বিজ্ঞানমহাকাশ

সৌরজগৎ সম্পর্কে ৭টি অত্যাশ্চর্যকর ফ্যাক্টস! — যেগুলো হয়তো আপনি জানতেন না!

4

যেখানে আমরা আজ দূরের গ্যালাক্সি গুলো এক্সপ্লোর করতে ব্যাস্ত বা আলাদা নক্ষত্রের প্ল্যানেট গুলো খুঁজে বের করতে ব্যস্ত — সেখানে আমাদের নিজেদের সৌরজগতের অনেক অত্যাশ্চর্যকর আর আনইউজুয়াল ব্যাপার রয়েছে, যেগুলো আমরা জানি না! স্কুলের সাধারণ বিজ্ঞানের বইয়ে ছাপানো আমাদের সোলার সিস্টেমের ইলাস্ট্রেশন দেখেই এক সময় কতোই না অবাক হতাম, আসলে আমাদের সোলার সিস্টেম তার থেকেও বেশি কুল আর অত্যাশ্চর্যকর!

এই আর্টিকেলে সৌরজগৎ সম্পর্কে ৭টি অত্যাশ্চর্যকর ফ্যাক্টস তুলে ধরেছি, যেগুলো হয়তো আপনি জানতেন না!

সবচাইতে বেশি গরম প্ল্যানেট কিন্তু সূর্যের সবচাইতে কাছে নয়

সূর্যের সবচাইতে কাছে যে প্ল্যানেট থাকবে, সেটারই তাপমাত্রা সবচাইতে বেশি হবে, তাই না? মানে এটাই তো হওয়া উচিৎ? আমরা প্রায় সবাই জানি, বুধ (মার্কিউরী) হচ্ছে সূর্যের সবচাইতে নিকটতম প্ল্যানেট, যেটা সূর্য থেকে কেবল ~৫৮ মিলিয়ন কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। যেখানে পৃথিবী ~১৫০ মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সূর্য থেকে দূরত্বের দিক দিয়ে দ্বিতীয় প্ল্যানেট’টি হচ্ছে শুক্র (ভেনাস), যেটার সূর্য থেকে গড় দূরত্ব ~১০৮ মিলিয়ন কিলোমিটার! — এর মানে সূর্য থেকে বুধ যতোদূরে অবস্থিত তার চেয়েও আরো ~৫০ মিলিয়ন দূরে অবস্থিত হচ্ছে এই শুক্র গ্রহ!

চিত্রঃ শুক্রের সার্ফেস থেকে গলিত লাভা বের হচ্ছে, ৩ডি চিত্রণ! (ক্রেডিটঃ Shutterstock)

তাহলে হিসেবে শুক্র, বুধ থেকে তাপমাত্রায় ঠাণ্ডা, রাইট? — আপনি সম্পূর্ণই ভুল! বুধের কোন বায়ু মণ্ডল নেই, মানে সূর্য থেকে আসা তাপমাত্রা ধরে রাখার জন্য এই গ্রহের কোন চাদর নেই। অপরদিকে শুক্রের বায়ুমণ্ডল এতোই বেশি ঘন যে, কি আর বলবো! শুক্রের বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের তুলনায় প্রায় ১০০ গুন বেশি ঘন। এর মানে সূর্য থেকে আসা তাপমাত্রা কেবল শুক্রে জমায় হতে পারে, কিন্তু স্পেসে পালানোর কোন বুদ্ধি নেই। ফলে এই প্ল্যানেটের প্রত্যেকটি অংশে একই তাপমাত্রা বিরাজমান।

একে তো চরম ঘনত্বের বায়ুমণ্ডল, অপরদিকে প্ল্যানেট’টি কার্বন ডাইঅক্সাইডে পরিপূর্ণ, যেটা মারাত্মক শক্তিশালী গ্রিনহাউজ গ্যাস। কার্বন ডাইঅক্সাইড আরামে সোলার এনার্জি গ্রহে প্রবেশ করতে দেয়, কিন্তু আর বেরতে দেয় না, ফলে গ্রহে মারাত্মক তাপমাত্রা বেড়ে যায়। শুক্রের এভারেজ তাপমাত্রা ~৪৬৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস। এরমানে শুক্রের সার্ফেস তাপমাত্রায় আরামে টিন আর সীসা গলে যেতে যথেষ্ট।

অপরদিকে বুধের সর্বাধিক তাপমাত্রা ~৪২৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস, যেহেতু বুধের কোন বায়ুমণ্ডল নেই, তাই এই তাপমাত্রা বুধের বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন রকমের। যেখানে শুক্রের কার্বন ডাই অক্সাইড সমস্ত গ্রহেই স্ট্যাবল তাপমাত্রা রেখে দিয়েছে।

প্লুটোর ব্যাস অ্যামেরিকা থেকেও ছোট

ভালো করেই জানেন, প্লুটো আর আমাদের সৌরজগতের প্ল্যানেট মেম্বারশিপের মধ্যে জড়িত নেই, একে ২০০৬ সালে সূর্য প্রধান প্ল্যানেটের খাতা থেকে বাদ দিয়ে ক্ষুদ্র প্ল্যানেট হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কেন? — ওয়েল এর অনেক গুলো কারণ রয়েছে তবে আসল কারণটি হচ্ছে, এটা আঁকারে অনেক ছোট।

ইউনাইটেড স্টেট অফ অ্যামেরিকা (U.S.A) উত্তর ক্যালিফোর্নিয়া (Northern California) থেকে মেইন (Maine) পর্যন্ত ~৪,৭০০ কিলোমিটার। যেখানে ২০১৫ সালে নিউ হরাইজন স্পেসক্র্যাফট থেকে জানা যায় প্লুটোর ব্যাসরেখা কেবল ~২,৩৭১ কিলোমিটার, মানে অ্যামেরিকা থেকেও অর্ধেক!

শুধু লাভা নয়, পানি দ্বারাও আগ্নেয়গিরি চলতে পারে!

আগ্নেয়গিরির কথা বলতেই মনে পরে হেলেন্স পর্বত, ভিসুভিয়াস পর্বত, অথবা হাওয়াই এর পর্বত গুলোর কথা, রাইট? সাথে আগ্নেয়গিরি বলতেই আমরা পরিচিত লাভা বা ম্যাগমার সাথে, মানে ভূগর্ভে গলিত পাথর, যেগুলো পর্বতের চুড়ার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে। পৃথিবীর আগ্নেয়গিরি গুলোর লাভাতে থাকে সিলিকন, লোহা, ম্যাগনেসিয়াম, এবং আরো জটিল সকল গলিত পদার্থ। আর আগ্নেয়গিরি বলতে আমরা লাভা বা ম্যাগমা বের হবে এটাই বুঝি, রাইট? — আসলে আপনি অনেক অংশেই ভুল!

শুধু লাভা নয়, পানি দ্বারাও আগ্নেয়গিরি চলতে পারে!

চিত্রঃ Enceladus এর পানীয় আগ্নেয়গিরি (ক্রেডিটঃ NASA/JPL)

বৃহস্পতির চাঁদ আইও (IO) এর আগ্নেয়গিরি থেকে সালফার এবং সালফার ডাইঅক্সাইড নির্গত হয়। কিন্তু এটা আরো সাধারণ হতে পারে, যেমন- শনির চাঁদ এনসেলাডাস (Enceladus) এর আগ্নেয়গিরি থেকে পানি নির্গত হয়। হ্যাঁ, আমাদের সেই চিরচেনা বলতে পারেন পৃথিবীতে প্রানের প্রধান উৎস H20; বরফে পরিণত থাকা H20 ভূগর্ভের চাপে বা কোন গ্যাসীয় ইফেক্টের কারণে এনসেলাডাসের আগ্নেয়গিরি মুখ থেকে বেরিয়ে আসে, আর বহু উঁচু পর্যন্ত ছুড়ে মারে!

তো শুধু লাভা বা ম্যাগমা নয়, পানি দ্বারাও আগ্নেয়গিরি চলতে পারে! আর এটা নিশ্চয় অনেকেই জানতেন না!

পৃথিবীতে মঙ্গলের পাথর খুঁজে পাওয়া গেছে!

এন্টার্কটিকা, শাহারা মরুভূমি, ও নানান জায়গায় খুঁজে পাওয়া উল্কাপিণ্ডের রাসায়নিক বিশ্লেষণ থেকে জানা গেছে সেগুলো আসলে মঙ্গল গ্রহের পাথর। অনেক উল্কার সাথে এমন গ্যাসের ট্রেস পাওয়া গেছে যেগুলো কেবল মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে দেখতে পাওয়া যায়। হতে পারে মঙ্গলে কোন বিশাল গ্রহাণু আঘাত হেনেছে ফলে সেখান থেকে পাথর ছিরে ছিটকে পৃথিবীর দিকে চলে এসেছে।

তো টেকনিক্যালভাবে আমাদের পৃথিবীতে মঙ্গলের পাথর অবস্থান করছে, কিন্তু আমাদের বর্তমান টেকনোলোজির সাহায্যে ঘরের জিনিষ ঘরে পাঠিয়ে দেওয়ার মতো ক্ষমতা আমাদের হয়ে উঠেনি! আমাকে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না, এই ফ্যাক্টটি কতোটা মজার ছিল!

সবচাইতে বড় সমুদ্র বৃহস্পতিতে অবস্থিত!

সৌরজগতের সবচাইতে বৃহৎ প্ল্যানেট হচ্ছে এই জুপিটার বা বৃহস্পতি। তবে এতে পৃথিবী বা মঙ্গলের মতো কোন পাথুরে সার্ফেস নেই, আপনি বৃহস্পতিতে ল্যান্ড করতে পারবেন না। কেননা এটা সম্পূর্ণই গ্যাসের তৈরি, যদিও বিজ্ঞানীদের অংক হিসেবে এই প্ল্যানেটের কোর মেটালিক হাইড্রোজেনে তৈরি।

যাইহোক, জুপিটার বেশিরভাগই হাইড্রোজেন এবং হিলিয়ামের তৈরি। যদি জুপিটারের ভর এবং এর তৈরি হওয়ার রাসায়নিক রচনার দিকে বিশেষ লক্ষ্য করা হয়, সেক্ষেত্রে পদার্থ বিজ্ঞান অনুসারে জুপিটারের মেঘের যতো নিচে নামা হবে এর প্রেসার ততোই বেশি বৃদ্ধি পাবে। এক সময় প্রেসার এতোটা বেড়ে যাবে, হাইড্রোজেন সেখানে আর গ্যাসীয় রুপে থাকা সম্ভব হবে না, অবশ্যই তরলে পরিণত হতে হবে।

এর মানে এই সম্পূর্ণ গ্রহ জুড়ে তরল হাইড্রোজেনের একটি দৈত্যাকার সমুদ্র রয়েছে, যেটা নিঃসন্দেহে সৌরজগতের যেকোনো প্ল্যানেটে থাকা সমুদ্র থেকে বিশাল। কম্পিউটার মডেল অনুসারে, শুধু যে এটা বিশাল সমুদ্রই তা নয়, এর গভীরতা প্রায় ৪০,০০০ কিলোমিটার মানে যেটা পৃথিবীর প্রায় মোট গভীরতার সমান।

আমরা আসলে সূর্যের ভেতরেই বাস করছি!

আমি ২০০% গারেন্টি দিয়ে বলতে পারি, আপনি এই ফ্যাক্ট আগে জানতেনই না! আমরা সাধারণত মনে করি সূর্য আমাদের থেকে ~১৫০ মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, কিন্তু আসলে সূর্যের সার্ফেস থেকে এর বহি:স্থ বায়ুমণ্ডল আরো অনেক কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত।

চিত্রঃ Heliosphere

আমাদের প্ল্যানেট পৃথিবী আসলে সূর্যের পাতলা বায়ুমণ্ডলের মধ্যে ঘুরনিয়মান, এর প্রমান সরূপ আমাদের পৃথিবীর উত্তরাঞ্চলীয় এবং দক্ষিণী মেরুর দিকে সোলার উইন্ড থেকে এক বিশেষ আলোক সৃষ্টি করে, যেটাকে আর‍্যোরা বলা হয়!

তবে পৃথিবী পর্যন্তই কিন্তু এই সূর্যের বায়ুমণ্ডলের সমাপ্তি নয়, আর‍্যোরা গুলোকে জুপিটার, স্যাটার্ন, ইউরেনাস, এমনকি নেপচুপে পর্যন্ত দেখতে পাওয়া গেছে। এমনকি এই সূর্যের বহি:স্থ বায়ুমণ্ডল যেটাকে হিলিওস্ফেয়ার বলা হয়, সেটা মোটামুটি ১০০ অ্যাস্ট্রনোমিক্যাল ইউনিট (পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্বকে ১ অ্যাস্ট্রনোমিক্যাল ইউনিট ধরা হয়) পর্যন্ত বিস্তৃত! যেটা মোটামুটি ১৬ বিলিয়ন কিলোমিটারের সমান।

ক্ষুদ্র অবজেক্টেরও চাঁদ থাকতে পারে!

আমরা সাধারণত কি মনে করে থাকি? শুধু প্ল্যানেট গুলোই চাঁদ থাকতে পারে, তাই না? যদিও বুধ আর শুক্রের কোন চাঁদ নেই, সাথে মঙ্গলের অতি ছোট সাইজের চাঁদ রয়েছে। কিন্তু অনেক অনেক ছোট বিশেষ করে মাত্র কয়েক মাইল সাইজ অবজেক্টের ও চাঁদ থাকতে পারে, যেটা আমাদের ধারণার বাইরে ছিল।

আগে তো প্ল্যানেট কি, এর সংজ্ঞা হিসেবে ব্যবহার করা হতো, একটি বড় অবজেক্ট যেটার অনেক শক্তিশালী গ্রাভিটি রয়েছে ফলে চাঁদকে নিজের গ্রাভিটিতে বেধে রাখতে পারে একেই প্ল্যানেট বলা হয়। কিন্তু ১৯৯৩ সালে গ্যালেলিও স্পেস প্রোব আবিস্কার করে, মাত্র ২০ মাইল সাইজের একটি গ্রহাণুকে কেন্দ্র করে ১ মাইল খানেক সাইজের আরেকটি গ্রহাণু (টেকনিক্যালভাবে চাঁদ) ঘুরছে!

আরো জানতে চান?চাঁদের কেন চাঁদ থাকে না?

তো এই ছিল আমাদের সোলার সিস্টেম নিয়ে ৭টি অত্যাশ্চর্যকর, আনইউজুয়াল, অবিশ্বাস্য ফ্যাক্টস, যেগুলো হয়তো আপনি জানতেন না! আরো প্রশ্ন মনের মধ্যে উঁকি মারছে? আমাকে নিচে কমেন্ট করে জানাতে পারেন!


Feature Image: By sdecoret/shutterstock

তাহমিদ বোরহান
প্রযুক্তির জটিল টার্মগুলো কি আপনাকে বিভ্রান্ত করছে? কিছুতেই কি আপনার মস্তিষ্কে পাল্লা পড়ছে না? তাহলে বন্ধু, আপনি এবার সঠিক জায়গায় এসেছেন—কেনোনা এখানে আমি প্রযুক্তির সকল জটিল বিষয় গুলো ভাঙ্গিয়ে সহজ পানির মতো উপস্থাপন করার চেষ্টা করি, যাতে সকলে সহজেই সকল টেক টার্ম গুলো বুঝতে পারে।

ডিজিটাল ওসেন টিউটোরিয়াল [পর্ব-৪] : ওয়ার্ডপ্রেস ড্রপলেটে ফ্রি এসএসএল সার্টিফিকেট সেটআপ!

Previous article

৪টি ভয়াবহ ও সবচাইতে ধ্বংসাত্মক টাইপের ম্যালওয়্যার!

Next article

You may also like

4 Comments

  1. Jene osadhron laglo je amra sun err moddhe ee bass kori. wow! nice facts..

  2. ভাই আপনার বিজ্ঞান বিষয়ক রচনা গুলো অসাধু। খুব বেশি উপভোগ যোগ্য। আপনি যেভাবে ফুটিয়ে তোলেন অনেক উপভোগ করি। আমাদের স্কুল কলেজের স্যাররা যদি এভাবে এক্সপ্লেইন করতো কতই না ভালো হত ছাত্রদের জন্য।

  3. 😍😍😍😍😍

  4. Facts gula awesome chilo vaiya. thank you so much.

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *