এভাবে আপনি নিজেই নিজের ল্যাপটপ ধ্বংস করছেন!

এই দুনিয়ার কোন কিছুই চিরস্থায়ী নয়, আর ইলেকট্রনিক জিনিষের তো আরো বেশি করে ভরসা নেই। কিন্তু ঠিকঠাক মতো ইউজ করলে আপনার ল্যাপটপ আরো কয়েক বছর বেশি স্থায়ী হতে পারে। আপনার ল্যাপটপ যদি সময়ের আগেই নষ্ট হওয়ার সিগন্যাল দিতে শুরু করে তাহলে বুঝবেন, আপনার নিজের অজান্তেই কিছু সমস্যা রয়েছে। সঠিক অভ্যাস তৈরি করে ল্যাপটপ ইউজ করলে ল্যাপটপের আয়ু বাড়ানো সম্ভব হবে। নিচে এমনই কিছু কারণ দিয়ে আজকের আর্টিকেল সাজিয়েছি, যেগুলো করার মাধ্যমে আপনি হয়তো নিজের অজান্তে নিজেই আপনার ল্যাপটপ ধ্বংস করছেন! তো জেনে নিন, আর এগুলো করা থেকে বিরত থাকুন!


ফ্ল্যাট সার্ফেসে ল্যাপটপ ইউজ না করা

অনেকেই কোলে নিয়ে ল্যাপটপ ইউজ করেন, অনেকেই রয়েছেন যারা বিছানার উপরে ল্যাপটপ ইউজ করেন। এতে ল্যাপটপের ব্যাটারি আয়ু এবং হার্ডওয়্যার আয়ু অনেক গুনে কমে যায়। ল্যাপটপ নরম কোন সার্ফেসে রাখলে এতে ঠিক মতো বায়ু সঞ্চালিত হতে পারে না, কুলিং ফ্যান গুলো ল্যাপটপের হার্ডওয়্যার ঠাণ্ডা করতে পারে না, কেনোনা ভেতরের গরম বাতাস গুলো বাইরে বের হতে পারে না ঠিক মতো।

এভাবে ল্যাপটপের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। ল্যাপটপ যতো গরম হবে প্রসেসর নিজেকে ততোবেশি স্লো করে দেবে ফলে পারফর্মেন্স কমে যাবে। সাথে গরম পরিবেশে ল্যাপটপ ব্যাটারির সম্পূর্ণ বারো বেজে যাবে। বেস্ট সলিউশন হচ্ছে সবসময় ফ্ল্যাট এবং শক্ত সার্ফেসে রেখে ল্যাপটপ ইউজ করা। এতে ল্যাপটপের নিচের দিকের বায়ু সঞ্চালনের রাস্তা গুলো ও ভাল কাজ করার সুবিধা পাবে।

ল্যাপটপের জন্য অনেক ডেডিকেটেড স্ট্যান্ড পাওয়া যায়, সেগুলোকে ল্যাপটপ ঠাণ্ডা রাখার জন্য কুলিং ফ্যান সিস্টেম থাকে, এতে ল্যাপটপ গরম হয় না। এরকম ল্যাপটপ স্ট্যান্ড বিভিন্য দামের মধ্যে পাওয়া যায় বাজারে, ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে নানান দামের ল্যাপটপ স্ট্যান্ড কিনতে পাবেন। আমি এই অবহেলা করার ফলে আপনার ল্যাপটপ ব্যাটারি যেখানে পূর্বে ৫-৬ ঘণ্টা ব্যাকআপ প্রদান করতো সেটা এখন ২০ মিনিট ব্যাকআপ দেয়!

ল্যাপটপের ব্যাটারি চার্জ সর্বদা ০% করে ফেলা

নতুন কেনার পরে ব্যাটারি অনেক ভালো ব্যাকআপ দেয়। নতুন ল্যাপটপ গুলোতে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত ব্যাটারি ব্যাকআপ দিতে পারে, আরো হাই এন্ড ল্যাপটপ গুলোতে আরো বেশি দেয়। যাইহোক, সময়ের সাথে সাথে আর বছর খানেক পরে সেটা এমনি কমে যাবে স্বাভাবিক। কিন্তু এর মানে এই নয় আপনি ল্যাপটপের ব্যাটারি ০% করার পরে তারপরে আবার চার্জে লাগাবেন।

একটি ব্যাটারি ঠিক কতোবার চার্জ ও ডিসচার্জ হতে পারে তার একটি লিমিট রয়েছে। আপনি যদি বারবার ০% পর্যন্ত ডিসচার্জ করে ফেলেন তারপরে আবার ১০০% পর্যন্ত চার্জ করেন আপনার ল্যাপটপ ব্যাটারির আয়ু ৫০% বার আরো দ্রুত কমে যাবে। তাছাড়া ল্যাপটপ ব্যাটারি সঠিক চার্জ করার পদ্ধতি নিয়ে আমাদের ডেডিকেটেড আর্টিকেল রয়েছে, যা এখানে চেক করতে পারেন।

ল্যাপটপ ঠিক মতো অন না হতেই ইউজ করতে শুরু করা

আপনার উইন্ডোজ ল্যাপটপ অন করলেন, পিসি আপনাকে ওয়েক্যাল ম্যাসেজ শো করলো, কিন্তু এর মানে এটা নয় পিসি ইনস্ট্যান্ট ইউজের জন্য রেডি হয়ে গেছে। কিছুটা সময় নিয়ে অপেক্ষা করা উচিৎ, অন্তত যতোক্ষণ মাউস পয়েন্টার থেকে বিজি আইকন সরে না যায়।

ল্যাপটপ অন হওয়ার সাথে সাথেই অনেক বড় কাজের চাপ চাপিয়ে দিলে ল্যাপটপ সেগুলোকে ঠিক মতো প্রসেস করতে পারবে না। কেনোনা সিস্টেম রান করতে প্রসেসরকে প্রথমেই অনেক কাজ করতে হচ্ছে এর মধ্যে নতুন টাস্ক প্রসেসর হ্যান্ডেল করতে নাও পরে, যদি এক্কেবারে সুপার হাই কনফিগ ল্যাপটপ হয় সে কথা আলাদা! এই ভুল করার মাধ্যমে ল্যাপটপ বা অপারেটিং সিস্টেম হ্যাং হয়ে যেতে পারে আর সাথে সফটওয়্যার বা অপারেটিং সিস্টেম নিজেই ক্র্যাশ করতে পারে।

চার্জে লাগিয়েই বেশিক্ষণ ল্যাপটপ ইউজ করলে ব্যাটারি খুলে নিন!

অনেকেই রয়েছেন, যারা ল্যাপটপ বাসাতেই বেশি ইউজ করেন, সেক্ষেত্রে চার্জার সর্বদা প্লাগ করা থাকে ল্যাপটপের সাথে। এতে ব্যাটারি আয়ু কমে যায়। হ্যাঁ, আপনার ল্যাপটপ ব্যাটারিতে ওভার চার্জ প্রোটেকশন রয়েছে, কিন্তু অনেক বেশি সময় ধরে চলা হিট থেকে আপনার ব্যাটারি ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে।

যদি ল্যাপটপ বাসায় চার্জে প্ল্যাগ করেই বেশি ইউজ করেন, সেক্ষেত্রে বলবো ব্যাটারি ৬০-৭০% চার্জ হওয়ার পরে খুলে রেখে দিন। খুলে রাখবেন কোথায় জানেন তো? বেস্ট জায়গা হচ্ছে ফ্রিজের মধ্যে রেখে দেওয়া। ডীপ ফ্রিজে নয় জাস্ট নর্মাল ফ্রিজে রেখে দিতে পারেন। রাখার পূর্বে অবশ্যই ভালো কোন পলিথিন দিয়ে ব্যাটারিটি প্রটেক্ট করে নিতে পারেন, এতে ফ্রিজের পানি থেকে ব্যাটারি দূরে থাকবে! এভাবে বহুদিন ল্যাপটপের ব্যাটারি ভালো রাখা যেতে পারে!

সঠিক প্ল্যাগ ইউজ না করা

আমাদের বাসায় নিশ্চয় একটি ইলেকট্রিক জিনিষ থাকেনা, এই জন্য সবাই হয়তো মাল্টিপ্ল্যাগ ইউজ করেন। কিন্তু সঠিক ম্যাল্টি প্লাগ ইউজ না করলে আপনার ল্যাপটপ বা কম্পিউটার সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। আমাদের দেশে পাওয়ার সার্জ প্রবলেম রয়েছে অনেক এতে অনেক সময় কারেন্ট ভোল্টেজ আপ-ডাউন করে আবার নানান সমস্যা তৈরি করে। সেক্ষেত্রে ল্যাপটপের বা পিসির ডাটা লস হয়ে যেতে পারে বা মাদারবোর্ড পুড়ে বাদাম ভাজায় পরিণত হতে পারে।

