কাইওএস (KaiOS) : পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম মোবাইল অপারেটিং সিস্টেম?

কাইওএস

এতদিন আমরা শুধুমাত্র হাতে গোনা কয়েকটি স্মার্টফোন ওএসকেই চিনে এসেছি। সবথেকে জনপ্রিয় মোবাইল ওএস- গুগলের অ্যান্ড্রয়েড, এরপর অ্যাপলের আইওএস, মাইক্রোসফটের উইন্ডোজ ফোন যার এখন আর কোন অস্তিত্বই নেই, ব্ল্যাকবেরির মোবাইল ওএস যার নাম ব্ল্যকবেরি, সেটিও একেবারেই মৃত। তাই এখন মোবাইল ওএস বলতে হলে শুধুমাত্র দুটিই আছে। একটি হচ্ছে গুগলের অ্যান্ড্রয়েড এবং আরেকটি হচ্ছে অ্যাপলের আইওএস। একটি ওএস যার নাম হয়তো আপনি কখনোই শোনেন নি, তেমন একটি ওএস হচ্ছে কাইওএস (KaiOS)।

এই ওএসটি একটি মডার্ন ওএস হলেও এটি তৈরি করা হয়েছে ফিচার ফোনগুলোর জন্য যেই ফোনগুলোকে আমরা বাটনযুক্ত স্মার্টফোন বলে থাকি এবং যেগুলো মুলত আমাদের বাবা-চাচারা ব্যাবহার করে থাকে। তবে কাইওএসে চালিত ফিচার-ফোনগুলো ফিচার ফোনের থেকে আরো অনেক বেশি ক্যাপেবল একটি ডিভাইস হয়ে পড়ে। মূলত কাইওএস এর অ্যাডভান্টেজগুলো নিয়ে আলোচনা করবো এবং জানার চেষ্টা করবো কেন গুগল এই ওএসটির পেছনে প্রায় ২২ মিলিয়ন ইউএস ডলার ইনভেস্ট করেছে? কি এমন আছে এই কাইওসে যা কাইওএস এর ফিচার-ফোনগুলোকে অন্যান্য ফিচার ফোন থেকে আলাদা করে?

কাইওএস (KaiOS)

কাইওএস নিজেদেরকে The Emerging OS বলে দাবী করে। কাইওএস এর মুল লক্ষ্যই হচ্ছে ফিচার ফোনগুলোকে কিছুটা স্মার্ট করে তোলা। এখনকার বিখ্যাত অনেক স্মার্টফোন ম্যানুফ্যাকচারারাই তাদের তৈরি ফিচার-ফোনগুলোতে কাইওএস ব্যাবহার করছে। যেমন- এইচএমডি গ্লোবালের তৈরি বর্তমান নোকিয়া ফিচার-ফোনগুলোতে ডিফল্ট অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে কাইওএস ব্যাবহার করছে এইচএমডি গ্লোবাল। যেসব ফিচার-ফোনগুলোতে কাইওএস ব্যাবহার করা হয়, সেগুলোতে এই ওএসটি এক্সট্রা কিছু ফিচারস এবং ফাংশনালিটি অ্যাড করে যদিও এর জন্য ফিচার-ফোনগুলোর হার্ডওয়্যারেও এক্সট্রা কিছু ফ্যাসিলিটি থাকার দরকার হয়। যেমন- ফোরজি সাপোর্ট, ওয়াইফাই সাপোর্ট, এনএফসি পেমেন্ট সাপোর্ট, অ্যাপস সাপোর্ট, প্রোগ্রেসিভ ওয়েব অ্যাপ সাপোর্ট ইত্যাদি। পূর্বে ফিচার-ফোনগুলোতে যথেষ্ট ভালো হার্ডওয়্যার ব্যাবহার করলেও ফিচার-ফোনগুলোর সফটওয়্যার এতোটা শক্তিশালী ছিলোনা যা এই ধরনের অ্যাডভান্সড ফিচার যেমন ফোরজি বা এনএফসি ইত্যাদি সাপোর্ট করবে। কাইওএস মুলত এই সম্পূর্ণ কনসেপ্টটিকেই চেঞ্জ করেছে।

কাইওএস

কাইওসটি মূলত কয়েক বছর আগে বের হওয়া এবং এক বছরের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যাওয়া, মজিলার ফায়ারফক্স ওএস এর একটি লাইটওয়েট এবং কাস্টোমাইজড ভার্শন যেগুলো ফিচার-ফোন এবং হার্ডওয়্যার বাটন বেজড নেভিগেশনের জন্য অপটিমাইজ করা। এই ওএসটি সর্বপ্রথম ব্যাবহার করা হয়েছে অ্যালকাটেল ফ্লিপ ফোনে যেটি খুবই বেসিক একটি লো-এন্ড ফোন ছিলো। এর পরপরই এইচএমডি গ্লোবাল এই ওএসটি ব্যাবহার করে তাদের নতুন তৈরি নোকিয়ার ফ্লিপ ফোনের সাথে যেটিকে ব্যানানা ফোনও বলা হয় এর কালারের কারনে। এরপর ইন্ডিয়ার অন্যতম মেজর মোবাইল নেটওয়ার্ক কোম্পানি, জিয়ো (Jio) সিদ্ধান্ত নেয় এই ওএসটিকে তাদের তৈরি বেসিক কমদামী ফিচার-ফোনে ইমপ্লিমেন্ট করার, যার নাম জিয়ো ফোন (Jio Phone) যেটি বেস্ট ফিচার-ফোন হিসেবে ইন্ডিয়ান মার্কেটে ইতোমধ্যেই খুবই জনপ্রিয়।

কাইওএস

যাইহোক, এগুলো ছাড়াও পৃথিবীতে আরও অনেক দেশে আরও অনেক অনেক ফিচার ফোনে ব্যাবহার করা হচ্ছে এই কাইওএস। ২০১৮ এর হিসাব অনুযায়ী শুধুমাত্র ইন্ডিয়ান মার্কেটেই কাইওএস ইতোমধ্যেই মার্কেট শেয়ারের দিক থেকে আইওএসকে পেছনে ফেলে অ্যান্ড্রয়েডের পরেই অবস্থান করছে। ঠিক এই কারনেই কাইওএস এর পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম মোবাইল ওএস হওয়ার একটা বড় সম্ভাবনা থেকেই যায়। কারন, এখন স্মার্টফোন ইউজার সবথেকে বেশি হলেও ফিচার-ফোনের ইউজার তার থেকে খুব বেশি কম নয়। আর ইন্ডিয়া এবং বাংলাদেশের মতো দেশে ফিচার ফোনের ইউজার অন্যান্য দেশের তুলনায় আরও অনেক বেশি। আর সেসব জায়গায় কাইওস-চালিত ফিচার-ফোন যেমন নোকিয়ার ব্যানানা ফোন বা জিয়ো ফোনের মতো মোবাইলগুলো থাকলে সেটা অধিকাংশ সাধারন মোবাইল ফোন ইউজারদের জন্য একেবারেই পারফেক্ট। আর তাই এখন পর্যন্ত কাইওএস চালিত ফোন ওয়ার্ল্ডওয়াইড ৪০ মিলিয়নের ওপরে সেল হয়েছে এবং ধারণা করা হয় ২০১৮ এর শেষের দিকে প্রায় ১০০ মিলিয়ন কাইওএস চালিত ডিভাইস সেল করা হবে।

কিন্তু কেন?

এর একটি বড় বা সবথেকে বড় কারন হচ্ছে কাইওএস এর অ্যাপ সাপোর্ট। কাইওএস চালিত ফিচার-ফোনগুলোতে যেমন অ্যাপ সাপোর্ট আছে, সেই ধরনের অ্যাপস অন্য যেকোনো ফিচার-ফোনে কখনো ব্যাবহার করার কথা কল্পনাই করা সম্ভব ছিলো না এতদিন। কাইওএস এর নিজস্ব একটি ফুল ফিচারড অ্যাপ স্টোরও আছে যেখানে মেজর ডেভেলপারের প্রায় প্রয়োজনীয় অনেক অ্যাপই পাওয়া যায়। হ্যাঁ, অ্যান্ড্রয়েড এবং আইফোনের অ্যাপ স্টোরে যেসকল অ্যাপ পাওয়া যায় সেই সবগুলো অ্যাপ কাইস্টোরে (KaiOS এর অ্যাপ স্টোরের নাম) অবশ্যই পাওয়া যাবে না, তবে একটি হার্ডওয়্যার বাটনের সাহায্যে অপারেট করা ফিচার-ফোনে যেসব অ্যাপ আমরা এক্সপেক্ট করতে পারি, তার থেকে অনেক বেশি অ্যাপস আছে কাইস্টোরে এবং অ্যাপগুলোর কোয়ালিটিও যথেষ্ট ভালো। উদাহরনস্বরূপ বলা যায়, কাইস্টোরে থাকা অ্যাপগুলোর কোয়ালিটি উইন্ডোজ ফোনের অ্যাপের থেকেও ভালো।

কাইওএস

কাইস্টোরে আপনি অফিশিয়াল ফার্স্ট পার্টি অ্যাপস যেমন হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটার, ইউটিউব ইত্যাদি আরও অনেক অ্যাপস পাবেন। ফার্স্ট পার্টি অ্যাপসগুলো ছাড়াও কাইস্টোরে প্রোগ্রেসিভ ওয়েব অ্যাপসের সাপোর্টও আছে। এছাড়া কাইওসে ব্যাবহার করার সুযোগ থাকছে গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট যা কাইওএসের জন্য গুগলের নিজেরই তৈরি করা অ্যাপ বা সার্ভিস। একটি ফিচার-ফোনে গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট ব্যাবহার করাটা প্রায় একটি স্বপ্নের মতো। এই সপ্নটিকেই মুলত সত্যি করতে পেরেছে কাইওএস।

এছাড়া কাইওএস এর সাকসেসের আরেকটি কারন হচ্ছে, এটি যেহেতু ফুল ফিচারড একটি অপারেটিং সিস্টেম নয়, বরং ফায়ারফক্স ওএসেরই একটি মডিফাইড ভার্শন, তাই সম্পূর্ণ ওএসটিই রান করছে ফায়ারফক্স ব্রাউজার ইঞ্জিনের ওপরে। তাই এই ওএসে ওয়েব অ্যাপস ব্যাবহার করা খুবই সহজ এবং কনভেনিয়েন্ট একটি এক্সপেরিয়েন্স যা অন্য কোন ফিচার ফোনে কখনোই পাওয়া সম্ভব নয়। কাইওএস ফিচার ফোনে রান করলেও এটি স্ট্যান্ডার্ড সব ওয়েব টেকনোলজি সাপোর্ট করে, যেমন- এইচটিএমএল ফাইভ, জাভাস্ক্রিপ্ট, সিএসএস ইত্যাদি। তাই প্রায় সবধরনের ওয়েবসাইট এবং ওয়েব অ্যাপ খুব সহজেই ব্যাবহার করা সম্ভব হয় কাইওএস-চালিত ফিচার-ফোনে।


WiREBD এখন ইউটিউবে, নিয়মিত টেক/বিজ্ঞান/লাইফ স্টাইল বিষয়ক ভিডিও গুলো পেতে WiREBD ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুণ! জাস্ট, youtube.com/wirebd — এই লিংকে চলে যান এবং সাবস্ক্রাইব বাটনটি হিট করুণ!

এছাড়া কাইওএস জিনিসটি মোবাইল নেটওয়ার্ক ক্যারিয়ারদের কাছেও অনেক ভালো একটি বিজনেস প্ল্যান হয়ে গিয়েছে। ভেবে দেখুন, এর আগের ফিচার ফোনগুলোতে টুজির ওপরে নেটওয়ার্ক সাপোর্ট করেনা। তই আগেকার ফিচার ফোনগুলোতে ইন্টারনেট ব্যাবহার করার সুযোগ থাকলেও খুব খুব কম মানুষই ফিচার ফোনে ইন্টারনেট ব্যাবহার করতো। ফলে মোবাইল ক্যারিয়াররা তাদের কাছে ডেটা সেল করতেও পারতো না। তবে কাইওএস চালিত ফিচার-ফোনের ইউজার বাড়লে ইন্টারনেট ইউজার আরও অনেক অনেক বেড়ে যাবে যেহেতু এই ক্ষেত্রে ফিচার ফোনেও ফোরজি ব্যাবহার করার সুযোগ থাকছে। এর ফলে তখন নেটওয়ার্ক ক্যারিয়াররা ফিচার-ফোন ইউজারদের কাছেও ডেটা সেল করতে পারবে। আর আপনি বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, এক্ষেত্রে তারা প্রায় ২০ থেকে ২৫%  বেশি ইউজার পাবে ডেটা সেল করার জন্য, যা তাদের সম্পূর্ণ বিজনেসে একটি বড় অবদান রাখবে।

এতক্ষনে নিশ্চই সবকিছু বিবেচনা করে বুঝতে পারছেন যে কাইওএস কেন এতটা সাকসেসফুল এবং কেন এটির পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম এবং জনপ্রিয় মোবাইল ওএস হওয়ার সম্ভাবনা  আছে (যদিনা তারা মাইক্রোসফটের মতো কোন ভুল সিদ্ধান্ত নেয়)। আজকের মতো এখানেই শেষ করছি। আশা করি আজকের আর্টিকেলটিও আপনাদের ভালো লেগেছে। কোন ধরনের প্রশ্ন বা মতামত থাকলে অবশ্যই কমেন্ট সেকশনে জানাবেন।

অনেক ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তির প্রতি আকর্ষণ ছিলো এবং হয়তো সেই আকর্ষণটা আরো সাধারন দশ জনের থেকে একটু বেশি। নোকিয়ার বাটন ফোন থেকে শুরু করে ইনফিনিটি ডিসপ্লের বেজেললেস স্মার্টফোন, সবই আমার প্রিয়। জীবনে টেকনোলজি আমাকে যতটা ইম্প্রেস করেছে ততোটা অন্যকিছু কখনো করতে পারেনি। আর এই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ থেকেই লেখালেখির শুরু.....

9 Comments

    1. সিয়াম একান্ত Post author Reply

      না ভাইয়া। উইন্ডোজে ব্যাবহার করা সম্ভব না।

  1. SOYEB Reply

    বাংলাদেশের কোন কোন কোম্পানি কাইওএস দিয়ে ফোন প্রস্তুত করে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *