WireBD
মাইন্ড রিডিং : কি হতো, যদি আমরা প্রত্যেকের মন পড়তে পারতাম?

যদি আমরা প্রত্যেকে প্রত্যেকের মন পড়তে পারতাম, তবে মানব সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতো!

মাইন্ড রিডিং — টার্মটি শুনতে বিশাল সায়েন্স ফিকশন সাবজেক্ট মনে হলেও রিয়াল লাইফে এর সফলতা একেবারেই নগণ্য। মানুষের মস্তিষ্ক অনেক কমপ্লেক্স একটি অঙ্গ, আর মাইন্ড রিডিং এতোটা সহজ কোন ব্যাপার নয়। বৈজ্ঞানিকভাবে মানুষের মস্তিষ্কের মধ্যে ঢুকে যাওয়া আর ইনফরমেশন ফেচ করা এখনো ব্যাস্তবতার চাইতে সায়েন্স ফিকশন বেশি হলেও আরো কিছু ম্যাথড রয়েছে যেগুলোর মাধ্যমে টেলিপ্যাথি করা যেতে পারে। কোল্ড রিডিং হচ্ছে একটি পদ্ধতি, যেখানে কোন মানুষের আচরণ এবং বডি ল্যাঙ্গুয়েজ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে মানুষের মস্তিষ্কে কি চলছে অনুমান লাগানো হয়।

আবার মানুষের বডির সাথে পলিগ্রাফ মেশিন বা লাই ডিটেক্টর লাগিয়ে মানুষ কখন মিথ্যা আর কখন সত্য বলছে সেটা ডিটেক্ট করার চেষ্টা করা হয়। যদিও এগুলো পদ্ধতিতে ১০০% ভাবে কারো মাইন্ড রীড করা কখনোই সম্ভব নয়, কিন্তু মোটামুটি রেজাল্ট পাওয়া যেতে পারে। যদি কথা বলি পিওর বিজ্ঞান সম্মত আর হাই টেক উপায় নিয়ে, তাহলে কথা বলতে হয় EEG ডিভাইজ গুলো নিয়ে যেগুলো ব্রেন অ্যাক্টিভিটি স্ক্যান করে এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সিস্টেম ব্যবহার করে মস্তিষ্কের অ্যাক্টিভিটি ইমেজ থেকে অনেক কিছুর সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়।

তাছাড়া বিজ্ঞানীরা মাইন্ড আপলোডিং টেক নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছেন, যেখানে মানুষের সমস্ত স্মৃতিকে ডিজিটাল ডাটাতে পরিণত করে কম্পিউটারে স্টোর করার ধারণার উপর কাজ করা হচ্ছে। ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেস সিস্টেম উন্নতি করা হচ্ছে যার মাধ্যমে হয়তো কম্পিউটার মানুষের মস্তিষ্ক থেকে কম্যান্ড নিয়ে সরাসরি কাজ করতে পারবে এবং মানুষের ইমোশন ও ক্যাপচার করা সম্ভব হতে পারবে। কিন্তু কোন সিস্টেমই প্রকৃতপক্ষে এতোটা উন্নতি লাভ করতে পারেনি যে, মানুষের মাইন্ড রিডিং অনেক ইজিলি করা যেতে পারবে!

তো চলুন, আজকের আর্টিকেলের স্বার্থে মনে করা যাক মানুষের মস্তিষ্কে প্রবেশ করে কারো মন পড়া আর কোন সায়েন্স ফিকশনের ব্যাপার নেই। ধরুন হয়তো এমন কোন হাই টেক ডিভাইজ আবিস্কার করা হলো যেটার মাধ্যমে সহজেই কারো মাইন্ড রীড করা যেতে পারে, তাহলে কি কি সুবিধা এবং অসুবিধা গুলো ঘটতে পারে চলুন এই ব্যাপার গুলো নিয়েই কিছুটা আলোচনা করা যাক…

মাইন্ড রিডিং এর সুবিধা সমূহ

মাইন্ড রিডিং যদি সত্যিই সম্ভব হয় সেক্ষেত্রে বলতে পারেন সম্পূর্ণ দুনিয়াই পরিবর্তন হয়ে যাবে। আমরা যেভাবে চলি, যেভাবে কাজ করি, যে দৃষ্টিতে পৃথিবীকে দেখি — প্রত্যেকটি অ্যাস্পেক্ট আবার নতুন করে ডিস্কভার করার প্রয়োজন পড়বে। যখন আপনি সামনের মানুষের মন পড়ে ফেলতে পারবেন, তখন আর কিছুই আগের মতো থাকবে না। এর সুবিধা ও অসুবিধা দুটোই তৈরি হবে, কিন্তু আমার মনে হয় না মানব সভ্যতা ঠিকে রাখা সম্ভব হবে। যাই হোক আর্টিকেলটির শেষ পর্যন্ত সকল পয়েন্ট গুলো পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করবো। এই প্যারাগ্রাফ গুলোতে প্রথমে এর সুবিধা নিয়ে আলোচনা করা যাক!

মানুষের মন পড়া সম্ভব হয়ে গেলে সবচাইতে বড় ফাঁসা ফাঁসবে ক্রিমিন্যালরা। অনেক ক্রিমিন্যালরা তাদের বয়ানের উপর এতোটায় অটুট থাকে যে কোনভাবেই তাদের কাছ থেকে তাদের অপরাধ স্বীকার করানো যায় না। আর এর ফলে অনেক বড় বড় অপরাধী আইনের ফাঁক দিয়ে সাজা পাওয়া থেকে বেঁচে যায় ফলে ন্যায় বিচার কায়েম করা সম্ভব হয় না। যখন সরাসরি অপরাধীদের মন পড়ে ফেলা যাবে সেক্ষেত্রে তারা আর কিছুই লুকিয়ে রাখতে পারবে না, সবকিছু পরিস্কার হয়ে যাবে এবং সহজেই তাদের সাঁজা শুনানো সম্ভব হবে। অনেক খুনের কেস বছরের পর বছর ধরে আদালতে পরে থাকে সাক্ষী প্রমাণের অভাবে, সেগুলো কয়েক মিনিটের মধ্যেই সল্ভ করে ফেলা সম্ভব হবে। হ্যাঁ, অনেক উকিল তাদের জব হারাবে, কিন্তু কোন কিছুতেই আর কেস তৈরি করার প্রয়োজন পড়বে না, ইনস্ট্যান্ট রায় দেওয়া সম্ভব হবে। তাছাড়া সাক্ষী, প্রমান, স্বীকারোক্তি কোন কিছুরই আর প্রয়োজন থাকবে না।

কোনকিছুই আর গোপন থাকবে না, আপনি কোন মানুষের ইমোশন, কমেন্ট, মোটিভেশন, ইনস্ট্যান্ট বুঝে যাবেন, মেন্টাল হেলথ সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে যাবে। যারা বিশেষ করে ডিপ্রেশনের মধ্যে রয়েছেন এবং নিজের চিন্তা গুলো ভাষায় প্রকাশ করতে পারেন না তাদের জন্য আর ফিলিং প্রকাশ কঠিন কোন ব্যাপার হিসেবে থাকবে না। সুইসাইড মাইন্ড অনেক কমে যাবে, কেননা আপনার মনের মধ্যের ফিলিং গুলো ডাক্তার হুবহু সেই ভাবেই বুঝতে পারবে ফিল করতে পারবে ফলে চিকিৎসা অনেক সহজ এবং নির্ভুলভাবে করা যেতে পারে।

আমাদের সম্পূর্ণ চিকিৎসা মাধ্যম পরিবর্তন হয়ে যাবে, মাইন্ড রিডিং করার মাধ্যমে যে রুগীরা অসুস্থতার কারণে কথা বলতে পারেন না, তাদের সাথেও যোগাযোগ করা যাবে। ঠসা বা বোবা, যাই হোক না কেন মনের কথা সকলের সাথে শেয়ার করা সম্ভব হবে। তাছাড়া মাইন্ড রিডিং এর আরো অনেক সুবিধা পাওয়া যেতে পারে, বিশেষ করে চিকিৎসা ক্ষেত্রে।