সবসময় সেই ম্যাল্টিপ্লাগ ইউজ করবেন যেটাতে ডেডিকেটেড সুইচ থাকবে। এতে কারেন্টের সমস্যা বা আপ ডাউন লক্ষ্য করতে পারলেই সুইচ অফ করে কানেক্টেড থাকা ডিভাইজ গুলো প্রটেক্ট করতে পারবেন। অনেক সময় বজ্রপাতের ফলেও ল্যাপটপ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। আপনার ম্যাল্টিপ্লাগে যদি ডেডিকেটেড সুইচ থাকে সেক্ষেত্রে সেটা অফ করে দিলেই বাড়ির মেইন লাইনের সাথে আপনার ল্যাপটপ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। ফলে বজ্রপাত আপনার লাইনে প্রবেশ করলেও ল্যাপটপ পর্যন্ত যেতে পারবে না।

অপারেটিং সিস্টেমকে যত্নে রাখুন

আপনার ল্যাপটপকে ঠিকঠাক রাখার জন্য যে কাজ গুলো গুরুত্বপূর্ণ সেগুলো একটি ভালো অভ্যাস তৈরি করুন। অপ্রয়জনিয় সফটওয়্যার ইন্সটল করা থেকে বিরত থাকুন। যদি সিস্টেমে অকাজের সফটওয়্যার ইন্সটল করা থাকে সেগুলোকে আনইন্সটল করে দিন। নিয়মিত রেজিস্ট্রি ক্লিন করুন, টেম্পোরারি ফাইল গুলো রিমুভ করুন, এসএসডিতে বেশি ডাটা রীড-রাইট করা থেকে বিরত থাকুন। ভালো অ্যান্টিভাইরাস এবং অ্যান্টিম্যালওয়্যার প্রোগ্রাম ইউজ করুন, সেগুলোকে নিয়মিত আপডেটেড রাখুন।

সাথে আপনার উইন্ডোজকে আপডেটেড রাখুন, ভুল করেও আপডেট বন্ধ করে রাখবেন না। যদি উইন্ডোজ ডিফেন্ডার ইউজ করেন সেক্ষেত্রে সেটাকে সব সময় আপডেটেড রাখুন। যদি সম্ভব হয় শুধু অরিজিনাল ড্রাইভার সফটওয়্যার ইউজ করুন। পিসির ড্রাইভার গুলোকে আপডেটেড রাখুন, ক্র্যাক বা প্যাচ করা সফটওয়্যার ইউজ করা থেকে বিরত থাকুন এবং নিয়মিত ভাইরাস ও ম্যালওয়্যার স্ক্যান করুন।

সরাসরি রোদে ল্যাপটপ ইউজ করবেন না

অনেক সময় ল্যাপটপ বাইরে ইউজ করার দরকার পরতে পারে, কিন্তু সেটাকে সরাসরি রোদে রেখে ইউজ করা উচিৎ নয়। এতে আপনার পিসি অনেক দ্রুত গরম হয়ে যাবে ফলে ব্যাটারি লাইফ কমে যাবে ও পারফর্মেন্স ডাউন হয়ে যাবে। এমন জায়গায় ল্যাপটপ রাখবেন না যেখানে অনেক ধুলো রয়েছে, এতে ল্যাপটপের বায়ু সঞ্চালনের পথে ধুলো ময়লা ল্যাপটপে প্রবেশ করতে পারে।

সরাসরি সূর্যের আলো ল্যাপটপের স্ক্রীনে লাগতে দেবেন না, এতে ল্যাপটপ স্ক্রীন নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সূর্যের আলোতে সরাসরি ল্যাপটপ স্ক্রীন এক্সপোজ করলে বেশির ভাগ সময়ই স্ক্রীনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। আর হ্যাঁ ল্যাপটপ স্ক্রীন মোছার সময়ে যেকোনো কাপড় বা টিস্যু পেপার ইউজ করবেন না। এতে ল্যাপটপের স্ক্রীনের উপরে দেওয়া কোটিং নষ্ট হয়ে যেতে পারে। শুধু বাইরে নয়, বাসার মধ্যেও এমন জানালার পাশে ল্যাপটপ রাখবেন না যেখানে রোদের তীব্রতা রয়েছে। ল্যাপটপ স্ক্রীন পরিষ্কার করার জন্য মাইক্রো ফাইবার কাপড় ইউজ করুন।

সস্তা চার্জার ইউজ করা থেকে দূরে থাকুন

হয়তো আপনার ল্যাপটপ চার্জার নষ্ট হয়ে গেছে এখন চিন্তা করছেন নতুন চার্জার না কিনে বন্ধুর পুরাতন চার্জার ইউজ করলেই তো হয়। এরকম করা থেকে বিরত থাকুন, বা বাজারে দিয়ে সস্তা চার্জার খোঁজা থেকে বিরত থাকুন, কনফিউশন থেকে দূরে থাকার জন্য ভালোমানের ও সম্ভব হলে অরিজিন্যাল চার্জার ইউজ করুন!

সস্তা চার্জার ইউজ করার ফলে আপনার ল্যাপটপের মাদারবোর্ড টোস্টে পরিণত হতে পারে, আর ব্যাটারির আয়ু তো কমবেই কমবে। তখন চার্জারের সামান্য টাকা বাঁচাতে গিয়ে বড় টাকার ডন্ডি লেগে যাবে!

অনেক সফটওয়্যার ইন্সটল আর আনইন্সটল করা

অনেকেই দেখি ইচ্ছা মতো সফটওয়্যার টেস্ট করার জন্য ইন্সটল করে তারপরে কাজে না লাগলে আনইন্সটল করে দেয়। এভাবে প্রতিদিন অনেক সফটওয়্যার ইন্সটল এবং আনইন্সটল চলতেই থাকে। আপনি হয়তো ভাবছেন আনইন্সটল করে দিলেই তো কাজ শেষ ঐ সফটওয়্যার তো থাকছে না।

কিন্তু সফটওয়্যার আনইন্সটল করার পরেও অনেক ফাইল কম্পিউটারে থেকেই যায়, এভাবে বেশি সফটওয়্যার ইন্সটল আর আনইন্সটল চলতে থাকার ফলে অনেক অকাজের ফাইলে জমা হয় সিস্টেমে, ফলে সিস্টেম স্লো হয়ে যেতে থাকে। তাছাড়া অকাজের ফাইল গুলো ডিস্কের নানান জায়গায় রাইট হয়ে থাকে ফলে ডিস্কে ফ্র্যাগমেন্টেশনের দেখা দেয়। এতে হার্ড ড্রাইভের পারফর্মেন্স স্লো হয়ে যায়, ডাটা করাপ্টেড হয়ে যেতে পারে এবং হার্ড ড্রাউভ নষ্ট ও হতে পারে।


ল্যাপটপ অফ থাকা অবস্থাতেও এ থেকে পেনড্রাইভ, মাউস, এক্সটার্নাল কীবোর্ড ইত্যাদি ডিভাইজ গুলো খুলে রাখা উচিৎ। যদি ল্যাপটপ নিয়ে বাইরে কোথাও বের হন সেক্ষেত্রে কমপ্লিট শাটডাউন করুন সিস্টেম, স্লিপ মোড বা হাইবারনাইট মোডে না রাখায় বেস্ট!

তো এই ছিল কিছু অভ্যাস যেগুলোকে ঠিক মতো না করলে আপনার ল্যাপটপের লাইফ টাইম অনেক কমে যাবে। এই লিস্টে আরো কিছু যুক্ত করতে চান? আমাদের নিচে কমেন্ট করে জানান!


WiREBD এখন ইউটিউবে, নিয়মিত টেক/বিজ্ঞান/লাইফ স্টাইল বিষয়ক ভিডিও গুলো পেতে WiREBD ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুণ! জাস্ট, youtube.com/wirebd — এই লিংকে চলে যান এবং সাবস্ক্রাইব বাটনটি হিট করুণ!

Image: Shutterstock

তাহমিদ বোরহান
প্রযুক্তির জটিল টার্মগুলো কি আপনাকে বিভ্রান্ত করছে? কিছুতেই কি আপনার মস্তিষ্কে পাল্লা পড়ছে না? তাহলে বন্ধু, আপনি এবার সঠিক জায়গায় এসেছেন—কেনোনা এখানে আমি প্রযুক্তির সকল জটিল বিষয় গুলো ভাঙ্গিয়ে সহজ পানির মতো উপস্থাপন করার চেষ্টা করি, যাতে সকলে সহজেই সকল টেক টার্ম গুলো বুঝতে পারে।