বর্তমান তারিখ:17 September, 2019

গুগল প্লে স্টোর ম্যালওয়্যার থেকে কতোটা নিরাপদ?

১০০% নিরাপদ তো নয়, কিন্তু সাইড লোডিং করার থেকে বেশি নিরাপদ!

গুগল প্লে স্টোর ম্যালওয়্যার থেকে কতোটা নিরাপদ?

অ্যান্ড্রয়েড সিকিউরিটি এক্সপার্টদের মতে, গুগল প্লে স্টোর থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করলে এবং কোন প্রকারের সাইড লোডিং বা তৃতীয়পক্ষ অ্যাপ স্টোর ইউজ না করলে আপনি ম্যালওয়্যার থেকে নিরাপদ থাকতে পারবেন, আপনার অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইজে ভাইরাস আক্রমণ করতে পারবে না! কিন্তু কিছু নিউজ রিপোর্ট তো অন্য কথায় বলে; ২০১৮ সালে ফর্বস ম্যাগাজিনে পাবলিশ হওয়া এই রিপোর্ট অনুসারে, প্লে স্টোরে এক রেসিং গেম মনে করে প্রায় ৫০০,০০০ ইউজার জাস্ট প্লে স্টোর থেকে ভাইরাস ডাউনলোড করেছিল!

কাহিনী কিন্তু এখানেই শেষ নয়, ইসরাইলি এক সিকিউরিটি ফার্ম যার নাম Check Point Software Technologies — ২০১৭ সালের দিকে প্লে স্টোরে লুকিয়ে থাকা এমন কিছু অ্যাপ খুঁজে পায় যেগুলো ইউজারদের ফোন থেকে প্রতারণাপূর্ণ টেক্সট ম্যাসেজ সেন্ড করছিলো। পরে অবশ্য প্লে স্টোর থেকে সেই ভাইরাস আক্রাত অ্যাপ গুলোকে সরিয়ে নেওয়া হয়, কিন্তু প্লে স্টোর থেকে এদের সরিয়ে ফেলার পূর্বেই ২ কোটিবার ডাউনলোড করা হয়ে গেছিলো অ্যাপ গুলো!

মাত্র ১ মাস আগের কথা, দ্যা নেক্সট ওয়েব এর এই রিপোর্ট এর হেডিং ছিল; “গুগল প্লে স্টোরে ২০৫টি ক্ষতিকর অ্যাপ খুঁজে পাওয়া গেছে যেগুলো অলরেডি ৩ কোটি + বার ডাউনলোড করেছে ইউজাররা” — এর মানে অ্যান্ড্রয়েডে প্লে প্রটেক্ট নামক ডেডিকেটেড ম্যালওয়্যার ডিটেকশন সিস্টেম থাকার পরেও প্লে স্টোরকে ম্যালওয়্যার ফ্রি করা অনেকটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গুগল প্লে স্টোর, বা অ্যান্ড্রয়েড মার্কেট হচ্ছে অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইজ গুলোতে অ্যাপ লোড করার অফিশিয়াল এবং সবচাইতে নিরাপদ ম্যাথড। এতে মিলিয়ন মিলিয়ন অ্যাপের কালেকশন রয়েছে সাথে প্ল্যাটফর্মটিকে ভাইরাস মুক্ত করার জন্য গুগল সর্বদা কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু দেখা যায় প্রত্যেক বছরই বড় বড় ম্যালওয়্যার আক্রমণের ঘটনা বের হয়ে আসে প্লে স্টোর থেকে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, গুগল প্লে স্টোর থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করা কতোটা নিরাপদ? সত্যিই শুধু প্লে স্টোর থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করার মাধ্যমে অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইজ ম্যালওয়্যার ফ্রি থাকতে পারে? চলুন, উত্তর খুঁজে বের করার চেষ্টা করি।


অ্যান্ড্রয়েড Vs ম্যালওয়্যার

উইন্ডোজ পিসির মতো কিন্তু অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমে নিজে থেকেই ম্যালওয়্যার প্রবেশ করতে পারে না। অ্যান্ড্রয়েড ঠিক তখনই আক্রান্ত হতে পারে, যদি আপনি নিজে থেকে ফোনে ম্যালিসিয়াস অ্যাপ ডাউনলোড করে ইন্সটল করে এবং অ্যাপটিকে তার কাজের পারমিশন গুলো অ্যালাউ করে দেন।

কিন্তু বর্তমানে সাইবার ক্রিমিনালরা আরো বেশি চালাক হয়ে গেছে, তারা কোনভাবে লেজিট দেখতে লাগা অ্যাপের সাথে ম্যালিসিয়াস কোড এম্বেড করে দেয় এবং অ্যাপটিকে প্লে স্টোরে আপলোড করে দেয় যাতে ইউজারগন বিনা দ্বিধায় সেটা ডাউনলোড করে আর পারমিশন গুলো অ্যালাউ করে দেয়। আপনি বুঝতেই পারবেন না, আপনার ডিভাইজে ম্যালওয়্যার রয়েছে, আপনি হয়তো সাধারণ ফটো এডিটর অ্যাপ ডাউনলোড করেছেন, কিন্তু সেটা আপনার ফোনকে স্লো করা থেকে শুরু করে আপনার পার্সোনাল তথ্য গুলো যেমন- পার্সোনাল ডাটা চুরি, ফোন নাম্বার চুরি, ইমেইল অ্যাড্রেস চুরি, আপনার জিপিএস লোকেশন ডাটা আক্সেস, ইত্যাদি নানান টাইপের ম্যালিসিয়াস কাজ কর্ম করাতে পারে। আপনার ফোনটি একবার ম্যালওয়্যার দ্বারা আক্রান্ত করানো গেলে আরো নতুন ম্যালওয়্যার ইন্সটল করানো যেতে পারে সাথে নতুন নতুন টাইপের অ্যাটাকের জন্য ফোন রেডি হয়ে যায়।

এখানে যদি অ্যাপলের অ্যাপ স্টোর নিয়ে কথা বলেন, সেক্ষেত্রে ম্যালওয়্যার এর কলঙ্কে গুগল প্লে স্টোর বেশি কলঙ্কিত! কিন্তু এমনটা কেন? ওয়েল, অ্যাপেলের সিস্টেম অনেক বেশি টাইট, ডেভেলপারদের অ্যাপ স্টোরে অ্যাপ আপলোড করতে চাইলে অ্যাপেলের অনেক রুলস, টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন্স মেনে কাজ করতে হয়। আপনি যদি একজন ডেভেলপার হন, সেক্ষেত্রে অনেক ব্যাপারে সহমত হওয়ার পরেই আপনার অ্যাপটি অ্যাপেল অ্যাপ স্টোরে পাবলিশ হবে।

কিন্তু অ্যান্ড্রয়েড এর সিস্টেমকে গুগল যতোটা সম্ভব ওপেন রাখার চেষ্টা করে। ফলে ডেভেলপাররা সহজেই (অ্যাপ স্টোরের তুলনায় অনেক সহজে) অ্যাপ গুলোকে প্লে স্টোরে আপলোড করার সুবিধা পায়। গুগল তাদের সিস্টেমকে যতোটা সম্ভব ওপেন করে রাখতেই হয়, কেনোনা ডেভেলপাররা তৃতীয়পক্ষ অ্যাপ স্টোরে অ্যাপ পাবলিশ করতে পারে বা সাইড লোডিং এর ও সিস্টেম রাখতে পারে, এতে গুগল, অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ গুলোর উপর থেকে আরো বেশি নিয়ন্ত্রণ হারয়ে ফেলবে। অনেকটা সহজেই অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ প্লে স্টোরে আপলোড করা যায়, ফলে অ্যাপেলের অ্যাপ স্টোরের চেয়ে প্লে স্টোরে ম্যালওয়্যার ছড়ানো অনেক সহজ হয়ে দাঁড়ায়!

গুগল কিভাবে ম্যালওয়্যারের সাথে লড়ায় করে?

গুগল তাদের প্লে স্টোরকে ম্যালওয়্যার থেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য ২০১২ সালে বাউন্সার নামক একটি অ্যান্ড্রয়েড সিকিউরিটি ফিচার লঞ্চ করে। বাউন্সার গুগল প্লে স্টোরে ম্যালিসিয়াস অ্যাপ খুঁজে বের করে এবং ইউজারগন সেটাকে ডাউনলোড করার পূর্বেই প্লে স্টোর থেকে সরিয়ে ফেলে। কিন্তু যে বছর বাউন্সার লঞ্চ হয়েছিলো, অ্যাপ স্টোরে ম্যালওয়্যার ইনফেকশন কেবল ৪০% কমানো সম্ভব হয়েছিলো।

গুগল পরে একটি বিল্ডইন সিকিউরিটি ফিচার অ্যাড করে “প্লে প্রটেক্ট” — কিন্তু বাউন্সারের তুলনায় এতেও বিশেষ করে উন্নতি দেখা যায়নি ম্যালওয়্যার ডিটেক্ট করার ক্ষেত্রে। আলাদা অ্যান্টিম্যালওয়্যার সফটওয়্যার গুলোর সাথে তুলনা করে দেখা যায় গুগল প্লে প্রটেক্ট এর স্কোর সবচাইতে পেছনে আসে। এরপরে ২০১৬ সালের দিকে গুগল মানুষ দ্বারা ম্যানুয়ালভাবে অ্যাপ রিভিউ প্রসেস চালু করে। কিন্তু সাইবার ক্রিমিনালরা দিনের পর নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে আসে আর নতুন নতুন ভাবে ম্যালিসিয়াস অ্যাপ গুলোকে সবার নজর এড়িয়ে প্লে স্টোরে আপলোড করে দেয়!

