WireBD

অ্যাপল কেন সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে থাকে?

আপনি যদি অনেক বেশি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যাবহার করেন এবং সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে বিখ্যাত টেক কোম্পানি এবং ব্র্যান্ডগুলোকে ফলো করে থাকেন, তাহলে আপনি হয়তো লক্ষ্য করেছেন যে, অ্যাপল, অর্থাৎ পৃথিবীর সবথেকে ভ্যালুয়েবল ব্র্যান্ড, সবসময় অ্যাক্টিভলি সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মগুলোকে এড়িয়ে চলে। প্রত্যেকটি সোশ্যাল মিডিয়াতে Apple এর অফিশিয়াল প্রোফাইল বা পেজ বা অ্যাকাউন্টগুলো লক্ষ্য করলেই দেখবেন যে তারা বলতে গেলে শুধুমাত্র Apple ইউজারনেমটি যাতে অন্য কেউ নিয়ে না নেয়, সেজন্যই সেই সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মগুলোতে তাদের অফিশিয়াল ইউজার অ্যাকাউন্ট ক্রিয়েট করে রেখেছে। এর বাইরে সোশ্যাল মিডিয়াতে কোন ধরনের অ্যাক্টিভিটি, কোন ধরনের প্রোমোশনাল পোস্ট, কোন ধরনের সেলিব্রিটি অ্যাডস এবং এমনকি কোনরকম সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং-ও অ্যাপল কখনোই করে না।

অ্যাপল

যেমন- অ্যাপলের অফিশিয়াল টুইটার অ্যাকাউন্টটি লক্ষ্য করলে দেখবেন যে, অ্যাপল কখনোই তাদের টুইটার অ্যাকাউন্টে একটি সিঙ্গেল টুইটও করেনি। ফেসবুকে অ্যাপলের অফিশিয়াল পেজটি লক্ষ্য করলে দেখবেন যে সেখানে শুধুমাত্র আইফোনের কয়েকটি ইমেজ ছাড়া আর কিছুই নেই। এছাড়া অ্যাপলের ইন্সটাগ্রাম অ্যাকাউন্টেও দেখবেন যে অ্যাপল শুধুমাত্র সেখানে আইফোনে তোলা ছবি শেয়ার করে থাকে। এছাড়া আর কিছুই না। এছাড়া অ্যাপল তাদের ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করা প্রত্যেকটি ভিডিওর কমেন্ট সেকশন ডিজেবল করে রাখে যাতে সেই প্রত্যেকটি ভিডিও শুধুমাত্র একেকটি সিম্পল প্রোডাক্ট অ্যানাউন্সমেন্টের মতো কাজ করে।

কিন্তু কেন? কেন অ্যাপলের মতো টেক কোম্পানি যেটি কিনা পৃথিবীর প্রথম ট্রিলিয়ন ডলার কোম্পানি, তারা অ্যাক্টিভলি সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং-কে এড়িয়ে চলছে? পৃথিবীর অন্যান্য প্রত্যেকটি টেক কোম্পানির দিকে (গুগল, স্যামসাং, মাইক্রোসফট ইত্যাদি) লক্ষ্য করলে দেখবেন যে, তারা সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এর ক্ষেত্রে অ্যাপলের একেবারে বিপরীত।

তারা প্রত্যেকটি সোশ্যাল মিডিয়া খুবই অ্যাক্টিভলি ব্যাবহার করে এবং প্রত্যেকটি সোশ্যাল মিডিয়াতে তাদের প্রোডাক্টগুলোর প্রোমোশন এবং মার্কেটিং করে থাকে। অন্যান্য টেক কোম্পানিগুলো যে সোশ্যাল মিডিয়াকে তাদের মার্কেটিং এবং তাদের অভারল সাকসেসের অন্যতম বড় একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করে, সেই সোশ্যাল মিডিয়াকেই কেন পৃথিবীর সবথেকে ভ্যালুয়েবল কোম্পানি, অ্যাপল সবসময় এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে? আজকে এই বিষয়টি নিয়েই কথা বলা যাক।

এই বিষয়টি বুঝতে হলে শুরু থেকে চিন্তা করতে হবে। InterBrand এর রিপোর্ট অনুযায়ী অ্যাপল (Apple) ব্র্যান্ডটি পৃথিবীর সবথেকে মূল্যবান ব্র্যান্ড। কোম্পানির হিসাব বা কোম্পানির ট্রিলিয়ন ডলারের হিসাব আলাদা, তবে শুধুমাত্র Apple এই ব্র্যান্ডটির মূল্যই ১৮৪ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি এবং এই ব্র্যান্ডটি পৃথিবীর সবথেকে ফাস্ট গ্রোয়িং ব্র্যান্ড। আবারো বলছি, এটা শুধুমাত্র ব্র্যান্ডের বা ব্র্যান্ড ভ্যালুর হিসাব, সম্পূর্ণ কোম্পানিটি নয়।

অ্যাপল

সত্যি কথা বলতে, এখানে এটা অস্বীকার  করার কোন সুযোগ নেই যে, অ্যাপল টেক ইন্ডাসট্রির মধ্যে সবথেকে বেশি অরগানাইজড, সবথেকে বেশি স্ট্রেইট ফরওয়ার্ড এবং সবথেকে বেশি সেলফ কনট্রোলড এবং সবথেকে কন্সিস্টেন্ট টেক কোম্পানিগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি। আপনি অ্যাপল লাভার হন অথবা অ্যাপল হেটারই হন, আপনাকে এটা মানতেই হবে যে স্মার্টফোন এবং অন্যান্য টেক প্রোডাক্টসের ক্ষেত্রে অ্যাপল ইন্ডাসট্রি লিডার হিসেবে ভুমিকা পালন করে। আপনি অ্যাপলের প্রত্যেক বছর রিলিজ করা আইফোনগুলোর দিকেই লক্ষ্য করুন। হেডফোন জ্যাক রিমুভ করাই বলুন, ডিস্প্লেতে নচ দেওয়াই বলুন আর ১৪৪ হার্জ রিফ্রেশ রেটের ডিসপ্লেই বলুন, সব ট্রেন্ডগুলোর সর্বপ্রথম লিডার ছিলো অ্যাপল।

ব্র্যান্ড কন্সিস্টেন্সি– এই কোয়ালিটিটি অর্জন করা সম্ভব হয় তখনই যখন কোম্পানির প্রত্যেকটি সার্ভিস এবং প্রত্যেকটি প্রোডাক্টের ওপরে কোম্পানির বা ব্র্যান্ডটির যথেষ্ট কনট্রোল থাকে, এবং অ্যাপলের সেটা যথেষ্ট আছে। আপনি যখন অ্যাপলের ওয়েবসাইট ভিজিট করেন, তখন আপনি কি ধরনের এক্সপেরিয়েন্স পাবেন, একটি ফিজিক্যাল অ্যাপল স্টোর ভিজিট করে আপনি কি এক্সপেরিয়েন্স পাবেন, অ্যাপলের টিভি অ্যাডে আপনি কি কি দেখবেন এবং সেখানে কি কি দেখানো হবে, অ্যাপলের বিলবোর্ড অ্যাড কোথায় কোথায় প্লেস করা হবে এবং কোন অ্যাডে কি কি থাকবে, অ্যাপলের প্রোডাক্টগুলোর প্যাকেজিং কেমন হবে, এসব বিষয় থেকে শুরু করে এমনকি আপনি আইফোনের হোমস্ক্রিন কিভাবে সাজাবেন, সেই সবকিছুই অ্যাক্টিভলি অ্যাপল নিজেই কনট্রোল করে।

অ্যাপল

একটি কোম্পানির সকল খুঁটিনাটি বিষয় নিজেদের এতোটা কনট্রোলের ভেতরে রাখা অ্যাপল ছাড়া সম্ভবত আর কোন টেক কোম্পানি সম্ভব করতে পারে না। ঠিক এই কারনে অ্যাপল কোম্পানিটিকে অনেকেই হেট করে থাকে, তবে অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে অ্যাপলের এই ধরনের কনট্রোলের কারনেই অ্যাপলের সফটওয়্যার এক্সপেরিয়েন্স, হার্ডওয়্যার এক্সপেরিয়েন্স এবং সমগ্র ব্র্যান্ডটি সবসময় তাদের কাজে কন্সিস্টেন্ট থাকে।

সহজ ভাষায় বললে, সোশ্যাল মিডিয়াকে এড়িয়ে চলাও অ্যাপলের এই কাস্টোমার কনট্রোলের আরেকটি ধাপ। যেসব ব্র্যান্ড সোশ্যাল মিডিয়াতে অনেক বেশি অ্যাক্টিভ, তাদের সোশ্যাল মিডিয়া পেজগুলো যেমন ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রাম প্রোফাইল, টুইটার অ্যাকাউন্ট ভিজিট করলেই আপনি দেখবেন যে সেখানে দুই ধরনের ফিডব্যাক পাওয়া যায়। প্রথমটি হচ্ছে কোম্পানিটির বা ব্র্যান্ডটির নিজের প্রোমোশন বা পোস্টস এবং তাদের কাস্টোমারদের ফিডব্যাক বা কমেন্টস।

সেখানে পজিটিভ কমেন্টের পাশাপাশি নেগেটিভ কমেন্টও থাকে। কোম্পানির খারাপ কাস্টোমার সাপোর্ট নিয়ে নেগেটিভ কমপ্লেইন, প্রোডাক্টের কোয়ালিটি নিয়ে নেগেটিভ কমপ্লেইনের পাশাপাশি ব্র্যান্ডটির ফ্যানবয় এবং হেটারদেরও পজিটিভ এবং নেগেটিভ কমেন্ট থাকে যেগুলো কখনোই একটি রিকমেন্ডেশন হিসেবে গ্রহনযোগ্য নয়। তাই সবথেকে বিখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোর জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় মার্কেটিং এর ভালো দিকের পাশাপাশি খারাপ দিকও থাকে।

এখন অ্যাপলের ব্যাপারে আসা যাক। অ্যাপল ব্র্যান্ডটির হেটার পৃথিবীতে সবথেকে বেশি আছে। ফেসবুকে বা অন্য কোথাও কোন টেক ডিসকাশন গ্রুপ বা কমিউনিটিতে খেয়াল করবেন যে সবথেকে বেশি অ্যাপলের হেটার খুঁজে পাওয়া যায় যারা স্ট্রেইট অ্যাপল ব্র্যান্ডটিকে সহ্য করতে পারে না, সেটা যে কারনেই হোক। সোশ্যাল মিডিয়াতে অ্যাপলকে নিয়ে ট্রলস, Memes এসবতো অনেক দেখেছেন। তাহলে চিন্তা করে দেখুন যে অ্যাপল যদি সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভলি ব্যাবহার করে, তাহলে তারা সেখানে পজিটিভ ফিডব্যাকের পাশাপাশি তার থেকেও অনেক বেশি ভিত্তিহীন নেগেটিভ ফিডব্যাক পাবে এসব হেটারদের থেকে, যার ফলে অ্যাপল তাদের বিশ্বস্ত কাস্টোমারদের কাছে যে মেসেজটি পৌঁছাতে চায়, সেটা বিকৃত না হয়ে পৌঁছানো একেবারেই অসম্ভব। এখানে সবশেষে অ্যাপলের পজিটিভ পাবলিসিটির থেকে বেশি নেগেটিভ পাবলিসিটি হবে।

আর অ্যাপলের মতো একটি কোম্পানি এটা কখনোই হতে দেবে না। তাই তাদের সকল ধরনের অ্যানাউন্সমেন্ট এবং তাদের সকল কাস্টোমারদের সাথে রিলেশনশিপ ক্লিয়ার এবং স্ট্রেইট ফরওয়ার্ড রাখার জন্য একমাত্র বুদ্ধিমানের কাজ হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিংকে যতোটা সম্ভব এড়িয়ে চলা।

অ্যাপল

কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়াতে অ্যাক্টিভ থাকার কিছু ভালো দিকও তো আছে। যেমন- সোশ্যাল মিডিয়াতে অ্যাক্টিভ থাকলে ব্র্যান্ড তাদের কাস্টোমারদের সাথে সরাসরি কমিউনিকেট করতে পারে, তাদের থেকে ফিডব্যাক জানতে পারে এবং কাস্টোমাররা ব্র্যান্ডটির থেকে বা কোম্পানির প্রোডাক্টগুলোর থেকে কি কি চায় বা এক্সপেক্ট করে এবং কি কি ইম্প্রুভমেন্ট চায় সেসব জানতে পারে। এছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে কোম্পানি তাদের প্রোডাক্ট সেলেও কিছুটা লাভ করতে পারে কিন্তু অ্যাপলের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যাবহার করে তারা যতোগুলো সেল বাড়াতে পারবে সেটা খুব বড় কোন ব্যাপার নয়।

