রিভিউ করেছে?

এখানে একটা ভালো ব্যাপার রয়েছে, যেমন আপনি নিশ্চয় একজনের রিভিউয়ের উপরে বিশ্বাস করে প্রডাক্ট কিনবেন না, প্রডাক্টটি সর্বোপরি কতো স্টার পেয়েছে বা ডট পেয়েছে তার উপরে মোটামুটি ধারনা করা যায়। কোন প্রডাক্টে হয়তো ৫ স্টার এর মধ্যে ৪.৫ স্টার রেটিং রয়েছে, আপনি নিশ্চয় সেই প্রডাক্টকে ভালোই বলবেন। পূর্বে বট দ্বারা এগুলো রিভিউ এবং রেটিং করিয়ে নেওয়া হতো, কিন্তু বর্তমানে ই-কমার্স সাইট গুলো সহজেই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কাজে লাগিয়ে বট রিভিউ ডিলিট করে দিতে পারে। আর বট গুলো এখনো এতোবেশি উন্নত হয়নি যে মানুষকে রাজি করানোর মতো রিভিউ তৈরি করবে।

তাহলে অনলাইন রিভিউ গুলো এখন বেশ নিরাপদ? তাই না?

ফেক রিভিউ ইন্ডাস্ট্রি

বট রিভিউ থেকে অনেকটা নিস্তার পাওয়া গেলেও ফেক রিভিউ থেকে নিস্তার পাওয়া যায়নি এখনো। অনলাইনে ফেক রিভিউ তৈরি করে এমন ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে। পেইড ফেক রিভিউয়ারের আর্মি রয়েছে, ফ্রিলান্সিং রাইটিং সাইট, মাইক্রো জব টাইপের সাইটে এরকম অনেক ফেক রিভিউ তৈরি করিয়ে নেওয়া হয়। আপনি যে প্রডাক্টের উপরে এতোবেশি পজিটিভ রিভিউ দেখছেন হতে পারে তার ৮০% রিভিউয়ার সেই প্রডাক্ট কোন দিন কিনেই নি বা ব্যবহার ও করে দেখেনি, জাস্ট কিছু টাকা দিয়ে তাদের থেকে রিভিউ লিখিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এক পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে প্রায় ৩০% অনলাইন রিভিউ জাস্ট ফেক হয়ে থাকে। আর এই ৩০% অংকটা কিন্তু কম নয়। যারা ফেক রিভিউ তৈরি করে, তারা খুব ভালো করেই যানে অনলাইন রিভিউ কতোটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। আপনি নিজেই বলুন, কোন এক সাইটে গেলেন, আপনার পছন্দের প্রডাক্ট সার্চ করলেন, একসাথে অনেক গুলো সেলার থেকে প্রডাক্ট রেজাল্ট আসলো, আপনি কিন্তু সেটাতেই ক্লিক করবেন যেটার রেটিং সবচাইতে বেশি তাই না?

অনলাইন রিভিউ অনেক সহজেই কাস্টমার আকৃষ্ট করতে পারে, আর প্রডাক্টের প্রতি তাদের তাড়িয়ে নিয়ে আসতে পারে। fiverr.com এর মতো সাইটে মাত্র ৫ ডলার খরচ করে আপনি যেকোনো প্রডাক্ট বা সার্ভিসের উপরে হাই কোয়ালিটি রিভিউ লিখিয়ে নিতে পারবেন, যারা কখনোই সেই প্রডাক্ট ব্যবহার করেনি বা কখনোই সেই জায়গায় পা রেখে দেখেনি! অনেক সফটওয়্যার রয়েছে যেগুলো নেগেটিভ রিভিউ গুলোকে ডিলিট করে দেয়, মানে ফেসবুক, গুগল, বিং কোথাও আপনার প্রডাক্টের নেগেটিভ রিভিউ পপ-আপ হবেনা।

তো বুঝতেই পারছেন, ফেক অনলাইন রিভিউ এর সম্পূর্ণ এক ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে, আর এই কারণে সরাসরি ভালো রিভিউ দেখলেই ১০০% কোন কিছু বিশ্বাস করে ফেলতে হবে ব্যাপারটা মোটেও আর এমন নেই। তাহলে কি করা যেতে পারে? কিভাবে ফেক অনলাইন রিভিউ চেনা যেতে পারে? চলুন, নিচের প্যারাগ্রাফে এই নিয়ে আলোচনা করা যাক…

ফেক অনলাইন রিভিউ চেনার উপায়

ফেক অনলাইন রিভিউ চেনার জন্য আপানর কমন সেন্স ব্যবহার করাটা অনেক জরুরি। সাধারণত ফেক রিভিউ গুলো অনেক বেশি ফর্মাল হয়ে থাকে, কাস্টমার কনভেন্স করানোর জন্য এগুলো বিশেষভাবে লেখা হয়। আরেকটি প্যাটার্ন হচ্ছে ফেক রিভিউ গুলোতে ব্যাকরণগত অনেক ভুল থাকে, সাথে সাধারণ অনেক বানানে ভুল দেখতে পাওয়া যায়। ফেক পজিটিভ রিভিউ গুলোতে বর্ণনার অনেক অভাব দেখতে পাওয়া যায়। যেমন- সরাসরি হয়তো লিখে, “ভালো জিনিস”, “অসাধারণ প্রডাক্ট”, “সেলারকে ধন্যবাদ” — এখানে প্রডাক্টটি আসলেই কেমন বা ব্যবহার করার পরে তার কেমন অভিজ্ঞতা হয়েছে এই ব্যাপারে কিছুই লেখা নেই!

আবার অনেক সময় এতোবেশি ডিটেইলস থাকে সম্পূর্ণ রিভিউ জুরে যে বর্ণনা গুলো জানার কারোই দরকার নেই। বিশাল আর অত্যন্ত ডিটেইলসে ভরা থাকে এমন রিভিউ, যেগুলো ও সাস্পিসিয়াস এর খাতায় নাম লেখায়।

অনলাইনে শুধু পজিটিভ রিভিউই ফেক করানো হয় না, অনেক ফেক নেগেটিভ রিভিউ ও রয়েছে। কোন সেলারের প্রতিদ্বন্দ্বী পেইড নেগেটিভ রিভিউ লিখিয়ে থাকে, যাতে ঐ সেলারকে ডাউন করানো যায়। হ্যাঁ, এরকম ন্যাস্টি বিজনেস অনলাইনে প্রতিনিয়তই ঘটে! অনেক রিভিউয়ে দেখা যায় সরাসরি প্রডাক্ট বা প্লেসের দুর্নাম করে দেওয়া হয়, অথবা স্পষ্টতই বুঝা যায় ঐ ব্র্যান্ডের উপরে তার বিশেষ চুলকানি রয়েছে। কিন্তু বিশেষ করে এমন রিভিউয়ে ঘৃণার কারণ বর্ণিত থাকে না। জাস্ট লিখে ফেলে, “ফালতু প্রডাক্ট, কেউ জীবনেও কিনবেন না!” — এভাবে ডাইরেক্ট হিট করে ড্যামেজ করানোর চেষ্টা চালানো হয়।

এখন এটাও মাথায় রাখতে হবে, ব্যাকরণগত ত্রুটি থাকলেই কিংবা কেউ প্রডাক্ট কিনে খারাপ অভিজ্ঞতা শেয়ার করলেই সেটা ফেক রিভিউ। কিন্তু এমন জিনিস চোখে পড়লে একটু সতর্ক হওয়াই বেশি ভালো, এতে ঠকার সুযোগ কমে যায় আর কি!

এবার সিদ্ধান্ত নিজের

প্রথমে অনলাইন রিভিউ তো চেক করতেই হবে, কিন্তু তারপরের স্টেপে নিজেকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনি প্রডাক্টটি কিনবেন কিনা বা সেই প্লেসটি বুক করবেন কিনা। একটি জিনিস মনে রাখবেন, কেউ কোন প্রডাক্টের উপরে তখনই রিভিউ লিখে যখন হয় প্রডাক্টটি ব্যবহার করে ইউজার মারাত্মক সাটিস্ফাইড হোন অথবা প্রডাক্টটি থেকে মারাত্মক পরিমাণে বিরক্ত হোন, এই দুই অবস্থাতে কেউ আসলে অনলাইনে রিভিউ লিখতে বসে আরো মানুষকে জানানোর জন্য। আর বাকিরা রিভিউ লেখা নিয়ে মাথা ঘামায় না।

কোন প্রডাক্ট বা প্লেসের রেটিং খারাপ মানে এটা ইনস্ট্যান্ট খারাপ জিনিস বা প্লেস হয়ে যায় না। এটা নির্ভর করে আপনার উপরে, ধরুন কোন রেস্টুরেন্টকে একেবারে কম রেটিং দিয়েছে বেশিরভাগ ইউজার কেননা ঐ রেস্টুরেন্ট অনেকবেশি কোলাহলপূর্ণ, কিন্তু হতে পারে প্লেসটি অনেক বেশি সস্তা আর টাকা হিসেবে সব কিছু দুগুণ সুবিধা রয়েছে। এখন আপনি যদি বন্ধুদের নিয়ে পার্টি দিতে যান তাহলে ঐ জায়গাটি আপনার জন্য বেস্ট হতে পারে, যতোই সেটার রেটিং কোলাহলের জন্য খারাপ হোক না কেন। তাই রেটিং পড়ার পরে ভেবে দেখতে হবে কেউ কেন খারাপ বা ভালো রেটিং দিয়েছে!

এমন নয় যে অনলাইনে আসল রিভিউ থাকতেই পারে না, হ্যাঁ অনেক সৎ রিভিউ ও রয়েছে কিন্তু ফেক রিভিউয়ের ভিড়ে সেগুলোকে খুঁজে পাওয়া অনেক মুশকিল! আর একটা কথা মাথায় রাখবেন, কোন প্রডাক্ট লাখোবার বিক্রি হওয়ার পরেও মাত্র ২% আসল ইউজার রিভিউ লেখার মতো কাজ করেন। আর বাকিদের এই ব্যাপারে কোনই মাথা ব্যাথা নেই, তাহলে এই মিলিয়ন মিলিয়ন রিভিউ গুলো আসে কই থেকে? ওয়েল, এতোক্ষণে নিশ্চয় এই উত্তর আপনার কাছে পরিষ্কার!


তো এক কথায় উত্তরটি কি দাঁড়াল? অনলাইন রিভিউয়ের উপরে কোন ভরসা রাখা যাবে না? ওয়েল, আমি সেটা সরাসরি বলবো না যে অনলাইন রিভিউ মানেই ফেক আর অবিশ্বাসযোগ্য, তবে এটা বলবো, যেটা পড়ছেন, পড়ার পরে আপনার কমন সেন্স ব্যবহার করুন, নিজেকে প্রশ্ন করুন তারপরে বিশ্বাস করতে পারেন! ঐযে একটা কথা আছে না, বিশ্বাস করো কিন্তু যাচায় করার পরে, আমি ঠিক এটাই সাজেস্ট করবো!


WiREBD এখন ইউটিউবে, নিয়মিত টেক/বিজ্ঞান/লাইফ স্টাইল বিষয়ক ভিডিও গুলো পেতে WiREBD ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুণ! জাস্ট, youtube.com/wirebd — এই লিংকে চলে যান এবং সাবস্ক্রাইব বাটনটি হিট করুণ!

Image: Shutterstock.com

তাহমিদ বোরহান
প্রযুক্তির জটিল টার্মগুলো কি আপনাকে বিভ্রান্ত করছে? কিছুতেই কি আপনার মস্তিষ্কে পাল্লা পড়ছে না? তাহলে বন্ধু, আপনি এবার সঠিক জায়গায় এসেছেন—কেনোনা এখানে আমি প্রযুক্তির সকল জটিল বিষয় গুলো ভাঙ্গিয়ে সহজ পানির মতো উপস্থাপন করার চেষ্টা করি, যাতে সকলে সহজেই সকল টেক টার্ম গুলো বুঝতে পারে।