গ্যাজেটল্যাপটপ

এক নজরে CES 2019 : নতুন সব ডিভাইস অ্যানাউন্সমেন্টস!

0

CES (Consumer Electronic Showdown), পৃথিবীর সবথেকে বড় টেক ইভেন্ট প্রত্যেক বছরের মতো এবছরও অনুষ্ঠিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নেভাডা স্টেটের লাস ভেগাস শহরে। এবছরের CES 2019 ইভেন্টটি ছিলো গত বছরের তুলনায় আরও বেশি ইন্টারেস্টিং এবং জাঁকজমকপূর্ণ। প্রত্যেকবছর CES ইভেন্টে বড় থেকে ছোট কোম্পানি এবং নাম না জানা অনেক টেক কোম্পানিগুলোো বিভিন্ন ধরনের ইন্টারেস্টিং এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফিউচারিস্টিক ডিভাইস শো অফ করে থাকে।

তারা কি ধরনের ডিভাইস তৈরি করতে পেরেছে এবং ভবিষ্যতে কি নিয়ে কাজ করতে চলেছে সেটা সাধারন কনজিউমারদের কাছে তুলে ধরার জন্য মুলত এই টেক শোডাউন ইভেন্টটির আয়োজন করা হয়ে থাকে প্রত্যেক বছর। যাইহোক, আজকের আর্টিকেলে আলোচনা করতে চলেছি এবছর CES 2019 ইভেন্টে শো অফ করা সবথেকে ইন্টারেস্টিং ইলেকট্রনিক এবং ডিভাইসগুলো নিয়ে।

নতুন টিভি

প্রত্যেক বছরই CES ইভেন্টে বিভিন্ন টেক কোম্পানি বিভিন্ন ধরনের ইউনিক এবং হাই টেক টিভি অ্যানাউন্স করে থাকে। কোনটি হয় বিশাল বড়, কোনটি খুবই চিকন, ৪কে থেকে ৮কে রেজুলেশনের অনেক রকম ইনসেন টেকনোলজির টিভি দেখতে পাওয়া যায় প্রত্যেক বছর CES এ।

এলজি রোলেবল টিভি

Image Credit : The Verge

এবছর এলজি তাদের একটি নতুন টিভি শো অফ করেছে, যা টেলিভিশনপ্রেমীদের জন্য প্রায় স্বপ্নের মতো। এটির নাম দেওয়া হয়েছে LG Signature OLED TV। নাম শুনেই বুঝেছেন যে এটি একটি অ্যামোলেড টিভি। এটি একটি 4K রেজুলেশনের ৬৫ ইঞ্চি টিভি।

শুধু তাই নয়, এটি একটি রোলেবল টিভি। টিভিটি একটি বাটন ক্লিক করেই কাগজের মতো রোল করা যাবে। আর এর সুবাদে টিভিটি যেকোনো অ্যাসপেক্ট রেশিওতে রোল করে দেখা সম্ভব হবে। যেসব মুভি দেখার সময় অ্যাসপেক্ট রেশিওর কারনে ওপরে-নিচে ব্ল্যাক বার দেখা যায়, সেসব সমস্যা সহজেই ফিক্স করা যাবে নিজের ইচ্ছামত অ্যাসপেক্ট রেশিওতে সম্পূর্ণ টিভিটি রোল করে। চলটি বছরের মার্চ মাসে এলজি এই টিভিটি মার্কেটে এভেইলেবল করবে সেল করার জন্য এবং নিশ্চিতভাবে হাস্যকর রকমের এক্সপেনসিভ একটি টিভি হবে এটি।

স্যামসাং মডিউলার টিভি

টিভি-গেমে পিছিয়ে থাকেনি স্যামসাংও। এবছর CES এ স্যামসাং শো অফ করেছে তাদের তৈরি কিছু অসাধারন টিভি। স্যামসাং কয়েকটি হাই এন্ড মাইক্রো এলইডি টিভি অ্যানাউন্স করেছে। এই মাইক্রো এলইডি টিভিগুলো একেকটি বিশাল সাইজের ফ্ল্যাট টিভি, যেগুলো পিকচার কোয়ালিটি ওয়ান অফ দ্যা বেস্ট। এই টিভিগুলোর একটি ৭৫ ইঞ্চি এবং একটির সাইজ ২১৯ ইঞ্চি।

এই টিভিগুলো শুধুমাত্র বিশাল এবং ভালো পিকচার কোয়ালিটিরই নয়। এই টিভিগুলোর প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে, এগুলো মডিউলার টিভি। আপনি চাইলে এই টিভিগুলোকে নিজের ইচ্ছামত ছোট করতে পারবেন, বড় করতে পারবেন, অস্বাভাবিক অ্যাসপেক্ট রেশিওতে কনভার্ট করে নিতে পারবেন। আপনি চাইলে হোরিজন্টাল এবং ভারটিক্যাল,দুইভাবেই এসব টিভিতে কন্টেন্ট উপভোগ করতে পারবেন।

এছাড়া ইভেন্টে Sony ও অ্যানাউন্স করেছে তাদের নতুন কিছু 8K টিভি যেগুলো স্যামসাং এবং এলজির টিভির মতো এমন ইউনিক এবং ফিউচারিস্টিক না হলেও যথেষ্ট ভালো এবং অ্যামেজিং পিকচার কোয়ালিটি দেখাতে সক্ষম। এই টিভিগুলো ন্যাটিভ 8K রেজুলেশনে ভিডিও প্লেব্যাক করতে পারে এবং Non-8K ভিডিওগুলোকেও আপস্কেল করে 8K রেজুলেশনে প্লে করতে পারে। কারন, বর্তমানে ইন্টারনেটে বা অন্য কোথাও খুব বেশি 8K কন্টেন্ট নেই।

নতুন পাওয়ারফুল ল্যাপটপ

প্রত্যেকবছরই CES ইভেন্টে জনপ্রিয় ল্যাপটপ ম্যানুফ্যাকচারাররা তাদের নতুন নতুন ল্যাপটপ শো অফ করে। ভারী পাওয়ারফুল গেমিং ল্যাপটপ থেকে শুরু করে থিন অ্যান্ড লাইট কনভার্টেবল ল্যাপটপ পর্যন্ত অনেক ধরনের নতুন ইন্টারেস্টিং ল্যাপটপের দেখা পাওয়া যায় প্রতি বছর এই ইভেন্টে। এবছরও এর কোন ব্যাতিক্রম হয়নি। এবছর সবথেকে ইন্টারেস্টিং ল্যাপটপগুলো শো অফ করেছে Asus এবং AlienWare।

Asus Rog Mothership Laptop

নাম শুনেই বুঝতে পারছেন, এটি অ্যাসুসের ROG সিরিজের আরেকটি গেমিং ল্যাপটপ। অ্যাসুসের ROG সিরিজের এখনকার ল্যাপটপগুলোর মতোই ওভারকিলড একটি গেমিং ল্যাপটপ এটি। এটি অন্যান্য ROG সিরিজের ভারী পাওয়ারফুল গেমিং ল্যাপটপগুলোর মতো হলেও কিছুটা ইউনিক কনসেপ্টের। এটি সারফেস ডিভাইসগুলোর মতো ডিট্যাচেবল কি-বোর্ডের একটি ডিভাইস। এই ধরনের ডিট্যাচেবল পাওয়ারফুল গেমিং ল্যাপটপ সাধারনত মার্কেটে সচারচর দেখা যায়না। তবে ডিট্যাচেবল হলেও এই ল্যাপটপটি অত্যন্ত পাওয়ারফুল।

১৭ ইঞ্চির ১২৪ হার্জ রিফ্রেশ রেটের ডিসপ্লে, কোর আই ৯ প্রোসেসর, ৬৪ গিগাবাইট র‍্যাম, RTX 2080 জিপিইউ, আর কি চাই? মার্কেটে এর থেকে বেশি পাওয়ারফুল গেমিং ল্যাপটপ খুব কম আছে। তবে হ্যা, মার্কেটে সাধারন কনজিউমারদের এবং গেমারদের জন্য এভেইলেবল হলে, ধারনা করবেন না যে এর প্রাইস রিজনেবল হবে। অত্যন্ত পাওয়ারফুল এবং  একইসাথে অত্যন্ত এক্সপেনসিভ একটি গেমিং ল্যাপটপ হতে চলেছে এটি।

AlienWare Area-51m

এটি Dell এর তৈরি আরেকটি অসাধারন হাই এন্ড গেমিং ল্যাপটপ। এই ল্যাপটপটিতে ব্যাবহার করা হয়েছে ১৪৪ হার্জ রিফ্রেশ রেটের ডিসপ্লে। তাছাড়া কোরআই ৯ প্রোসেসর এবং অ্যাসুস মাদারশিপ ল্যাপটপটির মতো অন্যান্য হাই এন্ড কম্পোনেন্টসও আছে। তবে জিপিইউ হিসেবে আছে লাস্ট জেনারেশন GTX 1080।