আর কাস্টোমারদের সাথে প্রোডাক্ট নিয়ে ফিডব্যাক নেওয়া এবং কাস্টোমাররা যা চায় সেই অনুযায়ী কাজ করা- এই একটি কাজ এখন পর্যন্ত অ্যাপল কখনোই সেভাবে অ্যাক্টিভলি করেনি, যেমনটা করেছে ওয়ানপ্লাস বা শাওমির মতো স্মার্টফোন ব্র্যান্ডগুলো। তাই ওয়ানপ্লাস বা শাওমির মতো ব্র্যান্ডগুলোর কাছে কাস্টোমারদের ফিডব্যাক নেওয়া এবং সেই অনুযায়ী কাজ করা তাদের সম্পূর্ণ বিজনেস মডেলের অন্যতম একটি কি ফিচার এবং সেটাই তাদের সাকসেসের অন্যতম একটি কারন। তবে অ্যাপলের এই কাজটি করার একেবারেই দরকার হয়না। কারন, আমরা প্রত্যেক বছরই দেখে এসেছি যে অ্যাপল কাস্টোমারদের ফিডব্যাক না শুনেই তাদের নিজেদের ডিসিশন অনুযায়ী সবসময় কাজ করেছে এবং তবুও তারা পৃথিবীর সবথেকে ভ্যালুয়েবল ব্র্যান্ড হতে পেরেছে।

অ্যাপল

এছাড়া, অ্যাপল সবসময়ই এটা মনে করে যে, ” People don’t know what they want until you show it to them “ যা অ্যাপলের প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস নিজেই বলেছিলেন। তাই তারা চায় যে, তারাই সর্বপ্রথম কাস্টোমারদের সামনে তাদের প্রোডাক্টগুলো এবং তাদের সার্ভিসগুলো নিয়ে আসুক এবং কাস্টোমাররা সেটার সাথে নিজেদেরকে মানিয়ে নিক এবং সেটাকেই অ্যাকসেপ্ট করুক এবং সেটাই হচ্ছে। কারন, অ্যাপলকেই বর্তমানে সব স্মার্টফোন ম্যানুফ্যাকচারার এবং টেক কোম্পানিগুলো ফলো করে। তাই তাদেরকে নিজেদের জন্য আর নতুন করে আর সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং করার প্রয়োজন পড়ে না।

বলতে পারেন, অ্যাপলে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যাবহার করতে চায় না, কারন অ্যাপল চায় আপনি তাদের নিজেদের বিলবোর্ড অ্যাড দেখে বা তাদের নিজেদের অ্যানাউন্সমেন্ট শুনে তাদের নিজেদের অ্যাপল স্টোরে ফিজিক্যালি গিয়ে তাদের প্রোডাক্টগুলো পরীক্ষা করেন এবং ক্রয় করেন। এখানে কোন ধরনের পজিটিভ বা নেগেটিভ হাইপ তারা পছন্দ করেনা যেগুলো কাস্টোমারদের সাথে তাদের রিলেশনশিপে কোনরকম ব্যাড ইফেক্ট ফেলতে পারে। তাই তারা সব সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মগুলোকেই এড়িয়ে চলে। আজকের মতো এখানেই শেষ করছি। আশা করি আজকের আর্টিকেলটিও আপনাদের ভালো লেগেছে। কোন ধরনের প্রশ্ন বা মতামত থাকলে অবশ্যই কমেন্ট সেকশনে জানাবেন।

Image Credit : Alexander Oganezov Via Shutterstock

সিয়াম একান্ত

অনেক ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তির প্রতি আকর্ষণ এবং প্রযুক্তিকে ভালোবাসি। জীবনে টেকনোলজি আমাকে যতটা ইম্প্রেস করেছে ততোটা অন্যকিছু কখনো করতে পারেনি। তাই পড়াশুনার পাশাপাশি প্রায় অধিকাংশ সময়ই প্রযুক্তি নিয়ে সময় কাটাই। আশা করি এখানে আপনাদেরকে প্রযুক্তি বিষয়ক ভালো কিছু আর্টিকেল উপহার দিতে পারব।

2 comments

সোশ্যাল মিডিয়া

লজ্জা পাবেন না, সোশ্যাল মিডিয়া গুলোতে টেকহাবসের সাথে যুক্ত হয়ে সকল আপডেট গুলো সবার আগে পান!