WireBD

পোকোফোন এফ ওয়ান রিভিউ : ৩০ হাজারের বেস্ট স্মার্টফোন!

শাওমির সাব-ব্র্যান্ড পোকো এর প্রথম স্মার্টফোন, পোকোফোন এফ ওয়ান বা পোকো এফ ওয়ান (ইন্ডিয়ান নেম) বাংলাদেশ এবং ইন্ডিয়ার মার্কেটে যে পরিমান হাইপ তৈরি করেছিলো, সেটা সম্ভবত এখনো পর্যন্ত অন্য কোন অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন তৈরি করতে পারে নি। শাওমির বাজেট ক্যাটাগরির সব স্মার্টফোনই এশিয়ার মার্কেটে ভালো সাড়া ফেলতে পারে, তবে পোকোফোনের মতো এত ভালো সাড়া ফেলতে পারেনি শাওমির কোন স্মার্টফোনই। এর প্রধান কারন আমরা প্রায় সবাই জানি, আর তা হল এর হার্ডওয়্যার স্পেসিফিকেশনস।

এই প্রাইজ রেঞ্জে এত ভালো হার্ডওয়্যার অন্য কোন ব্যান্ডের কোন স্মার্টফোনই অফার করতে পারে না সাধারনত। হুয়াওয়ের অনার প্লে স্মার্টফোনটিও ছিলো এই ধরনের একটি স্মার্টফোন, তবে খাতা-কলমে পোকোফোনের তুলনায় বেটার নয়, যদি আপনি ভ্যালু ফর মানি এবং হার্ডওয়্যার স্পেসিফিকেশন হিসাব করতে বসেন। আমি প্রায় গত ১০ দিন ধরে শাওমির এই অবিশ্বাস্যরকম হাইপ তৈরি করা ডিভাইস, পোকোফোন এফ ওয়ান ব্যাবহার করছি আমার প্রাইমারি স্মার্টফোন হিসেবে। এই ১০ দিনে পোকোফোনের সাথে আমার অভিজ্ঞতা কেমন ছিলো সেটাই আলোচনা করতে চলেছি আজকে। ফোনটির কি কি আমার ভালো লেগেছে এবং কি কি ভালো লাগেনি, সবকিছুই বিস্তারিতভাবে আলোচনা করার চেষ্টা করবো আজকের রিভিউতে।

ডিজাইন এবং বিল্ড কোয়ালিটি

আপনি যদি ইন্টারনেটে এই ফোনটি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে থাকেন এবং বিভিন্ন টেক রিলেটেড ফেসবুক গ্রুপে ঘোরাঘুরি করেন, তাহলে আপনি অবশ্যই ইউটিউবে এবং বিভিন্ন স্মার্টফোন ইউজারের কাছে শুনেছেন যে, বিল্ড কোয়ালিটি এবং ডিজাইন হচ্ছে পোকোফোনের সবথেকে বড় ডাউনসাইড। অন্তত প্লাস্টিক বা পলিকার্বনেটের তৈরি ফোন শুনে স্বাভাবিকভাবে সেটাই মনে হওয়ার কথা। তবে ফোনটি নিজে ব্যাবহার করলে এবং বেশ কয়েকদিন ধরে ব্যাবহার করলে নিশ্চিতভাবেই আপনার ধারনা কিছুটা হলেও চেঞ্জ হয়ে যাবে।

ফোনটি ব্যাবহার করার আগে আমার নিজেরও কিছুটা আশংকা ছিলো এর বিল্ড কোয়ালিটি এবং ডিউরেবলিটি নিয়ে, তবে কয়েকদিন ব্যাবহার করার পরে এটার প্লাস্টিক বিল্ড আমার কাছে তেমন কোন সমস্যাই মনে হয়নি। হ্যা, অবশ্যই কোন গ্লাস বিল্ট বা মেটাল বিল্ট স্মার্টফোনগুলোর মতো প্রিমিয়াম ইন-হ্যান্ড ফিল দেবে না এই ফোনটি, তবে আমরা সাধারনত আমাদের স্মার্টফোনে একটি সিলিকনের ব্যাক কভার হলেও ব্যাবহার করি। তাই ব্যাক কভার ব্যাবহার করলে এটি তেমন কোন সমস্যাই না।

পোকোফোন

এছাড়া এই ফোনটিতে যে প্লাস্টিক ম্যাটেরিয়াল ব্যাবহার করা হয়েছে সেটি যথেষ্ট হার্ড এবং হাই কোয়ালিটি প্লাস্টিক মনে হয়েছে আমার কাছে। আর সবথেকে মজার ব্যাপার হচ্ছে, সত্যি কথা বলতে, এই ফোনটি হার্ড প্লাস্টিকের হওয়ায়, অধিকাংশ গ্লাস বিল্ট স্মার্টফোনের তুলনায় এটি বেশি ডিউরেবল। গ্লাস বিল্ট ফোন হার থেকে পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে যাওয়ার তুলনায় প্লাস্টিকের ফোন হাত থেকে পড়ে ভেঙ্গে যাওয়ার চান্স অনেক কম। তবুও, যদি ২০১৮ তে এসে প্লাস্টিকের তৈরি একটি ফোন ব্যাবহার করাটা আপনার কাছে ভালো না লাগে বা সম্মানজনক মনে না হয়, আমি আপনাকে দোষ দেবো না। একেবারে প্রিমিয়াম বিল্ড কোয়ালিটির স্মার্টফোন চাইলে, আপনি এই ফোনটি অ্যাভয়েড করতে পারেন।

আর ডিজাইনের কথা বলতে হলে, আমি বলবো এই ফোনটির ডিজাইন অত্যন্ত মিনিমাল। মিনিমাল বলতে, খুব বেশি ফ্যান্সি ডিজাইনের কোন স্মার্টফোন নয় এটি। আমার কাছে এই ফোনটির ব্লু ভ্যারিয়েন্টটি আছে  এবং আমার মতে এই ফোনটির ডিজাইন জাস্ট যথেষ্ট ক্লিন (বিশেষ করে ব্যাক পার্ট)। প্লাস্টিক বিল্ড হওয়ায় এবং প্লাস্টিকটি গ্লসি না হওয়ায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট লেগে ফোনের পেছনের অংশ নোংরা হয়ে যায়না, যা অধিকাংশ গ্লাস বিল্ট স্মার্টফোনে হয়ে থাকে। তাই প্লাস্টিক ব্যাবহার করার কিছু অসুবিধার সাথে সুবিধাও আছে। আর পিক্সেল স্মার্টফোনগুলোর মতো এই ফোনের হার্ডওয়্যার বাটনগুলো কালারফুল নয়। ফোনটির যে কালার, হার্ডওয়্যারে বাটনগুলোও (পাওয়ার বাটন, ভলিউম বাটন) একই কালারের।

পোকোফোন

আর হ্যা, এই ফোনে পাওয়ার বাটন এবং ভলিউম বাটনগুলো সবই ফোনের ডানদিকে রাখা হয়েছে এবং বামদিক একেবারেই ফাঁকা রাখা হয়েছে। তবে পোকোফোনের সবথেকে ভালো যে ব্যাপারটি আমার কাছে মনে হয়েছে তা হচ্ছে, ২০১৮ সালের একেবারে শেষের দিকে এসেও এই ফোনটিতে আছে একটি ৩.৫ এমএম হেডফোন জ্যাক যা একেবারেই অবিশ্বাস্য! কারন, আমার মনে হয়না যে এখনো বাংলাদেশ এবং ইন্ডিয়ার মতো দেশগুলোর মানুষ ওয়্যারলেস লাইফে সম্পূর্ণভাবে শিফট হতে পেরেছে। তাই ফোনে একটি এক্সট্রা হেডফোন জ্যাক থাকা অবশ্যই প্রশংসনীয়। তাছাড়া থাকছে ইউএসবি টাইপ-সি পোর্টও যার সাহায্যে টাইপ-সি হেডফোনগুলোও ব্যাবহার করা যাবে এবং ফোনটি চার্জও করা যাবে।

ফোনের পেছনের দিকে ডুয়াল ক্যামেরার সাথে একটি ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সরও আছে যা ফেস আনলকের পাশাপাশি ব্যাবহার করা যাবে যদি আপনি ফেস আনলক ব্যাবহার করতে না চান বা আপনার কাছে সেটা খুব বেশি সিকিওর মনে না হয়।


ডিসপ্লে

ডিসপ্লে আরেকটি সেক্টর, যার কারনে অনেকেরই এই ফোনটি নিয়ে গুরুতর অভিযোগ আছে। মুলত ডিসপ্লে কিংবা ডিসপ্লে কোয়ালিটি নয়, সমস্যাটি হচ্ছে ডিসপ্লের মাথায় থাকা আইফোন ১০ এর মতো সাইজের একটি নচ। অনেকের নচ ভালো লাগে, অনেকে নচ একেবারেই সহ্য করতে পারেনা এবং অনেকে নচ থাকুক বা থাকুক, সেটা নিয়ে তেমন মাথা ঘামায় না। আমি মুলত দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ক্যাটাগরির মাঝামাঝি পর্যায়ে পড়ি। হ্যা, নচ না থাকলে আমি বেশি খুশি হতাম, তবে এটা ২০১৮, নচ এখন স্মার্টফোন ট্রেন্ড তাই এটাকে মেনে নিতে হবে বলে এটা নিয়ে খুব বেশি কমপ্লেইনও করি না। তবে অন্যান্য অনেক স্মার্টফোনের মতো এখানে ডিসপ্লের ওপরে নচটি শুধুমাত্র ট্রেন্ড ফলো করার জন্যই দেওয়া হয়নি। নচটিতে রাখা হয়েছে ফ্রন্ট ক্যামেরা এবং সাথে একটি IR ক্যামেরা যা ফেস রিকগনিশনের কাজ করে বা সহজ কথায় বললে ফেস আনলক ফিচারটির জন্য কাজ করে।

আর অ্যাকচুয়াল ডিসপ্লেটির ব্যাপারে বলতে হলে, এটি একটি ৬.১৮ ইঞ্চির ফুল আইপিএস ডিসপ্লে যার রেজুলেশন ২২৪৬*১০৮০ পিক্সেল বা সহজ কথায় বললে ফুল এইচডি প্লাস। আর নচের কারনে অ্যাসপেক্ট রেশিও হয়ে দাঁড়িয়েছে ১৮.৭ঃ৯। ডিসপ্লে প্রোটেকশন হিসেবে থাকছে গোরিলা গ্লাস থ্রি যা বর্তমানে বেশ পুরনো জেনারেশনের ডিসপ্লে প্রোটেকশন। তাই আমি সাজেস্ট করবো আপনি যদি এই ফোনটি ব্যাবহার করেন, তাহলে অবশ্যই এক্সট্রা গ্লাস প্রটেক্টর ব্যাবহার করবেন। যদিও আমি নিজে ফোনে কোন এক্সট্রা গ্লাস প্রটেক্টর ব্যাবহার করি না, তবে সেটা আমার অভ্যাস। আমার মতো স্টুপিড কাজ করবেন না!

পোকোফোন

নচ আর ডিসপ্লে প্রটেকশনের কথা বাদ দিয়ে অ্যাকচুয়াল ডিসপ্লেটির ভিউইং এক্সপেরিয়েন্স ছিলো যথেষ্ট ভালো। ৩০ হাজারের একটি স্মার্টফোনে হয়তো এর থেকে হালকা কিছুটা বেটার ডিসপ্লের স্মার্টফোন আপনি মার্কেটে পাবেন, তবে ৩০ হাজার প্রাইস রেঞ্জে পোকোফোনের ডিসপ্লেটি নিয়ে আমার কোনরকম কমপ্লেইন নেই। ডিসপ্লেটির আউটডোর ভিউইং এক্সপেরিয়েন্স বেস্ট না হলেও যথেষ্ট ভালো এবং ডিসপ্লেটি বেশ ব্রাইট। এছাড়া সম্পূর্ণ ফোনটি জুড়ে একটি ভিভিড কালার মোড দেওয়া আছে, তবে সেটিংস থেকে কালার মোড নিজের ইচ্ছামত চেঞ্জ করে নেওয়ার অপশন আছে, যেমনটা অন্য প্রায় সব শাওমি ফোনে থাকে।

এছাড়া পোকোফোনের ডিসপ্লে নিয়ে ইন্টারনেটে একটি কমপ্লেইন শোনা যাচ্ছিলো যে, স্ক্রিনের এজ থেকে লাইট ব্লিডিং হয় যার ফলে স্ক্রিনের নিচের দিকে ফ্যাকাশে সাদা রঙের একটি হিউ দেখা যায় যা খুবই বিরক্তিকর। ইউটিউবে অনেক ভিডিও দেখেছিলাম এই সমস্যাটির প্রুফ হিসেবে। আমি বলছি না যে এটা কোন ফেক ব্লেম বা গুজব, তবে আমার ফোনে এই ধরনের কোন লাইট ব্লিডিং ইস্যু আমি লক্ষ্য করিনি। আমার কয়েকজন ফ্রেন্ডও পোকোফোন ব্যাবহার করে। তাদের ফোনেও এই ধরনের কোন সমস্যা আমি লক্ষ্য করিনি। যতদূর শুনেছি, এই লাইট ব্লিডিং সমস্যাটি শুধুমাত্র ইন্ডিয়ান কয়েকটি ইউনিটেই দেখা গিয়েছিলো (আমারটাও ইন্ডিয়ান ইউনিট) এবং শাওমি সেগুলো খুব দ্রুত রিপ্লেস করে দিয়েছে। আমার জানামতে, নতুন কোন ইউনিটে এই লাইট ব্লিডিং ইস্যু নেই।


হার্ডওয়্যার এবং পারফরমেন্স

নিঃসন্দেহে হার্ডওয়্যার হচ্ছে পোকোফোনের সবথেকে ইন্টারেস্টিং পার্ট। কারন, একমাত্র এই হার্ডওয়্যারটির কারণেই পোকোফোন এত বেশি হাইপ তৈরি করতে পেরেছে। পোকোফোনে আছে কোয়ালকমের এখনো পর্যন্ত তৈরি করা সবথেকে পাওয়ারফুল মোবাইল প্রোসেসর, স্ন্যাপড্রাগন ৮৪৫ এবং অ্যাড্রেনো ৬৩০ জিপিইউ। এই একই চিপসেট এবং জিপিইউ অন্যান্য কোম্পানির ফ্ল্যাগশিপ বা আল্ট্রা প্রিমিয়াম স্মার্টফোনগুলোতেই ব্যাবহার করতে দেখা যায়। যেমন- স্যামসাং গ্যালাক্সি এস৯, ওয়ানপ্লাস সিক্স টি কিংবা গুগল পিক্সেল থ্রি। শাওমি কিভাবে মাত্র ৩০ হাজারের আশাপাশের দামের একটি স্মার্টফোনে স্ন্যাপড্রাগন ৮৪৫ প্রোসেসর দিতে পেরেছে, সেটা তারাই ভালো জানে। সেটা আমাদের মাথা ঘামানোর বিষয়ও না।

GeekBench স্কোর

আমি জাস্ট নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে, ৩০ হাজার টাকার মধ্যে বেস্ট পারফরমেন্স এই ফোনটিই দিতে পারবে। আপনি নিশ্চই ধারনা করতে পারছেন, স্ন্যাপড্রাগন ৮৪৫ চালিত একটি স্মার্টফোন কতটা ভালো পারফরমেন্স দিতে পারে। পোকোফোনের পারফরমেন্স সবসময়ই ছিলো অত্যন্ত ফাস্ট এবং ফ্লুইড। এনিমেশনগুলোও ছিল একেবারেই স্মুথ এবং ল্যাগ-ফ্রি। ফোনটি ইন্টেন্সিভ ইউজ করার সময়ও আমি তেমন কোন ল্যাগ বা স্টাটারিং এর দেখা পাইনি আমি। এছাড়া সাথে ৬ জিবি র‍্যাম থাকায় মাল্টিটাস্কিং এবং র‍্যাম ম্যানেজমেন্টও ছিলো যথেষ্ট ভালো। তাছাড়া ৬৪ জিবি ইন্টারনাল স্টোরেজ আছে, যা আমার জন্য যথেষ্ট হলেও, অনেকের জন্য নাও হতে পারে। তাদের জন্য থাকছে একটি হাইব্রিড সিম স্লটও, যেটিতে একসাথে দুটি সিম কার্ড অথবা একটি সিম কার্ড এবং একটি মাইক্রো এসডি কার্ড ব্যাবহার করা যাবে। বাট, ফোনটি পাওয়ার পরপর প্রথম ২-১ দিন আমি ফোনটিতে হালকা কিছু র‍্যাম ম্যানেজমেন্ট ইস্যু এবং মাঝে মাঝে হালকা কিছু এনিমেশন ল্যাগ লক্ষ্য করছিলাম। তবে সেগুলো একটি সফটওয়্যার আপডেটের পরেই ফিক্স হয়ে গিয়েছে।

আর আপনি যদি স্মার্টফোন গেমার হয়ে থাকেন, তাহলে আমি বলবো ৩০ হাজারের মধ্যে আপনার জন্য এই স্মার্টফোনটিই পারফেক্ট। এই প্রাইজ রেঞ্জে অন্য কোন ফোন আপনাকে এতটা ভালো গেমিং পারফরমেন্স দিতে পারবে না। কারন, খাতাকলমে আপনি ওয়ানপ্লাস সিক্স টি, গ্যালাক্সি এস৯ বা পিক্সেল থ্রির মতো স্মার্টফোনগুলোতে যেমন গেমিং পারফরমেন্স পাবেন, সেই একইরকম গেমিং এক্সপেরিয়েন্স পাবেন পোকোফোনে, যেহেতু এগুলোর হার্ডওয়্যার প্রায় একই।

PUBG, Asphalt 8,9, Shadow Fight 3, Modern Combat 5 ইত্যাদির মতো ইন্টেনসিভ গেমগুলো অনেক খেলেছি এবং গেমিং এক্সপেরিয়েন্স ছিলো খুবই ভালো। এতটাই ভালো যে, এর থেকে ভালো গেমিং এক্সপেরিয়েন্স আপনি অন্যান্য খুব বেশি অ্যান্ড্রয়েড ফোনে পাবেন না।  PUBG, Asphalt 8,9 এর মতো নচ-অপটিমাইজড গেমগুলো খেলতে আপনার কোন সমস্যাই হবে না, তবে একটি সমস্যা হচ্ছে, অধিকাংশ গেমই নচের জন্য অপটিমাইজড নয়। তাই অধিকাংশ গেমস আপনি ১৮ঃ৯ অ্যাসপেক্ট রেশিওতে খেলতে পারবেন না। ফোনের স্ক্রিনের ওপরের দিকে এবং নিচের দিকে দুটি বড় ব্ল্যাক বার লক্ষ্য করবেন গেম খেলার সময়, যা সত্যিই একটু বিরক্তিকর। তবে কোন গেমেই পারফরমেন্স কখনোই কোন ইস্যু হবে না, এটা নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি।

ফোনের আরেকটি ভালো ব্যাপার ছিলো এর সাউন্ড কোয়ালিটি এবং স্টেরিও সাউন্ড। পোকোফোনে দুটি স্পিকার আছে, যার একটি স্পিকার গ্রিল ফোনের নিচের দিকে এবং আরেকটি সেকেন্ডারি স্পিকার ফোনের এয়ারপিসের নিচে লুকানো। এই দুটি স্পিকার একসাথে কাজ করে বেশ লাউড, ক্লিয়ার এবং স্যাটিসফাইং সাউন্ড আউটপুট দেয়, যদিও সেকেন্ডারি স্পিকারটি বেশি লাউড সাউন্ড দিতে পারে না। ৩০ হাজার প্রাইস রেঞ্জের একটি স্মার্টফোনে এর থেকে বেটার সাউন্ড কোয়ালিটি আমি এক্সপেক্টও করবো না। তাছাড়া স্টেরিও সাউন্ড হওয়ায় গেমিং এর সময়ও এটা খুব ভালো লিসেনিং এক্সপেরিয়েন্স দেয়।

এছাড়া পোকোফোনে আরও একটি ফ্ল্যাগশিপ গ্রেড হার্ডওয়্যার ফিচার আছে, যেগুলো সব স্মার্টফোনে সাধারনত দেখা যায়না। লিকুইড কুলিং। আর পোকোফোনের লিকুইড কুলিং সিস্টেমটিও বেশ ভালো কাজ করে (করার কথা)। তবে তেমন অবিশ্বাস্যরকম কিছু না এটা। গেমিং এর সময় বা অন্য যেকোনো সময় ফোনটি ঠাণ্ডা রাখার কাজ করে এই লিকুইড কুলিং। তবে এমনও না যে, এই ফোনটিতে বড় কোন হিটিং ইস্যু আছে বলেই এখানে লিকুইড কুলিং এর দরকার হয়েছে। না, প্লাস্টিক ব্যাক প্যানেল হওয়ায়, লিকুইড কুলিং না থাকলেও ফোন গরম হলে এমনিতেই খুব দ্রুত আবার ঠাণ্ডা হয়ে যায়, যেমনটা গ্লাস বা মেটালের স্মার্টফোনে হয়না। গেমিং এর সময় ফোনটি হালকা এবং অনেকসময় হালকার থেকে বেশি গরম হয়েছে এবং গেমিং শেষ করার কিছুক্ষনের মধ্যে ঠাণ্ডাও হয়ে গিয়েছে খুব দ্রুত। তবে এটা লিকুইড কুলিং এর কারনেই হয়েছে কিনা, আমার জানা নেই।

ফোনের পেছনে থাকা ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সরটি যথেষ্ট ফাস্ট এবং অ্যাকিউরেট, যদিও আমি অধিকাংশ সময় ফেস আনলকই ব্যাবহার করে থাকি। এই ফোনে ফেস আনলকের জন্য ডেডিকেটেড একটি এক্সট্রা IR ক্যামেরা ব্যাবহার করা হয়েছে। তাই ফেস আনলক খুব দ্রুত কাজ করে। দ্রুত বলতে চোখের পলকেই কাজ করে যদি আপনার ফেসটি ফোনের সামনে থাকে। আর IR ক্যামেরার কারনে একেবারে ডার্ক এরিয়াতেও এর ফেস আনলক খুব সুন্দরভাবে  কাজ করে। আর হ্যা, এই ফোনের ফেস আনলকও বেশ সিকিওর। আপনার চোখ বন্ধ থাকলে বা আপনার একটি ছবির সাহায্যে ফেস আনলক কাজ করবে না। শুধুমাত্র আপনি ফোনের সামনে সজাগ অবস্থায় থাকলেই কাজ করবে।

যাইহোক, গেমিং বলুন, আর ডে-টু-ডে ইউজ, আপনি যদি ইন্টেন্সিভ ইউজার হয়ে থাকেন এবং ফোনের পারফরমেন্স যদি আপনার কাছে সবথেকে বড় বা অন্যতম বড় একটি প্রায়োরিটি হয়ে থাকে, তাহলে ৩০ হাজারের মধ্যে আপনার জন্য পোকোফোন ছাড়া আর কোন বেটার চয়েজ নেই, এটা আমি নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি।


ক্যামেরা

সব সেক্টরে বেশ ভালো মার্ক নিয়ে পাস করতে পারলেও, ক্যামেরা আরেকটা সেক্টর যেখানে বাজেট স্মার্টফোন এবং আপার মিডরেঞ্জ স্মার্টফোনগুলো ভালো মার্ক নিয়ে পাস করতে পারেনা। তবে সত্যি কথা বলতে, পোকোফোনের ক্ষেত্রে এমনটা হয়নি। প্রথমে কিছু টেকনিকাল স্পেসিফিকেশন বলে নিই, পোকোফোনের রিয়ারে আছে অন্যান্য প্রায় সব মডার্ন স্মার্টফোনের মতো, ডুয়াল ক্যামেরা সেটাপ, যার একটি হচ্ছে ১২ মেগাপিক্সেল (এফ ১.৯ অ্যাপারচার) এবং আরেকটি ৫ মেগাপিক্সেল সেকেন্ডারি ডেপ্ট সেন্সর, যা পোরট্রেইট ছবি তোলার সময় কাজ করে। এছাড়া ফ্রন্ট সাইডে নচের ভেতরে থাকছে একটি ২০ মেগাপিক্সেলের সেলফি ক্যামেরা। পোকোফোনের ক্যমেরা খাতাকলমে একটি এই প্রাইস রেঞ্জের স্মার্টফোনের জন্য যথেষ্ট ভালো এবং সেটা রিয়াল লাইফ ইউজেসের ক্ষেত্রেও সত্যি।

এই ক্যামেরাটি একটি কনসিসট্যান্ট পারফর্মার। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভালো লাইটিং কন্ডিশনে পোকোফোনের ক্যামেরা খুবই ভালো এবং শার্প ছবি তুলতে পারে। ছবিতে ডিটেইলসের পরিমানও থাকে বেশ ভালো। আমি বলবো এই প্রাইস রেঞ্জে এই ফোনেই আপনি বেস্ট ক্যামেরাটি পাবেন। হ্যা, এটা স্যামসাং বা গুগলের ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোনের মতো এত ভালো ছবি তুলতে পারবে না, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আপনি এই ফোনে যেমন ছবি তুলবেন, সেটা এই প্রাইজ রেঞ্জের অন্যান্য স্মার্টফোনের থেকে অনেক বেটার হবে। শাওমির অন্যান্য স্মার্টফোনের সাথে তুলনা করলে আমি বলবো পোকোফোনের ক্যামেরা রিসেন্টলি রিলিজ হওয়া শাওমি মি এ২ এর মতোই এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে মি এ২ এর থেকেও কিছুটা বেটার।

তার মানে এই না যে, মি এ২ এবং পোকোফোনে একই ক্যামেরা সেন্সর ব্যাবহার করা হয়েছে। এর মানে হচ্ছে, পোকোফোনের ক্যামেরার সাথে অন্য কোন ফোনের ক্যামেরার কম্পেয়ার করতে বললে আমি মি এ২ এবং ওয়ানপ্লাস সিক্সের সাথে কম্পেয়ার করবো প্রাইস রেঞ্জটিকে মাথায় রেখে, যদিও ওয়ানপ্লাস সিক্সের ক্যামেরা পোকোফোনের থেকে অনেকটাই বেটার। তবে এটা খুবই স্বাভাবিক, কারন ওয়ানপ্লাস সিক্স এর প্রাইসও পোকোফোনের তুলনায় ভালো পরিমান বেশি।

এই ক্যামেরা দিয়ে তোলা পোরট্রেইট ছবিগুলোর ডিটেইলস এবং এজ ডিটেকশনও নিয়ারলি পারফেক্ট, যদিও অনেকসময় কমপ্লেক্স ব্যাকগ্রাউন্ডে এজ ডিটেকশনে কিছু প্রবলেম থেকেই যায়। এছাড়া বাজেট স্মার্টফোনের ক্যামেরা লো লাইটে সবসময়ই অ্যাভারেজ থেকে খারাপ পারফর্ম করে। পোকোফোনের ক্যামেরা আমার মতে, লো লাইটে অ্যাভারেজ লেভেলের পারফর্ম করে। অর্থাৎ, খুব ভালো এমনটাও নয়, আবার একেবারে খারাপও না। ফোনটির প্রাইস রেঞ্জটি মাথায় রেখে লো লাইটে এমন ক্যামেরা পারফরমেন্স খুব সহজেই মেনে নেওয়া যায়। তার মানে এটা ভাববেন না যে, আমি বলছি লো লাইটে এই ক্যামেরাটি খারাপ। না, ৩০ হাজার প্রাইস ব্র্যাকেটে অন্যান্য যেকোনো স্মার্টফোনের ক্যামেরার থেকে পোকোফোনের লো লাইট ক্যামেরা পারফরমেন্স বেটার।

আর পোকোফোনের ক্যামেরায় আছে AI সিন ডিটেকশন ফিচারও, যার সাহায্যে আপনি কোন অবজেক্টের ছবি তোলার সময় ক্যামেরা ডিটেক্ট করবে যে আপনি কিসের ছবি তুলছেন এবং সেই অনুযায়ী আপনার ক্যামেরা সেটিংসকে অপটিমাইজ করবে। এই AI অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেশ ভালো কাজ করে এবং ছবিগুলোকে বেশ সুন্দরভাবে টিউন করতে পারে যাতে সেটা দেখতে ভালো লাগে। তবে মাঝে মাঝে এই AI অনেক ছবিকে একটি ওভার-এক্সপোজড এবং ওভার স্যাচুরেটেড করে দেয়, যা বেশ বিরক্তিকর। তাই মাঝে মাঝে আমি ইচ্ছা করেই AI অফ করে ছবি তুলেছি।

নিচের ছবিগুলো ফোনের নরমাল ক্যামেরা মোডে তোলা। তবে এখানে দেখে আপনি ছবিগুলোর অরিজিনাল রেজুলেশন দেখতে পাবেন না। নিচের ছবিগুলোর ফুল রেজুলেশন দেখতে এবং ফ্রন্ট ক্যামেরা স্যাম্পলগুলো দেখতে এই লিংকে যেতে পারেন পারেন।

মিডিয়াম লাইট কন্ডিশন
লো লাইট কন্ডিশন
লো লাইট কন্ডিশন
ডার্ক কন্ডিশন
ডেলাইট কন্ডিশন
ইনডোর লাইটিং (ফ্রন্ট ক্যামেরা)
ডে-লাইট কন্ডিশন
Bokeh ইমেজ

 

ফ্রন্ট ক্যামেরা
পোর্টেইট

এই ফোনের ক্যামেরায় আরেকটি মজার ফিচার আছে, তা হচ্ছে, আপনি যেকোনো পোরট্রেইট ছবি তোলার পরেও সেই ছবিটির ব্যাকগ্রাউন্ড ব্লার কমাতে এবং বাড়াতে পারবেন। তাছাড়া আইফোন ১০ এর মতো স্টুডিও লাইটিং ইফেক্টও দিতে পারবেন পোরট্রেইট ছবিগুলোতে, যা অধিকাংশ সময় পারফেক্টভাবেই কাজ করে। এছাড়া এই ক্যামেরার এইচডিআর মোডে তোলা ছবিগুলো ছিলো মাইন্ড ব্লোয়িং। আমি নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি, ৩০ হাজারের আশেপাশে একটি  স্মার্টফোনে ক্যামেরা যদি আপনার মেইন প্রায়োরিটি হয়, এই ফোনটির ক্যামেরা আপনাকে কোনভাবেই হতাশ করবে না। সবকিছু মিলিয়ে পোকোফোনের ক্যামেরা প্রাইস অনুযায়ী যথেষ্ট ইম্প্রেসিভ।

আরেকটি ভালো ব্যাপার হচ্ছে, এই ফোনে আউট অফ দ্যা বক্স Camera2API সাপোর্ট আছে। তাই আপনি ফোন রুট না করে এবং কাস্টম রম ইন্সটল না করেই গুগল ক্যামেরা মড ব্যাবহার করতে পারবেন শুধুমাত্র apk ফাইল সাইডলোড করেই, যা আমার মতে এই ফোনের অন্যতম একটি আন্ডাররেটেড ফিচার। তবে ফোনটি 4K ৬০ এফপিএস ভিডিও ক্যাপচার করতে সক্ষম হলেও কোন এক অজানা কারনে শাওমি 4K ভিডিওর ক্ষেত্রে ফ্রেম রেট ৩০ এফপিএসেই লক করে রেখেছে। হয়তো আগামীতে কোনো সফটওয়্যার আপডেটের মাধ্যমে 4K ৬০ এফপিএস ভিডিও ক্যাপচার সাপোর্ট দেওয়া হতে পারে। তাছাড়া ১০৮০পি ৩০ এফপিএস এবং ৬০ এফপিএস অপশন আছে যা অধিকাংশ ইউজারের জন্য যথেষ্ট।

এছাড়া ১০৮০পি ২৪০ এফপিএস স্লো মোশন ভিডিওগুলো ছিলো দেখার মতো। আছে ইলেকট্রনিক ইমেজ স্ট্যাবিলাইজেশন বা EIS যা ১০৮০পি এবং ৭২০পি ভিডিওর সময় কাজ করে তবে 4K এর সময় কাজ করে না। তাই 4K ভিডিওগুলোর তুলনায় ১০৮০পি ভিডিওগুলো ছিলো বেশি স্ট্যাবিলাইজড। ওভারল ভিডিও ক্যামেরা হিসেবে আমি বলবো এই বাজেটের মধ্যে যথেষ্ট ভালো একটি ক্যামেরা এবং বেস্ট ভিডিও ক্যামেরাও বলা যায় যদি আপনি প্রাইস রেঞ্জটি মাথায় রাখেন। তবে অন্যান্য ব্র্যান্ডের ফ্ল্যাগশিপ গ্রেডের স্মার্টফোনগুলোর তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে থাকবে এই ফোনের ক্যামেরা।

আর ২০ মেগপিক্সেল ফ্রন্ট ক্যামেরাটি ছিলো অসাধারন। ২০ মেগাপিক্সেলের এই ফ্রন্ট ক্যামেরাটি ১০৮০পি ৩০ এফপিএস ভিডিও ক্যাপচার করতে সক্ষম। এই প্রাইস রেঞ্জে এর থেকে বেটার সেলফি ক্যামেরা আপনি পাবেন না। আমি ফ্রন্ট ক্যামেরা নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামাই না, তাই আমার কাছে এটা খুব বড় ব্যাপার নয়। তবে ফ্রন্ট ক্যামেরা যদি আপনার কাছে বড় একটি প্রায়োরিটি হয়ে থাকে এবং আপনি যদি Oppo স্মার্টফোন নিতে না চান, আপনি নিশ্চিন্তে পোকোফোন নিতে পারেন। এর ফ্রন্ট ক্যামেরা কোনভাবেই আপনাকে হতাশ করবে না। এর সেলফি ক্যামেরাতেও আছে পোরট্রেইট মোড, যা সম্পূর্ণভাবে সফটওয়্যার বেজড। তবে এটিও যথেষ্ট ভালো কাজ করে। আপনি যদি ভ্লগার হয়ে থাকেন এবং ভ্লগিং এর জন্য ৩০ হাজারের মধ্যে একটি স্মার্টফোন খোঁজেন, তাহলেও আমার মতে পোকোফোন আপনার জন্য অন্যতম একটি ভালো চয়েজ হবে।


সফটওয়্যার ও ব্যাটারি লাইফ

এবার বলা যাক পোকোফোনের সফটওয়্যার নিয়ে। সাধারনত সব শাওমি স্মার্টফোনে যে টিপিক্যাল সফটওয়্যার ব্যাবহার করা হয়, যেহেতু পোকোফোন শাওমিরই তৈরি, তাই এটিতেও একই সফটওয়্যার ব্যাবহার করা হয়েছে যেটি হচ্ছে MIUI 10, যা শাওমির তৈরি কাস্টম অ্যান্ড্রয়েড স্কিন এবং মার্কেটের অন্যতম জনপ্রিয় একটি কাস্টম অ্যান্ড্রয়েড স্কিন। তবে পোকোফোনের জন্য এই MIUI 10 কে আরও একটু কাস্টোমাইজ করা হয়েছে এবং স্পেশালি এই সফটওয়্যারটির নাম দেওয়া হয়েছে MIUI For POCO।

শাওমির অন্যান্য স্মার্টফোনে যেসব ফিচারস আছে, তার সবগুলোই আছে পোকোফোনের সফটওয়্যারে। তবে এই ফোনে এক্সট্রা একটি সফটওয়্যার ফিচার আছে, আর তা হচ্ছে POCO Launcher। শাওমির অন্যান্য স্মার্টফোনে সাধারনত ডিফল্ট লঞ্চারে কোন অ্যাপ ড্রয়ার বাটন থাকে না। তবে পোকোফোনের ডিফল্ট লঞ্চার, POCO লঞ্চারে আছে অ্যাপ ড্রয়ার এবং আরও এক্সট্রা কিছু ইউজফুল ফিচার যেমন- কালারের সাহায্যে অ্যাপ গ্রুপিং, কাস্টম আইকন প্যাক সাপোর্ট ইত্যাদি।

আপনি যদি নচ হেটার হয়ে থাকেন, তাহলে ফোনের সেটিংসে নচ হাইড করে রাখার একটি অপশন পাবেন যেটা অ্যাক্টিভ করে নিতে পারেন। যদিও নচ হাইড করার এই সেটিংসটি শাওমির নচ-যুক্ত সব স্মার্টফোনেই আছে। সফটওয়্যার নিয়ে তেমন বিশেষ কিছুই বলার নেই। টিপিক্যাল MIUI, তবে বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট নতুন সেটিংস এবং ছোট ছোট কনভেনিয়েন্ট ফিচারস অ্যাড করা হয়েছে। যেমন- গেমিং মোড। গেম খেলার সময় গেমিং মোড অন করে নিলে গেমিং এর যেকোনো সময় গেম রেকর্ড করা, স্ক্রিন স্ন্যাপ নেওয়া, র‍্যাম ক্লিন করা ইত্যাদি কাজ করতে পারবেন গেম থেকে না বের হয়েই।

তাছাড়া সফটওয়্যারের আরেকটি ব্যাপার আমার ভালো লেগেছে, তা হচ্ছে- স্টক অ্যান্ড্রয়েডের মতো ক্লিন নেভিগেশন বাটনস। যদিও অধিকাংশ সময় আমি জেসচার বেজড নেভিগেশন কনট্রোলই ব্যাবহার করি, তবে আপনার যদি জেসচারে সুবিধা না হয়, তাহলে আপনি অন-স্ক্রিন নেভিগেশন বার ব্যাবহার করতে পারবেন। আর সিস্টেম ওয়াইড একটি নতুন থিমও দেওয়া হয়েছে যার নাম POCO। আমি এখনো পর্যন্ত এই ফোনের সফটওয়্যারে কোনরকম ল্যাগ লক্ষ্য করিনি। এর কারন হতে পারে, MIUI For POCO সফটওয়্যারের নতুন টার্বোচার্জড ইঞ্জিন যা অ্যাপ লঞ্চিং এবং ইউআই এর অন্যান্য সকল টাস্ককে অপটিমাইজ করে যাতে সেগুলো সবসময় ফাস্ট এবং রেসপনসিভ পারফরমেন্স দিতে পারে (শাওমির দাবীমতে)। তবে সেটা সত্যিকারেই কোন কাজ করে কিনা আমার জানা নেই। কারন, এই ধরনের হাই এন্ড হার্ডওয়্যারের স্মার্টফোন এমনিতেই যথেষ্ট ফাস্ট পারফরমেন্স দিতে পারবে, যেমনটা পোকোফোন দিতে পারছে।

MIUI একটি হেভি অ্যান্ড্রয়েড স্কিন হলেও এটি সবথেকে বেশি অপটিমাইজড অ্যান্ড্রয়েড স্কিনগুলোর মধ্যে একটি। তাছাড়া হাই এন্ড ইন্টারনাল হার্ডওয়্যারের কারনে ল্যাগ বা স্টাটারিং এর কোন প্রশ্নই আসে না। আপনি সবথেকে ভালো সফটওয়্যার পারফরমেন্স শাওমির যে ফোনগুলোতে পাবেন, তার মধ্যে নিশ্চিতভাবেই পোকোফোন একটি। শাওমি পোকোফোনের সফটওয়্যারকে অন্তত Android Q পর্যন্ত আপডেট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তাই সফটওয়্যার আপডেট নিয়েও খুব বেশি চিন্তার কারন নেই। তাছাড়া ইতমধ্যেই শাওমি পোকোফোনের জন্য Android P বেটা ভার্শন পাবলিক রিলিজ করেছে।

পোকোফোনের এই হার্ডওয়্যার এবং সফটওয়্যারকে ব্যাকআপ করছে ৪০০০ এমএএইচ এর একটি ব্যাটারি, যা কুইক চার্জ ৩.০ সাপোর্টেড। ব্যাটারি লাইফ হচ্ছে আরেকটা পার্ট, যেখানে পোকোফোন ইম্প্রেসিভ পারফরমেন্স দিতে পেরেছে। পোকোফোনের ব্যাটারি লাইফ আপনাকে কখনোই হতাশ করবেন না। সাধারন থেকে হালকা ইন্টেনসিভ ইউজেসে এই ব্যাটারি টানা সারাদিন ব্যাকআপ দিতে পেরেছে। হালকা কিছু VOIP কল, ২-৩ ঘন্টা ইউটিউব, কয়েক ঘণ্টা লাইট এবং ইন্টেনসিভ গেমিং, ফেসবুক ব্রাউজিং, চ্যাটিং এইসবকিছু মিলিয়ে পোকোফোন সম্পূর্ণ একদিন ব্যাটারি ব্যাকআপ দিতে পেরেছে যেখানে আমি স্ক্রিন অন-টাইম পেয়েছি ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা। অর্থাৎ, তুলনামুলক লাইট ইউজেসে ৬ ঘণ্টা এবং ইন্টেনসিভ ইউজেসে ৫ ঘন্টার মতো। তবে আপনি কেমন ব্যাটারি ব্যাকআপ পাবেন এটা আসলে আমি সঠিকভাবে বলতে পারবো না, কারন সেটা আপনার ইউজেসের ওপরে ডিপেন্ড করে। তবে মিডিয়াম থেকে ইন্টেনসিভ ইউজার, কাউকেই এই ফোনের ব্যাটারি লাইফ হতাশ করবে না এটা আশা করাই যায়।

ফোনের বক্সে থাকা ১৮ ওয়াটের ফাস্ট চার্জারটি যথেষ্ট ভালো কাজ করে। এই চার্জার দিয়ে চার্জ দিলে মাত্র ৪৫ মিনিটের মধ্যেই ১০% চার্জ থেকে ৫০% চার্জ হয়ে যায়। আর ফুল চার্জ হতে প্রায় ২ ঘন্টার মতো সময় লাগে। তাই ফোনটি চার্জ দেওয়ার সময়, আমি সাজেস্ট করবো বক্সে ইনক্লুডেড চার্জারটিই ব্যাবহার করতে।


আপনি যদি পোকোফোন ব্যাবহার করার কথা ভাবেন, তাহলে প্লাস্টিক বিল্ড ছাড়াও এটার আরেকটি বড় ইস্যু জেনে নেওয়া ভালো। তা হচ্ছে, পোকোফোনে নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম ইত্যাদি প্রিমিয়াম ভিডিও স্ট্রিমিং সার্ভিসে আপনি HD এবং Full HD ভিডিও প্লে করতে পারবেন না। কারন, পোকোফোনে ওয়াইডভাইন লেভেল ওয়ান লাইসেন্স নেই। আছে লেভেল থ্রি লাইসেন্স। তাই নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইমের মতো ভিডিও স্ট্রিমিং সার্ভিসগুলোতে আপনি সর্বোচ্চ 540p রেজুলেশনে ভিডিও স্ট্রিম করতে পারবেন।

আপনি যদি আমার মতো নেটফ্লিক্স ইউজার হয়ে থাকেন, তাহলে এটা আপনার জন্য একটি বড় সমস্যা হতে পারে। তবে আমার জানামতে, বাংলাদেশে নেটফ্লিক্স বা অ্যামাজন প্রাইমের খুব বেশি সাবস্ক্রাইবার নেই, তাই এটা সবার জন্য সমস্যা হবে না। তবে শাওমি পোকোফোনে ওয়াইডভাইল লেভেল ওয়ান সাপোর্ট দেওয়ার চেষ্টা করছে। যদিও আমার জানা নেই কবে সেটা পাওয়া যাবে এবং সফটওয়্যারের মাধ্যমে কিভাবেই বা পাওয়া যাবে। কারন, এটি একটি হার্ডওয়্যার ইস্যু।

এই ছিলো শাওমির বাজেট ফ্ল্যাগশিপ পোকোফোন এফ ওয়ানের সাথে আমার ইউজেস এক্সপেরিয়েন্স। আমি ফোনের সবগুলো ভালো এবং খারাপ দিক কভার করার চেষ্টা করেছি। হ্যা, আমার মতে ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার প্রাইস রেঞ্জে এর থেকে বেটার স্মার্টফোন মার্কেটে আর নেই। তবে আপনার জন্য তখনই বেটার হবে যদি ফোনের বিল্ড কোয়ালিটি আপনার কাছে খুব বড় প্রায়োরিটি না হয়ে থাকে। যদি কোন জায়গায় কোন পয়েন্ট  মিস করে গিয়ে থাকি, তাহলে অবশ্যই কমেন্ট সেকশনে বলবেন অথবা প্রশ্ন করবেন।

সিয়াম একান্ত

অনেক ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তির প্রতি আকর্ষণ ছিলো এবং হয়তো সেই আকর্ষণটা আরো সাধারন দশ জনের থেকে একটু বেশি। নোকিয়ার বাটন ফোন থেকে শুরু করে ইনফিনিটি ডিসপ্লের বেজেললেস স্মার্টফোন, সবই আমার প্রিয়। জীবনে টেকনোলজি আমাকে যতটা ইম্প্রেস করেছে ততোটা অন্যকিছু কখনো করতে পারেনি। আর এই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ থেকেই লেখালেখির শুরু.....

21 comments

  • আমার এই পর্যন্ত দেখা সেরা রিভিউ এইটা ব্র। এটাই চাচ্ছিলাম থ্যাংকস। তাহলে তো ২৭ হাজারে আর অন্য কিছু হতেই পারে না।

    • যদিও মি এ২ এর ডুয়াল ক্যামেরা সেটাপটি বেশি রিলায়েবল (যেহেতু সেকেন্ডারি ক্যামেরাটি ডেপ্ট সেন্সিং নয়), বাট প্র্যাকটিক্যালি তেমন একটা পার্থক্য পাবেন না মি এ২ আর পোকো এফ ওয়ানের ক্যামেরা পারফরমেন্সে। বলতে পারেন, ক্যামেরা সেকশনে সিমিলার বা নিয়ারলি একইরকম পারফর্ম করবে দুটি ফোনই।
      তবে আমি অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখেছি যে, মি এ২ এর থেকে পোকো এফ ওয়ান এর ক্যাপচার করা ছবিগুলো কিছুটা বেটার এবং একটু বেশি ডিটেইলড। ক্যামেরার জন্য আপনি যেকোনোটা নিতে পারেন। তবে একটা বিষয় মাথায় রাখা ভালো, আপনি পোকোফোনে ২৪০ এফপিএস স্লো মোশন ভিডিও করতে পারবেন, যেটা মি এ২ তে পারবেন না। আপনি স্টক অ্যান্ড্রয়েড লাভার হলে মি এ২ নিতে পারেন আর বেস্ট পারফরমেন্স চাইলে পোকোফোন নিতে পারেন। তবে ক্যামেরার জন্যেও আমি সাজেস্ট করবো পোকোফোন নিতে, যদি বিল্ড কোয়ালিটি নিয়ে আপনার কোন সমস্যা না থাকে।

  • ভাইয়া আপনি এন্ড্রয়েড ৯ পেলেন কিভাবে? আমি এ২ লাইট, এন্ড্রয়েড ওয়ান ইউজার। আমি কখন আপডেট পাবো? অসাধারণ রিভিউটির জন্য ধন্যবাদ।

    আরেকটা কথা অফিসিয়াল কি পাওয়া যাচ্ছে এই ফোন? আন অফিসিয়াল কেনা কতটা যুক্তিযুক্ত?

    • আমি MIUI 10 Beta ভার্শন ব্যাবহার করছি তাই অ্যান্ড্রয়েড ৯ পেয়েছি। আমার জানামতে শাওমি এখনো পর্যন্ত অ্যান্ড্রয়েড ওয়ান ডিভাইসগুলোর শুধুমাত্র মি এ২ এর জন্য অ্যান্ড্রয়েড ৯ আপডেট পাবলিক রিলিজ করেছে। মি এ২ লাইটের জন্য এখনো পর্যন্ত করেনি (যতদূর আমি জানি)। আপনার ডিভাইসের জন্য অ্যান্ড্রয়েড ৯ আপডেট পাবলিক রিলিজ করলেই আপনি আপডেট পাবেন।
      অফলাইনে অফিশিয়ালি পাওয়া যাচ্ছে কিনা শিওরলি বলতে পারছি না। না গেলেও খুব দ্রুতই পাওয়া যাবে আশা করি। তাছাড়া অনলাইনে দারাজে (Daraz) অফিশিয়ালি অলরেডি সেল করেছে সেটা হয়তো জানেন। আন-অফিশিয়াল ফোন নিলে শুধুমাত্র অফিশিয়াল ওয়ারেন্টি পাবেন না, এইটুকুই ডিসঅ্যাডভান্টেজ দেখছি আমি। আপনার কাছে অফিশিয়াল ওয়ারেন্টির প্রয়োজনীয়তা কতটুকু সেটার ওপরে ডিপেন্ড করে। আমি আন-অফিশিয়ালি কিনেছি, তবে আমি সাজেস্ট করবো অফিশিয়াল ওয়ারেন্টিসহ ফোন নিতে।

  • সব কিছু ই যদি ছিলো , তবে আছে টা কি? সব‌ই পাস্ট? প্রেজেন্টে নেই? ….lol ‌‌…

    • প্রেজেন্টেও আছে। আমি অ্যাকচুয়ালি আমার লাস্ট এক সপ্তাহের এক্সপেরিয়েন্স অনুযায়ী এটা লিখেছি। এইজন্যই “ছিল” বলেছি।

সোশ্যাল মিডিয়া

লজ্জা পাবেন না, সোশ্যাল মিডিয়া গুলোতে টেকহাবসের সাথে যুক্ত হয়ে সকল আপডেট গুলো সবার আগে পান!