তবে এই ল্যাপটপটির সবথেকে ইম্প্রেসিভ ব্যাপারটি হচ্ছে, এটি একটি মডিউলার ল্যাপটপ। আপনি এই ল্যাপটপটির প্রায় সব ধরনের কম্পোনেন্টস রিপ্লেস করতে পারবেন। হার্ড ড্রাইভ, এসএসডি, র‍্যাম, জিপিইউ, প্রোসেসর ইত্যাদি সবকিছুই আপনি রিপ্লেস করতে পারবেন। তাই এই সুবিধাটির কথা চিন্তা করলে এই ল্যাপটপটিকে পৃথিবীর অন্যতম পাওয়ারফুল একটি ল্যাপটপ হিসেবে দাবী করা যায়।

অন্যান্য ল্যাপটপ

Image Credit : Engadget

এছাড়াও আরও অনেক ধরনের ল্যাপটপ এবং আলট্রাবুক অ্যানাউন্স করেছে বিভিন্ন ল্যাপটপ ম্যানুফ্যাকচারার। যেমন, ROG Mothership এর পাশাপাশি অ্যাসুস অ্যানাউন্স করেছে তাদের নতুন আলট্রাবুক Zenbook S13 যার বেজেল খুবই চিকন এবং স্ক্রিন টু বডি রেশিও ৯৭% যা সাধারনত আজকাল স্মার্টফোন ছাড়া দেখা যায় না। এটি বর্তমানে পৃথিবীর সবথেকে ছোট বেজেলের ল্যাপটপ।

এছাড়াও ল্যাপটপে নতুনত্ব আনতে পিছিয়ে নেই HP ও। HP এবছর এই ইভেন্টে অ্যানাউন্স করেছে তাদের নতুন গেমিং ল্যাপটপ, HP Omen 15, যা এখন  পৃথিবীর প্রথম ২৪০ হার্জ রিফ্রেশ রেটের ডিসপ্লেযুক্ত ল্যাপটপ। এই ২৪০ হার্জ রিফ্রেশ রেট আরও বেশি স্মুথ এনিমেশনস এবং আরও বেশি স্মুথ গেমপ্লে পেতে সাহায্য করবে।

এছাড়াও Samsung অ্যানাউন্স করেছে তাদের নতুন Notebook 9 Pro ল্যাপটপ এবং Huawei অ্যানাউন্স করেছে তাদের নতুন আলট্রাবুক Matebook 13। এই ল্যাপটপগুলোও বেশ প্রিমিয়াম।

নতুন জিপিইউ

এটাই সম্ভবত এবছরের CES এর সবথেকে ইম্পরট্যান্ট এবং সবথেকে এক্সপেকটেড প্রোডাক্ট অ্যানাউন্সমেন্ট। এবছরের ইভেন্টে Nvidia এবং AMD প্রত্যেকেই অ্যানাউন্স করেছে তাদের নতুন জিপিইউ।

Nvidia RTX 2060

এনভিডিয়ার নতুন RTX সিরিজের জিপিইউ লাইনআপেরর সবথেকে বাজেট ফ্রেন্ডলি জিপিইউ হচ্ছে এই নতুন RTX 2060। এনভিডিয়ার নতুন জিপিইউগুলোর মার্কেটিং টার্ম, Ray Tracing এর স্বাদ যদি আপনি নিতে চান, তাহলে RTX 2060 হচ্ছে এর জন্য সবথেকে বাজেট ফ্রেন্ডলি চয়েজ।

এই নতুন RTX 2060 জিপিইউতে আছে ১৯২০ কুডা কোরস এবং ৬ জিবি ভিডিও মেমরি। লাস্ট জেনারেশন GTX 2070 এর মতো এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর থেকে কিছুটা বেটার পারফরমেন্স দিতে পারবে RTX 2060 জিপিইউ। এই জিপিইউটির প্রাইস বর্তমানে ৩৫০ ইউএস ডলার, যা জিপিইউ এর ক্ষেত্রে বাজেট ফ্রেন্ডলি ক্যাটেগরিতেই পড়ে।

AMD Radeon 7

এএমডি অ্যানাউন্স করেছে তাদের নতুন হাই এন্ড জিপিইউ Radeon 7 যা পৃথিবীর প্রথম ৭ ন্যানোমিটার জিপিইউ। এই জিপিইউটিকে মুলত এএমডি এনভিডিয়ার RTX 2080 জিপিইউটির কম্পিটেটর হিসেবে দেখছে। তাই বুঝতেই পারছেন এটি যথেষ্ট পাওয়ারফুল একটি গ্রাফিক্স কার্ড। Radeon 7 এ আছে ৬০ টি কম্পিউট ইউনিট এবং ১৬ গিগাবাইট ভিডিও মেমরি।

এটি একটি অত্যন্ত পাওয়ারফুল জিপিইউ এবং একইসাথে ৭ ন্যানোমিটার জিপিইউ হাওয়ায় এটি একইসাথে অত্যন্ত পাওয়ার এফিশিয়েন্ট। AMD এর ফ্যানবয়দের জন্য এই জিপিইউটি সবথেকে ভালো চয়েজ হতে পারে। এই জিপিইউটি এএমডি এখনো মার্কেটে লঞ্চ করেনি, তবে সামনের মাসেই লঞ্চ করবে।

অন্যান্য অ্যানাউন্সমেন্টস

এগুলোই ছিলো মুলত এবছরের CES এর মেজর এবং সবথেকে ইম্পরট্যান্ট অ্যানাউন্সমেন্টস। তবে আরও অনেক ছোট বড় গ্যাজেটস এবং স্মার্টফোন শো অফ করা হয়েছে এবছরের ইভেন্টে। যেমন- স্যামসাং, শাওমি এবং হুয়াওয়ের কয়েকটি প্রোটোটাইপ ৫জি স্মার্টফোন শো অফ করা হয়েছে। তাছাড়া পৃথিবীর প্রথম শো অফ করা ফোল্ডেবল স্মার্টফোনও স্থান পেয়েছিলো CES এর শো ফ্লোরে এবং সাধারন কনজিউমাররা কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন এই ফোল্ডেবল স্মার্টফোনটি।

ইলেকট্রিক বাইক

তবে এবছরের CES এর অন্যতম একটি আকর্ষণ ছিলো Harley Davidson এর একটি ইলেক্টিক বাইক, যার নাম LiveWire। এই ইলেক্ট্রিক বাইকটি দেখতে খুবই চমৎকার এবং এটি একবার ফুল চার্জে ১৭৭ কিলোমিটার ট্রাভেল করতে পারে। তবে এই বাইকটির সবথেকে ইম্প্রেসিভ ফিচারটি হচ্ছে, এটি ০ থেকে ১০০ কিলোমিটার/ঘন্টা স্পিড তুলতে পারে মাত্র ৩.৫ সেকেন্ডের মধ্যেই। তবে এই ইলেকট্রিক বাইকটি অবিশ্বাস্যরকম এক্সপেনসিভ। এটি এখন ইউএসে প্রি অর্ডারের জন্য এভেইলেবল এবং এটির স্টার্টিং প্রাইস ৩০,০০০ ইউএস ডলার, যা প্রায় একটি হাই এন্ড গাড়ির সমান।

এই ছিলো এবছরের CES 2019 এর মেজর এবং ইম্পরট্যান্ট ডিভাইসগুলো। প্রত্যেকবছরই নতুন নতুন ডিভাইস এবং আগের বছরের তুলনায় আরও বেশি ইউনিক এবং পাওয়ারফুল ডিভাইসের দেখা পাই আমরা। আশা করা যায়, সামনের বছর এর থেকেও আরও অনেক বেটার ডিভাইস দেখতে পাবো আমরা। এটাই প্রযুক্তির নিয়ম। প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত উন্নত থেকে আরও বেশি উন্নত হয়ে চলেছে।

সিয়াম একান্ত
অনেক ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তির প্রতি আকর্ষণ ছিলো এবং হয়তো সেই আকর্ষণটা আরো সাধারন দশ জনের থেকে একটু বেশি। নোকিয়ার বাটন ফোন থেকে শুরু করে ইনফিনিটি ডিসপ্লের বেজেললেস স্মার্টফোন, সবই আমার প্রিয়। জীবনে টেকনোলজি আমাকে যতটা ইম্প্রেস করেছে ততোটা অন্যকিছু কখনো করতে পারেনি। আর এই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ থেকেই লেখালেখির শুরু.....

নতুন ক্লাউড গেমিং সার্ভিস নিয়ে কাজ করছে অ্যামাজন

Previous article

৫টি প্রশ্ন, যেগুলোর উত্তর বিজ্ঞানের কাছে নেই!

Next article

You may also like

Comments

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *