WinRAR (উইনরার) : ৪০ দিনের ফ্রি ট্রায়াল ভার্সন আজীবন ফ্রি চলে কিভাবে?

W

হোম ইউজার’রা মোটেও সফটওয়্যার লাইন্সেস নিয়ে তোয়াক্কা করে না। বেশিরভাগ হোম ইউজারদের উইন্ডোজ (অপারেটিং সিস্টেম) থেকে শুরু করে আইডিএম আর যতো পেইড সফটওয়্যার রয়েছে সবই প্রায় পাইরেটেড ভার্সনের। কিন্তু অবশ্যই একটি কোম্পানিকে লাইসেন্সের তোয়াক্কা করতে হয়, লাইসেন্স বিহীন সফটওয়্যার ব্যবহার করলে দিগুন অর্থ ডন্ডি যেতে পারে।

অনেক সফটওয়্যার রয়েছে যারা কেনার আগেই তাদের সফটওয়্যার ব্যবহার করার সুযোগ প্রদান করে থাকে। আপনি আগেই তাদের সফটওয়্যার ইউজ করতে পারবেন এবং পরবর্তীতে ভালো লাগলে বা চলমানভাবে ব্যবহার করতে চাইলে অবশ্যই নির্দিষ্ট ফ্রি সময় পরে আপনাকে লাইসেন্স কিনে সফটওয়্যারটি ব্যবহার করতে হবে। WinRAR (উইনরার) সফটওয়্যারটিও এভাবেই কাজ করে, প্রথমে তারা ৪০ দিনের ফ্রি ইউজ করার সুবিধা প্রদান করে এবং পরে আপনি যদি সফটওয়্যারটি লাগাতার ইউজ করতে চান সেক্ষেত্রে আপনাকে লাইসেন্স কিনতে হয়!

ওয়েট, WinRAR (উইনরার) সফটওয়্যারটি আসলে লাইসেন্স না কিনেও আজীবন ইউজ করা যায়, মানে এক প্রকারের বলতে পারেন এর ফ্রি ট্রায়াল ভার্সনটিই আজীবন কাজ করে! কিন্তু কেন? কেন এরকমটা হয়? — এই আর্টিকেলে এটিই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি।

উইনরার

রাসাল আর্কাইভ (Roshal Archive) বা রার (RAR) এর সাথে আমরা ১৯৯৩ সালে প্রথম পরিচিত হই — এটি একটি মালিকানা যুক্ত আর্কাইভ ফাইল ফরম্যাট, যেটিকে মূলত ডাটা কমপ্রেশনের কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এই ফাইল ফরম্যাটটি মূলত রাশিয়ান ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা প্রস্তুতকৃত ছিল। যাই হোক, মাত্র দুই বছর পরে আমাদের সামনে একটি উইন্ডোজ ইউটিলিটি সফটওয়্যার চলে আসে, যার নাম WinRAR (উইনরার); এটা মূলত আর্কাইভ ফাইল তৈরি এবং ভিউ করতে পারে। এটি রার ফরম্যাট সাপোর্ট করা ছাড়াও আরো অনেক টাইপের আর্কাইভ ফরম্যাট প্যাক এবং আন-প্যাক করতে পারে।

সফটওয়্যারটির ব্যবহারের নীতি অনুসারে, আপনি একে প্রথমবারের জন্য ৪০ দিনের ফ্রি ব্যবহার করতে পারবেন। তারপরে সফটওয়্যারটি ব্যবহার করতে চাইলে আপনাকে এর পেইড ভার্সন কিনতে হবে বা লাইসেন্স এর জন্য অর্থ প্রদান করতে হবে। বাজারে অনেক সফটওয়্যার রয়েছে যারা ”try before you buy” সুবিধাটি প্রদান করে থাকে। কিন্ত কাহিনী হচ্ছে, এই ফ্রি সময় পরে আপনি যদি লাইসেন্স না কেনেন সেক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় পরে সফটওয়্যারটি আর কাজ করবে না। আপনি পিসিতে নিশ্চয় আইডিএম (ইন্টারনেট ডাউনলোড ম্যানেজার) ইউজ করেন, আর আপনি জানেন ৩০ দিন পরে এটা আর ফ্রি ব্যবহার করা যায় না।

আজীবন ফ্রি ট্রায়াল

কিন্তু উইনরার এর ফ্রি পিরিয়ড পরেও আনলিমিটেড ইউজ করা যায়, শুধু একটি পপ-আপ শো করে যেখানে আপনাকে সফটওয়্যারটি কেনার কথা বলা হয় অথবা আপনাকে সিস্টেম থেকে এটি রিমুভ করার কথা বলা হয়। কিন্তু কে শোনে কার কথা বলুন, না আমি কিনে ইউজ করি আর নাই বা আপনি। যেখানে ট্রায়াল শেষ হওয়ার পরেও সফটওয়্যারটি না কিনেই ইউজ করা যায়, আর এটা সফটওয়্যারটি ক্র্যাক না করেই। কিন্তু কেন?

ওয়েল, যদি লম্বা কাহিনী ছোট করে বর্ণনা করতে যাই সেক্ষেত্রে এখানে আসলে কোম্পানিই আমাদের আজীবন ফ্রি ইউজ করার সুবিধাটি প্রদান করেছে। এটা বলতে পারেন উইনরার কোম্পানির একটি বিজনেস পলিসি। উইনরার কোম্পানির সিইও বুড়াক কানবয় (Burak Canboy) সফটনিকের একটি ইন্টারভিউ এ নিজেই একথা স্বীকার করেছেন। ইন্টার্ভিউটি এখান থেকে পড়তে পারেন।

তাকে যখন প্রশ্ন করা হয়, সফটওয়্যারের পাইরেসি ঠেকানর জন্য আপনি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন? উত্তরে তিনি বলেন;

“সফটওয়্যার বিজনেসে পাইরেসি অনেক জটিল একটি সমস্যা, সকল সফটওয়্যার নির্মাতা কোম্পানিদেরই এই সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু পাইরেসি সমস্যা আমাদের তেমন ফেস করতে হয় না যতোটা আলাদা সফটওয়্যার নির্মাতাদের করতে হয়। কেননা আমরা ফ্রি ট্রায়াল পিরিয়ড পরেও সফটওয়্যারটি ব্যবহার করার সুযোগ প্রদান করি। অনেকেই মনে করে উইনরার একটি ফ্রি সফটওয়্যার, যেখানে তারা অফিশিয়ালভাবেই ফ্রি ইউজ করতে পারে সেখানে কেন পাইরেটেড ভার্সন ইউজ করবে যেটা হতে ক্ষতিকর প্রমানিত হতে পারে?”

আইনস্টাইন বলে গেছেন, দুইটি জিনিষ অসীম, “এই ইউনিভার্স এবং উইনরার ৪০ দিনের ফ্রি ট্রায়াল 😛 “

এরমানে হচ্ছে, আপনি ফ্রি পিরিয়ড পরেও এদের সফটওয়্যার ফ্রি ইউজ করতে পারেন এবং কোম্পানি এটা নিজে থেকে আপনাকে করতে দেয়। ফ্রি ট্রায়াল পরেও উইনরার ইউজ করতে দেওয়া একটি বিদ্ধিমান বিজনেস নীতি, এতে করে কোম্পানি তাদের সফটওয়্যারকে পাইরেটেড ফ্রি রাখতে পারে এবং মার্কেটে তাদের সফটওয়্যারের জনপ্রিয়তাও বহাল থাকে। আর এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, উইনরার কতোটা জনপ্রিয় একটি সফটওয়্যার, আপনি এই আর্টিকেলটি পড়ছেন আর আমি নিশ্চিত আপনি আগে থেকেই এই সফটওয়্যারটি চেনেন এবং ব্যবহার করেন।

কিন্তু এভাবে এরা উপার্জন করে?

পেইড সফটওয়্যার কোম্পানি অফিশিয়ালভাবেই ফ্রি ইউজ করতে দেয় এটা আমাদের জন্য সত্যিই অনেক আনন্দের কথা, কিন্তু এখানে আরেকটি প্রশ্নের জন্ম নেয়, সেটা হচ্ছে কিভাবে এই কোম্পানি টাকা উপার্জন করে? তাদের তো উপার্জনও করতে হবে রাইট? না হলে কোম্পানি চলে কিভাবে?

উত্তরটি অনেক সহজ, যারা বিজনেস সলিউশনের জন্য সফটওয়্যারটি ব্যবহার করে তাদের থেকে উইনরার টাকা ইনকাম করে। আপনি win-rar.com বা rarlab.com থেকে সফটওয়্যারটি যতোখুশি ফ্রি ডাউনলোড করতে পারবেন এবং ৪০ দিন পর্যন্ত এর সকল ফাংশন কাজ করবে। ৪০ দিন পরে সফটওয়্যারটির বাকি ফাংশন গুলো কাজ করলেও “Add authenticity information”, “Show protocol file” এবং “Delete protocol file” — এই ফাংশন গুলো কাজ করবে না। মানে আপনি যদি উক্ত ফাংশন গুলো কাজ করাতে চান তো অবশ্যই আপনাকে সফটওয়্যারটি কিনতে হবে।

এখানে আগেই বলেছি, নরমাল হোম ইউজাররা মোটেও লাইসেন্সিং নিয়ে কেয়ার করে না, বাট আপনি যদি কোন বিজনেস রান করেন তো আপনি না চাইলেও আপনাকে আইনের খ্যাতিরে লাইসেন্স নিতে হবে। হ্যাঁ, প্রত্যেকটি কোম্পানিই যে লাইসেন্স কিনেই সফটওয়্যার ইউজ করে এমনটাও কিন্তু নয়। তবে এই সফটওয়্যারের যেরকমের জনপ্রিয়তা, এতে প্রত্যেক ১০টির ১টি কোম্পানি কিনে ইউজ করলেই উইনরারের আর টাকা রাখার জায়গা থাকবে না।

কোন পেইড সফটওয়্যার সাধারণ ইউজারের হাতে ধরিয়ে দেওয়া কিন্তু মোটেও সহজ ব্যাপার নয়। মানুষ কেনার আগে পাইরেটেড ভার্সন ইউজ করায় ইজি মনে করবে। এক রিপোর্ট অনুসারে ৬৬% অনলাইন সার্ভে কোম্পানি সার্ভে করে দেখেছে যে সফটওয়্যার গুলো ফ্রি ট্রায়াল প্রদান করে সেখান থেকে কেবল ~২৫% বা আরো কম পেইড কাস্টমার পাওয়া যায়, বাকি গুলো ট্রায়াল শেষে ঐ সফটওয়্যার ব্যবহার বন্ধ করে দেয় অথবা পাইরেটেড ভার্শন ইউজ করতে শুরু করে। এখানে উইনরারের কৌশল অনুসারে দেখা যায়, তারা জাস্ট মার্কেটে নিজের নাম বজায় রাখতে চায়।


যেহেতু উইনরার একটি পপ-আপ ম্যাসেজ প্রদান করে এবং সফটওয়্যারটি ফ্রি ব্যবহার ও করতে দেয়, সেক্ষেত্রে এই সফটওয়্যারকে ন্যাগওয়্যার (Nagware) বা বেগওয়্যার (Begware) বলা যেতে পারে — কেননা এটা বারবার টাকার জন্য ভিক্ষা চাইতেই থাকে 😛

তবে এই ম্যাসেজ মোটেও অযোগ্য নয়, অ্যাটলিস্ট উইনরারের ক্ষেত্রে। উইনরার ডেভেলপার’রা চাইলে ৪০ দিনের ফ্রি ট্রায়ালের পরে তাদের সফটওয়্যার ব্যবহার বন্ধ করে দিতে পারতো, কিন্তু তারা করে না আর এটা নিশ্চয় শ্রদ্ধা করার মতো একটি ব্যাপার। যদিও মার্কেটে এই কাজের জন্য অনেক আলাদা টুলস রয়েছে, 7-zip এদের মধ্যে অনেক জনপ্রিয়। তবে উইনরার যা অফার করছে তা সত্যিই কুল!

Image Credit: Shutterstock

About the author

তাহমিদ বোরহান

আমি তাহমিদ বোরহান, বেশিরভাগ মানুষের কাছে একজন প্রযুক্তি ব্লগার হিসেবে পরিচিত। ইন্টারনেটে বাংলায় টেক কন্টেন্ট এর বিশেষ অভাব রয়েছে, তাছাড়া উইকিপিডিয়ার কন্টেন্ট বেশিরভাগ মানুষের মাথার উপর দিয়েই যায়। ২০১৪ সালে প্রযুক্তি সহজ ভাষায় প্রকাশিত করার লক্ষ্য রেখেই ওয়্যারবিডি (পূর্বের নাম টেকহাবস) ব্লগের জন্ম হয়! আর এই পর্যন্ত কয়েক হাজার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক আর্টিকেল প্রকাশিত করে বাঙ্গালীদের টেক লাইফ আরো সহজ করার ঠেকা নিয়ে রেখেছি!

সারাদিন প্রচুর পরিমাণে গান শুনি আর ইউটিউবে র‍্যান্ডম ভিডিও দেখি। ওয়ার্ডপ্রেস, ক্লাউড কম্পিউটিং, ভিডিও প্রোডাকশন, এবং ইউআই/ইউএক্স ডিজাইনের উপরে বিশেষ পারদর্শিতা রয়েছে। নিজের গল্প, মানুষের গল্প, আর এলোমেলো টপিক নিয়ে ব্যাক্তিগত ব্লগে লিখি। খাওয়া আর ঘুম আমার আরেক প্যাশন!

Add comment

Categories