মাইন্ড রিডিং এর অসুবিধা সমূহ

আপনি যে কারো মন পড়তে পারবেন, মানে যে কেউ আপনারও মন পড়তে পারবে এর মানে গোপনীয়তা বলে আর কিছুই থাকবে না সাথে মিথ্যা বলাও সম্ভব হবে না। হ্যাঁ বেশিরভাগ সততায় সর্বউত্তম পন্থা, কিন্তু সব সময় নয়। লাইফের প্রত্যেকটি মোর হঠাৎ করেই পরিবর্তন হয়ে যাবে। আর কোন সারপ্রাইজ পার্টি থাকবে না, টিভিতে “কে হবে কোটিপতি” খেলাও খেলা সম্ভব হবে না, আর কোন পরীক্ষাও দিতে হবে না। কারো সাথে এমন কোন জিনিষ নিয়ে আলোচনা করার দরকারই পড়বে না যেটা তারা দেখেনি বা করেনি। প্রায় প্রত্যেকটা সম্পর্কের মধ্যে ফাটল ধরবে, এমন কিছু ছোট ছোট ব্যাপার নিয়েও অনেক বড় বড় ইস্যু তৈরি হয়ে যেতে পারে।

অনেক সময় প্রতিকূল পরিবেশে জীবন ধারন করার জন্য মিথ্যার প্রয়োজন পড়তে পারে, কিন্তু সেটা বলা সম্ভব হবে না। যদি রাজনীতির কথা বলি সেক্ষেত্রে একটি প্লাস পয়েন্ট হবে সবাই সঠিক নেতাকে সহজেই নির্বাচন করতে পারবে, যিনি সত্যি কারের উন্নতি করতে সক্ষম তাকের সকলে ভোট প্রদান করবে, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সকলেই যখন সবকিছু জেনেই যাবে তাহলে নির্দিষ্ট একটি নেতাকে কেন কেউ মেনে চলবে? কেউ কারো থেকে নিজেকে ছোট মনে করবে না, কেননা সবাই সবকিছুই জানবে।

মানব সভ্যতার ভারসাম্য একেবারেই নড়বরে হয়ে যাবে, আর কয়েক বছরের মধ্যেই সবকিছু তছনছ হয়ে যাবে। গোপনীয়তা আর সুরক্ষা বলে কিছুই থাকবে না। কারো কাছে কোন গোপন তথ্য রাখা বা কোন গোপন ম্যাসেজ সেন্ড করা সম্পূর্ণ সম্ভব হয়ে যেতে পারে। যে সরকার ক্ষমতায় থাকবে তার দেশ মেইন্টেইন করা একেবারেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে, কোন ন্যাশনাল সিক্রেট বা সিকিউরিটি থাকবে না।

কোন কিছুই যেখানে গোপন নয়

শুধু তাই নয়, ইন্টারনেট হ্যাকিং অনেক সহজেই সম্পূর্ণ করা সম্ভব হবে। পাসওয়ার্ড সিস্টেমের আর চার পয়সা ও সিকিউরিটি থাকবে না। টেলিপ্যাথি উন্মুক্ত হয়ে গেলে প্রত্যেকটি মানুষের প্রত্যেকটি তথ্য মস্তিষ্কের মধ্যেই ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যাবে। আমরা তখন আর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বা শব্দ ব্যবহার করে কাউকে বিচার করবো না, সরাসরি কারো চিন্তা, ইমোশন থেকে বিচার করবো। এমন কিছু ছোট ছোট মনের কথা যেগুলো অন্য কেউ জেনে অনেক বাজে নেগেটিভ প্রভাব পড়তে পারে।

যদি কথা বলি আমাদের লাভ লাইফ নিয়ে, সেটা অনেকটা ধ্বংস হয়ে যাবে। হ্যাঁ আমি লাভ লাইফে অবশ্যই আপনাকে সৎ হতে বলবো, কিন্তু ১০০% সততায় কোন রিলেশনই টিকে থাকে না, তেমনি মাইন্ড রিডিং করা গেলে ঘরে ঘরে সম্পর্ক বিচ্ছেদ শুরু হয়ে যাবে। যখন কাপল কোন ডেটিং এ যাবে হয়তো কিছুক্ষণ পরেই তাদের মধ্যে আর কিছু খোলাসা থাকতে বাকি থাকবে না। সহজেই একে পরের আগের সম্পর্ক, একে অপরের প্রতি মন্তব্য, মনোভাব ইত্যাদি পরিস্কার হয়ে যাবে ফলে কোটিতে হয়তো একটা কিংবা দুইটা ডেটিং সফল হতে পারে। তবে এখানে কিছু উপকারিতাও রয়েছে, যেমন সময়ের ভুল ব্যাক্তির সাথে সময়ের অপচয় হওয়া এবং হৃদয় ভাঙ্গা থেকে বেঁচে যেতে পারবেন।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আপনি যে কারো সম্পর্কে একটু বেশিই জেনে যাবেন যতোটা সত্যই জানার প্রয়োজনই নেই, ফলে আপনি সঠিক পার্টনার খুঁজেই পাবেন না, যেখানে টেলিপ্যাথি না থাকলে হয়তো কোন এক রিলেশনে জরিয়ে থাকতেন। মনে করুণ আপনি ১০০% মন মতো কাউকে খুজেও পেয়ে গেলেন আর বিয়েও করে ফেললেন, কিন্তু কি গারেন্টি সবকিছু ২৪/৭ আপনার মনের মতোই ঘটবে? কাপলদের মধ্যে মতবিভেদের সৃষ্টি হতেই থাকবে এবং সম্পর্ক আর দীর্ঘায়ু করা সম্ভব হবে না। হ্যাঁ, মতবিভেদের সৃষ্টি এখনো হতে পারে, কিন্তু সেটাকে আলোচনা করার মাধ্যমে সল্ভ ও করা যেতে পারে। কিন্তু যদি মন সরাসরি পড়েই ফেলা যায় সেক্ষেত্রে আলোচনার আর কোন পয়েন্ট থাকে না। আর বলতে পারেন দুইটি মানুষের মধ্যে বিয়ের সম্পর্ক একেবারেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।

হ্যাঁ টেলিপ্যাথির অনেক পজিটিভ ব্যবহার ও দেখা যাবে কিন্তু এর নেগেতিভ ইফেক্ট অনেক বেশি পরে যাবে। সামান্য কোন প্রমিস ব্রেক করারও কৈফিয়ত দিতে হবে, যেখানে কোন কিছুই পার্সোনাল বা প্রাইভেট বলে থাকবে না, সেখানে বসবাস করা সম্পূর্ণই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। তখন হয়তো অনেক হাই টেক গাজেট আবিস্কার হওয়া শুরু হবে যাতে কেউ মাইন্ড রীড করতে না পারে। মানুষ অনেক প্র্যাকটিস করতে শুরু করবে যাতে সবসময় পজিটিভ চিন্তা ভাবনা করা যায়, না হলে সকলেই তা জানতে পারবে। অনেকেই আলাদা আলাদা ভাষা শিখতে আরম্ভ করবে যাতে বিদেশি শব্দ মস্তিষ্কের মধ্যে রাখতে পারে, এতে সহজেই কারো মাইন্ড পরে অনেকে বুঝতে পারবে না।

যাই হোক, যদি মাইন্ড রিডিং ওপেন হয়ে যায় এবং সকলে সেটা ব্যবহার করতে আরম্ভ করে, দুনিয়া আর মোটেও পরিচিত থাকবে না। সকলেই উনুধাবন করতে শুরু করবে অন্যের মন না পড়েই দুনিয়া অনেক সুন্দর ছিল। আমরা এই সিস্টেমে মোটেও টিকতে পারবো না, কেননা এভাবে আমরা কখনোই অভ্যস্ত নয়, কেননা আমরা কখনোই পারফেক্ট নয়।


Images Credits: By Sanja Karin Music/Shutterstock, By pathdoc/Shutterstock, By pathdoc/Shutterstock

তাহমিদ বোরহান

প্রযুক্তির জটিল টার্মগুলো কি আপনাকে বিভ্রান্ত করছে? কিছুতেই কি আপনার মস্তিষ্কে পাল্লা পড়ছে না? তাহলে বন্ধু, আপনি এবার সঠিক জায়গায় এসেছেন—কেনোনা এখানে আমি প্রযুক্তির সকল জটিল বিষয় গুলো ভাঙ্গিয়ে সহজ পানির মতো উপস্থাপন করার চেষ্টা করি, যাতে সকলে সহজেই সকল টেক টার্ম গুলো বুঝতে পারে।

3 comments

সোশ্যাল মিডিয়া

লজ্জা পাবেন না, সোশ্যাল মিডিয়া গুলোতে টেকহাবসের সাথে যুক্ত হয়ে সকল আপডেট গুলো সবার আগে পান!