তো, শুধু প্লে স্টোর ব্যবহার করলেই হবে না, আরো জিনিষ মাথায় রাখতে হবে!

তো নিশ্চয় এতক্ষণে বুঝে গেছেন, গুগল প্লে স্টোর ও ১০০% নিরাপদ নয়, মানে প্লে স্টোর থেকে যেকোনো অ্যাপ ডাউনলোড করবেন আর কিছুই হবে না, এমনটা নয়। নিচে কিছু পয়েন্ট উল্লেখ্য করলাম যেগুলো অনুসরণ করলে মোটামুটি বেশি নিরাপদ থাকতে পারবেন।

  • প্লে স্টোরে কেবল নামী পাবলিশারদের থেকেই অ্যাপ ডাউনলোড করুন, ডাউনলোড করার পূর্বে অবশ্যই লক্ষ্য করে দেখুন কোন ডেভেলপারের অ্যাপ ডাউনলোড করছেন। আপনার ব্যাংকের অ্যাপ হলে চেক করুন, সেটার পাবলিশার আপনার ব্যাংক নিজেই না অন্য কেউ! গুগল প্লে স্টোর ১০০% নিরাপদ নয়, কিন্তু আন-অফিসিয়াল ভাবে অ্যাপ ডাউনলোড করা বা সাইড লোডিং করার থেকে এটা এখনো বেশি নিরাপদ!
  • যেকোনো নতুন অ্যাপ ডাউনলোড করার পূর্বে অবশ্যই একটু সময় নিয়ে এর রিভিউ গুলো পড়ে ফেলবেন। আসল ইউজার’রা কি মন্তব্য করেছে, অ্যাপটি সত্যিই কতোটা কাজের বা এতে কি টাইপের সমস্যা রয়েছে সেগুলো ইউজার রিভিউ থেকে ধারণা পেতে পারবেন।
  • যদি বেশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চান সেক্ষেত্রে ভালো অ্যান্টিভাইরাস যেমন- মোবাইল সিকিউরিটি, এভিজি, বা নরটন ইত্যাদি ইউজ করতে পারেন। অনেক ফোনের সাথে এগুলো বিল্ডইন ভাবেই ইন্সটল করা থাকে।
  • আর হ্যাঁ, নিরাপদ থাকতে চাইলে আপনার ফোনটি রুট করবেন না!

দেখুন, আপনি গুগল প্লে স্টোর থেকে ম্যালওয়্যার ডাউনলোড করে ফেললেও সরাসরি বলতে পারবেন না, কেনোনা এতো সহজে বোঝার কোন উপায় নেই, যদি সিকিউরিটি সিস্টেম ডিটেক্ট না করতে পারে। আপনি ডিটেক্ট করতে যতো দেরি করবেন সাইবার ক্রিমিনালদের ততোই মজা। কোন অ্যাপ ইন্সটল করার পরে আপনার ডিভাইজটি যদি আগের থেকে স্লো হয়ে যায় সেক্ষেত্রে ভাইরাস অ্যাট্যাক করতে পারে বা এমনও হতে পারে আপনার ফোনের স্টোরেজ লো হয়ে গেছে। যদি আপনার ফোন হঠাৎ করে নানান অ্যাডস আর পপআপে ভর্তি হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে হতে পারে আপনার ফোনটি ভাইরাসের কবলে পরেছে!



WiREBD এখন ইউটিউবে, নিয়মিত টেক/বিজ্ঞান/লাইফ স্টাইল বিষয়ক ভিডিও গুলো পেতে WiREBD ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুণ! জাস্ট, youtube.com/wirebd — এই লিংকে চলে যান এবং সাবস্ক্রাইব বাটনটি হিট করুণ!

Image: Shuttestock.com

প্রযুক্তির জটিল টার্মগুলো কি আপনাকে বিভ্রান্ত করছে? কিছুতেই কি আপনার মস্তিষ্কে পাল্লা পড়ছে না? তাহলে বন্ধু, আপনি এবার সঠিক জায়গায় এসেছেন—কেনোনা এখানে আমি প্রযুক্তির সকল জটিল বিষয় গুলো ভাঙ্গিয়ে সহজ পানির মতো উপস্থাপন করার চেষ্টা করি, যাতে সকলে সহজেই সকল টেক টার্ম গুলো বুঝতে পারে।

3 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *